২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি তিউনিসিয়ায় গৃহীত হয় নতুন সংবিধান, যা একসময় পশ্চিমা দুনিয়ায় আরব বিশ্বের জন্য ‘মডেল’ বলে প্রশংসিত হয়েছিল। সংবিধান প্রণয়নে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দায়িত্বে থাকা বিশেষ সংগঠন ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেট’ ২০১৫ সালে জিতে নিয়েছিল নোবেল শান্তি পুরস্কার। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ‘জেসমিন বিপ্লবে’ স্বৈরশাসক জাইন এল আবিদিন বেন আলির পতনের পরই নতুন সংবিধান প্রণয়নের প্রস্তুতি শুরু হয়। ওই বছরের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত প্রথম বহুদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয় ন্যাশনাল কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি (এনসিএ)। এর সদস্যদের ওপর অর্পিত হয় নতুন সংবিধান লেখার দায়িত্ব। এনসিএ ছিল গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত ২১৭ সদস্যের একটি গণপ্রতিনিধি পরিষদ, যেখানে দেশ ও প্রবাসী প্রতিনিধিরা ছিলেন। এতে ইসলামপন্থী এন্নাহদা, সেক্যুলার, বামপন্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। সদস্যদের মধ্যে আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। তবে ন্যাশনাল কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে সর্বোচ্চ ৮৯ জন সদস্য ছিল এন্নাহদার। এ পরিষদ সংবিধান প্রণয়নের মূল কেন্দ্র হলেও ২০১৩ সালের রাজনৈতিক অচলাবস্থায় এর কাজ থমকে যায়, যা পরে ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেটের মধ্যস্থতায় পুনরায় শুরু হয়।
প্রথমদিকে ইসলামপন্থী এন্নাহদা, সেক্যুলার ও বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনা চলছিল আপেক্ষিক সহনশীলতায়। ২০১২ সালের মধ্যে প্রাথমিক খসড়া তৈরি হলেও বিতর্কিত ধারাগুলো নিয়ে টানাপড়েন চলতে থাকে। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেক্যুলার নেতা চোকরি বেলাইদ এবং জুলাইয়ে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ব্রাহমি হত্যাকাণ্ডে রাজনৈতিক সংকট চরমে ওঠে। বিরোধীরা দেশটির প্রধান ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল এন্নাহদাকে নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য দায়ী করে ক্ষমতা ছাড়ার দাবি তোলে। সংসদ বয়কট, গণবিক্ষোভ ও ধর্মঘটে সংবিধান প্রণয়নের কাজ স্থবির হয়ে পড়ে। এ অচলাবস্থা ভাঙতে নাগরিক সমাজের চার সংগঠন—তিউনিসিয়ান জেনারেল লেবার ইউনিয়নের নেতা হুসিন আব্বাসি, তিউনিসিয়ান কনফেডারেশন অব ইন্ডাস্ট্রি, ট্রেড অ্যান্ড হ্যান্ডিক্রাফ্টসের সভাপতি ওউইদা বুশামাউই, তিউনিসিয়ান হিউম্যান রাইটস লিগের প্রধান আবদেলসাত্তার বেন মুসা এবং তিউনিসিয়ান অর্ডার অব লইয়ার্সের বাশির এজজাইবি মিলে ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেট’ গঠন করেন। কোয়ার্টেটে থাকা অধিকাংশ সদস্যই ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও ইতালির বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা নিয়েছিলেন। অনেকেই পশ্চিমা গণতান্ত্রিক কাঠামো ও মানবাধিকার আইন বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন।
কোয়ার্টেটের মধ্যস্থতায় এন্নাহদা নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ায়। দায়িত্ব নেয় টেকনোক্র্যাট অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর নতুন আলোচনার পথ খুলে যায়। ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি বিপুল সমর্থনে গৃহীত হয় নতুন সংবিধান। আন্তর্জাতিকভাবে এ শান্তিপূর্ণ সমঝোতা এতটাই প্রশংসা কুড়ায় যে ২০১৫ সালে ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেটকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তিউনিসিয়ার সংবিধানকে আরব বিশ্বের মডেল হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু পরে বোঝা যায় কথিত রাজনৈতিক ঐক্যের ভিত কতটা ভঙ্গুর ছিল। এর আড়ালে লুকিয়ে ছিল স্থানীয় বাস্তবতা উপেক্ষা, রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক হতাশা আর মৌলিক সংস্কারের অভাব। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই নতুন সংবিধান পরিণত হয় ফাঁপা প্রতীকে। যেখানে রাজনৈতিক কাঠামো ছিল, ভোটাধিকার ছিল, অথচ ‘জেসমিন বিপ্লবের’ শেকড়ে থাকা দারিদ্র্য, বেকারত্ব, আঞ্চলিক বৈষম্য ও অর্থনৈতিক অবিচারের প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়। এনসিএ ও ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেটের সদস্যদের বড় অংশই ছিলেন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত—যারা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পশ্চিমা মডেলকে কেন্দ্র করে সাংবিধানিক কাঠামো গড়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সামাজিক বৈষম্যের গভীরতা উপেক্ষা করেছিলেন। সে সঙ্গে ইসলামপন্থী ও উদারপন্থীদের মধ্যে থাকা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও মতাদর্শিক বিভাজনও মেটানো যায়নি; বরং তা থেকে গেছে সংবিধানের অন্তর্গত এক নীরব অস্থিরতা হিসেবে। যা পরবর্তী বছরগুলোতে ওই সংবিধানকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে।
