রাজধানীতে সম্প্রতি বিভিন্ন কোম্পানির অনুকূলে ২১টি রুটে নতুন ২ হাজার ৬১৫টি বাস চলাচলের অনুমতি দিয়েছে ঢাকা মহানগর যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি। তবে রুট পারমিট প্রদানের প্রক্রিয়াটি যথাযথ নিয়ম মেনে হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে ঢাকায় রুট কমিয়ে কোম্পানিভিত্তিক বাস চালুর একটি উদ্যোগ চলমান। এমন সময় নতুন করে বিপুলসংখ্যক বাসের রুট পারমিট প্রদান উদ্যোগটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হওয়ায় বাসগুলোর রুট পারমিট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বণিক বার্তাকে এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
২০১৮ সালে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বোর্ড সভা সিদ্ধান্ত নেয়, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা (বাস রুট র্যাশনালাইজেশন) প্রবর্তনের অংশ হিসেবে ঢাকায় নতুন করে বাসের রুট পারমিট দেয়া হবে না। তবে ‘অনিবার্য প্রয়োজনীয়তা’ দেখা দিলে সেটি বিবেচনার সিদ্ধান্ত হয়।
ডিটিসিএ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে কোম্পানিভিত্তিক বাস রুট প্রবর্তন এবং ব্যবস্থাটির একটি কাঠামোগত ভিত্তি দাঁড় করানোর কাজ চলছে। এতে নতুন করে রুট পারমিট প্রদান বন্ধ থাকায় রুট পারমিটবিহীন বাস চলাচল বৃদ্ধি, এক রুটের বাস অন্য রুটে চলাসহ বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হওয়ার কথা জানিয়েছেন ডিটিসিএর কর্মকর্তারা। এসব সমস্যা সমাধানে ২১টি রুটে বিভিন্ন কোম্পানিকে নির্দিষ্টসংখ্যক বাসের রুট পারমিট প্রদানের জন্য ঢাকা মহানগর যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির কাছে সুপারিশ করে ডিটিসিএ।
সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী বাসের রুট পারমিট প্রদানের ক্ষেত্রে ডিটিসিএর সুপারিশ বাধ্যতামূলক। কিন্তু সংস্থাটির কর্মকর্তাদের অভিযোগ, তাদের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি ঢাকা মহানগর যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি। ডিটিসিএর কর্মকর্তারা বলছেন, এ কমিটি তিনটি কোম্পানিকে পূর্বাচল ‘৩০০ ফুট’ রাস্তায় চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। অথচ এ সড়কে বাস চলাচলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে ছাড়পত্র নেয়া বাধ্যতামূলক হলেও তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ভূঁইয়া পরিবহন নামের একটি কোম্পানিকে মোহাম্মদপুর থেকে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত ৯৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং বৈশাখী পরিবহন নামের কোম্পানিকে নতুন বাজার থেকে পাটুরিয়া ঘাট পর্যন্ত ৯৪ কিলোমিটার আরেকটি রুটে পারমিট দেয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি কেবল ঢাকা মহানগরের মধ্যে বাস রুট প্রদান করতে পারে। এছাড়া একই রুটে একাধিক কোম্পানিকে পারমিট, একটি রুটে অস্বাভাবিকসংখ্যক (৩০০টি) বাস চালানোর অনুমতি দিয়েছে কমিটি। এসব সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন বিশৃঙ্খলার কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ডিটিসিএর কর্মকর্তারা।
পদাধিকারবলে ঢাকা মহানগর পণ্য ও যাত্রী পরিবহন কমিটির সভাপতি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার। রুট পারমিট প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় হওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ করা হলে ডিএমপি কমিশনারের পক্ষে সংস্থাটির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. সরওয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, এখনো কোনো কোম্পানিকে রুট পারমিট দেয়া হয়নি। তবে যারা রুট পারমিটের আবেদন করেছেন, তাদের কিছু শর্ত দেয়া হয়েছে। শর্ত প্রতিপালন সাপেক্ষে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত হবে যে তারা রুট পারমিট পাবেন কিনা। আর ঢাকার বাহিরে রুট পারমিট দেবে স্থানীয় প্রশাসন। সেখানে ডিএমপির পক্ষ থেকে দেয়া হবে না।
এদিকে ঢাকা মহানগর পণ্য ও যাত্রী পরিবহন কমিটি যে ২ হাজার ৬১৫টি বাসের রুট পারমিট দিয়েছে সেগুলো বাতিল হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকায় যেসব রুটে বাস চলাচল করছে, সে রুটগুলোই তো ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা করা যাচ্ছে না। এমন প্রেক্ষাপটে বাড়তি রুট ও বাড়তি গাড়ি এলে অব্যবস্থাপনা আরো বেড়ে যাবে। আমরা আগে ঢাকার গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনব, তারপর নতুন রুট পারমিট দেয়ার বিষয়টি দেখা যাবে। বিষয়টি নিয়ে আমি এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি। স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরীকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঢাকা মহানগর পণ্য ও যাত্রী পরিবহন কমিটি সভা করে নতুন দেয়া বাসের রুট পারমিটগুলো বাতিল করে দেবে।’