ঢাকার ধামরাই উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বংশী নদী। জামালপুরের পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে উৎপত্তি হয়ে জামালপুর, টাঙ্গাইল ও গাজীপুর দিয়ে তুরাগ নদে মিশেছে। ২৩৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নদীটি ধামরাইয়ের সোমভাগ ইউনিয়নের ফুকুটিয়া, চাপিল, মান্দারচাপ, নওগাঁও, দেপাশাইসহ আশপাশের অনেক গ্রামকে বিভক্ত করেছে। নদী দ্বারা বিভক্ত ১০টি গ্রামের বাসিন্দাদের যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন সহজ করতে ২০১৯ সালে শুরু হয় সেতু নির্মাণকাজ। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এক বছরের মধ্যে কাজটি শেষ করার কথা ছিল। কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গড়িয়েছে এর মেয়াদ। তবে এখনো শেষ হয়নি সেতুটির নির্মাণকাজ।
নদীর তীরের বাসিন্দারা বলছেন, সেতুর অপেক্ষায় রয়েছে ১০ গ্রামের মানুষ। ২০১৯ সালে কাজ শুরু হলে আশার আলো দেখে এ অঞ্চলের মানুষ। তবে কাজ শুরু হলেও শেষ হওয়ার খবর নেই। নকশার ত্রুটি এবং ঠিকাদার আত্মগোপনে থাকায় সেই আশা এখন হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছে। দুর্ভোগ রয়ে গেছে ফুকুটিয়া, চাপিল, মান্দারচাপ, নওগাঁও, দেপাশাইসহ আশপাশের গ্রামের মানুষের।
চাপিল গ্রামের আব্দুল মান্নান জানান, সোমভাগ ইউনিয়নসহ আশপাশের প্রায় ১০ গ্রামের মানুষের যাতায়াত এ নদীর ওপর দিয়ে। সেতু না হওয়ায় তাদের প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের উৎপাদিত বিভিন্ন কৃষিপণ্য বাজারে নিয়ে বিক্রিও করতে পারেন না। এতে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
নদীর পাড়ে কাজ করছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা রফিক মিয়া। নিজের খেতের সবজি বিক্রি করতে নৌকা দিয়ে যেতে হয় বাজারে। এতে দুর্ভোগ যেমন আছে, তেমনি সব সবজিও তিনি একা নিয়ে যেতে পারেন না।
রফিক মিয়া বলেন, ‘সেতুটি নির্মাণ হলে ভ্যান, রিকশা, অটোরিকশা চলাচল করত। ব্যাপারীরা এসে সবজি কিনে নিয়ে যেতেন। না হলে আমরাও বাজারে গিয়ে সবজি বিক্রি করতে পারতাম। এখন ঝুড়ি ভরে একটু একটু করে বাজারে নিয়ে যেতে হয়। ব্যাপারীদের ডাকলেও তারা দাম কম বলেন।’
সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ যেন সীমা ছাড়িয়েছে। স্কুল-কলেজে যেতে খেয়া নৌকাই তাদের একমাত্র ভরসা। শুষ্ক মৌসুমে কোনো রকম যাতায়াত করতে পারলেও বর্ষা মৌসুমে নৌকা ডুবে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এছাড়া কেউ বিপদে পড়লে বা রাতে অসুস্থ হলে দুর্ভোগের অন্ত থাকে না।
রাব্বি নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান, রাত ১১টার পর খেয়া বন্ধ হয়ে যায়। তখন যদি কেউ অসুস্থ হয়, হাসপাতালে নেয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, জিডিপি-৩ প্রকল্পের আওতায় বংশী নদীর ওপর ৯৮ দশমিক ১০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের টেন্ডার আহ্বান করে এলজিইডি। ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সুরমা অ্যান্ড খোশেদা এন্টারপ্রাইজ। যার নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে মেয়াদ গড়িয়েছে ২০২৫ সাল অবধি। এর মধ্যে দুই দফায় দুটি পিলার নির্মাণ করে কাজ বন্ধ করে দেন ঠিকাদার। কাজটি শেষ করার জন্য উপজেলা এলজিইডি অফিস থেকে তিন দফায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠিও দেয়া হয়। পরে ২০২২ সালের শেষের দিকে আবার কাজ শুরু করেন ঠিকাদার। এরপর নদীর মাঝখানে আরো দুটি পিলার নির্মাণ শেষ করার পর তিন দফায় আবার কাজ বন্ধ করে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে সেতুর মাঝখানের গার্ডার তৈরি পুরোপুরি শেষ না করে আবারো কাজ বন্ধ করে রেখেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা এলজিইডি কর্মকর্তা মো. মিনারুল ইসলাম বলেন, ‘সেতুটির নির্মাণকাজ শুরুর পর নকশার ত্রুটি ধরা পড়ে। যা ঠিক করতেই দীর্ঘ সময় কেটে যায়। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ঠিকাদার আত্মগোপনে চলে যান। এ কারণে কাজটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে ২৬ সালের মধ্যেই কাজ শেষ করে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে সেতুটি। নতুন করে কাজ শুরু করার জন্য সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা হবে।’