ইসলামপন্থী এন্নাহদা ও সেক্যুলার ও মধ্যপন্থী দল নিদা তিউনিসের মধ্যে বিভাজন ২০১৪ সালের পরও থামেনি। সংবিধানের ভাষা নিয়ে আপস হলেও পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়তেই থাকে। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নতুন রূপে সংসদ ও প্রেসিডেন্টের দপ্তরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সংবিধানের কাঠামোতে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার জন্য প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এর ফলে পশ্চিমা বিশ্বের মতে ‘আদর্শ সাংবিধানিক কাঠামো’র উপস্থিতি থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ আটকে থাকে। সংবিধানে প্রতিশ্রুতি ছিল নারী-পুরুষের সমতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য আর ধর্মীয় স্বাধীনতার। পশ্চিমা বিশ্ব ও গণমাধ্যম প্রশংসায় ভাসিয়ে বলছিল ‘এটাই আরব বিশ্বের গণতন্ত্রের মডেল’। তাত্ত্বিক বিচারে এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমী অর্জন। যেখানে সংঘাত এড়িয়ে একটি প্রগতিশীল সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি হয়। কিন্তু ওই আলোর আড়ালেই ছিল গভীর অন্ধকার। ওই সাফল্যের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল বিপ্লবের মৌলিক লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়ার সূচনা। আঞ্চলিক উন্নয়নের অঙ্গীকার, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, সামাজিক ন্যায়বিচার, প্রাকৃতিক সম্পদে জনগণের মালিকানা এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থানের মতো মৌলিক সেবা প্রদানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত করার ধারা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু সেগুলো ছিল নীতি-নির্দেশমূলক; বাস্তবায়নের জন্য বাধ্যতামূলক ও সময়সীমাবদ্ধ পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়নি।
যে বিপ্লবের জন্ম হয়েছিল মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মাহুতির আগুনে—অর্থনৈতিক টানাপড়েন, বেকারত্ব, আঞ্চলিক বৈষম্য আর অপমানের বিরুদ্ধে ক্ষোভে, তার শেকড়ে জল মেলেনি। যে আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল বেকারত্ব, আঞ্চলিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক অবিচার আর অপমানের বিরুদ্ধে, তা রূপ নেয় তাত্ত্বিক সংবিধান আর সংস্কার বিতর্কে। পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্রায়ণ মডেল ও তাত্ত্বিক সংবিধান বিতর্ক স্থানীয় বাস্তবতা উপেক্ষা করে মৌলিক অর্থনৈতিক সংস্কারকে আড়ালে ঠেলে দেয়। আইএমএফ নির্দেশিত নীতিতে ভর্তুকি কমে, ফলে বাড়ে দাম, কর্মসংস্থান কমে, বৈষম্য আরো গভীর হয়। সেখানে কাঠামো ছিল, সংবিধান ও ভোটাধিকার ছিল কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনমান বদলানোর মতো বাস্তব পরিবর্তন আসেনি (তিউনিসিয়া: কনস্টিটিউশন অব জানুয়ারি ২৭, ২০১৪: ফ্রম সাকসেস টু ক্রাইসিস)।
বিপ্লবের পর থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সংস্কার আলোচনা মূলত আটকে থাকে সংবিধান প্রণয়ন পর্যন্ত। কিন্তু যে বিপ্লবের শুরুটা হয়েছিল দারিদ্র্যপীড়িত আর বঞ্চিত মানুষের ক্ষোভ থেকে, তা থেকে যায় আড়ালেই। পশ্চিমা নীতিপ্রণেতা ও থিংকট্যাংকগুলো আরব বসন্তকে প্রায়ই একটি ‘সরলীকৃত কাহিনি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করে। তারা দেশটির প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মাহুতির কথা বলে কেবল। কিন্তু তাদের গল্পে বলা হয় না বুয়াজিজি ছিলেন ‘ফলের ফেরিওয়ালা’, যিনি অর্থনৈতিক টানাপড়েনে ছিলেন। এক পৌরকর্মীর হাতে অপমানিত হয়ে আগুনে আত্মাহুতি দেন। এর পরই রাস্তায় নেমে এসেছিল সর্বস্তরের জনগণ, যাদের প্রত্যাশা শুধু গণতন্ত্র ছিল না। তারা জীবনমানেও উন্নতি চেয়েছিলেন, দারিদ্র্য থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন, তাদের বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্য দূরীকরণ ও আর্থিক সংস্কার। কিন্তু পশ্চিমা দুনিয়ায় বুয়াজিজির গায়ে আগুন ধরানো ছবিকে কেবল স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের প্রতিরোধ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
‘জেসমিন বিপ্লব’কে এ দৃষ্টিতে দেখা কেবল পশ্চিমাদের সমস্যাই ছিল না। একই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সংস্কারের দায়িত্বে থাকা পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যেও। বিপ্লবের পর পশ্চিমা বয়ানে তিউনিসিয়া দ্রুতই ‘সফলতার গল্প’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। কিন্তু এ অতিরিক্ত ‘এক্সসেপশনালিজম’ বিপ্লবের প্রকৃত লক্ষ্য—রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, সামাজিক সংস্কার বাস্তবায়নে অবদান রাখেনি বললেই চলে। অনেকাংশ অর্থনৈতিক কাঠামো আরো অবনতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল। জনগণের প্রত্যাশা ছিল বিপ্লবের পর অর্থনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসবে। বেন আলি যুগের দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো ভেঙে পড়ে একটি নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যা কর্মসংস্থান বাড়াবে, আঞ্চলিক বৈষম্য কমাবে এবং দারিদ্র্য হ্রাস করবে। কিন্তু বাস্তবে হলো উল্টো। তিউনিসিয়ার বিপ্লব-পরবর্তী দশক মানুষের জীবনমান উন্নত করার প্রতিশ্রুতি রাখেনি, উল্টো বহু সূচকে অবনতি হয়েছে।
২০০০-১০ সালের মধ্যে যেখানে গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০১১-১৯ সালের মধ্যে তা নেমে আসে মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশে। যুব বেকারত্ব ২০০৫ সালের ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ৯ শতাংশে। ২০২১ সালে গ্যালাপের জরিপ বলছে, বিপ্লবের ২-৩ বছর পর থেকেই অর্থনীতি নিয়ে মানুষের আস্থা কমতে থাকে। ২০১০ সালে যেখানে মাত্র ৮ শতাংশ মানুষ বলেছিল যে স্থানীয় অর্থনীতি খারাপের দিকে যাচ্ছে, ২০২০ সালে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭২ শতাংশে। ২০১০ সালে যেখানে মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ বলেছিল তারা প্রয়োজনীয় খাবার কিনতে পারেনি, ২০২০ সালে এ হার তিন গুণ বেড়ে ৪০ শতাংশে দাঁড়ায়। এসব পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন হলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি (হোয়াই তিউনিসিয়া লস্ট ফেইথ ইন ডেমোক্রেসি: কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস)।
তিউনিসিয়ার বিপ্লব-পরবর্তী অর্থনৈতিক নীতি ছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দাতা সংস্থার প্রস্তাবিত কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল। তিউনিস বেছে নেয় নিউ লিবারেল ইকোনমি। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের শর্ত মেনে ভর্তুকি কমানো, সরকারি ব্যয় হ্রাস, কর কাঠামো সংস্কার, বেসরকারীকরণ—যার উদ্দেশ্য ছিল আর্থিক ঘাটতি কমানো ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ। কিন্তু এসব পদক্ষেপ প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এসব নীতি নেয়া হয়েছিল অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা ও স্থানীয় সামাজিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে। তিউনিসিয়ার অর্থনীতি আগে থেকেই উচ্চ বেকারত্ব, নিম্ন উৎপাদনশীলতা, রফতানি বৈচিত্র্যের অভাব এবং আঞ্চলিক বৈষম্যে জর্জরিত ছিল। ভর্তুকি হ্রাসের ফলে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। জীবনযাত্রার ব্যয় হঠাৎ করেই ঊর্ধ্বমুখী হয়, অথচ আয় বৃদ্ধি পায়নি—বরং কিছু ক্ষেত্রে স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। গ্রামীণ অঞ্চলের দারিদ্র্য আরো তীব্র হয়।
সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতির ফলে উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো এবং জনসেবা খাতে বিনিয়োগ কমে যায়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবহন খাতে সেবার মান নেমে আসে। অথচ এ খাতগুলোই ছিল মানুষের জীবনমান সরাসরি উন্নত করার প্রধান মাধ্যম। একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বেসরকারীকরণও সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া শুরু হয়। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, কর্মসংস্থান হারিয়ে যায়। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিবর্তে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।
তিউনিসিয়ার রফতানি প্রধানত কৃষিপণ্য, পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। উৎপাদনশীল খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা ও নিরাপত্তা হুমকির কারণে রফতানিতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়নি। বরং মুদ্রার অবমূল্যায়ন আমদানি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরো চাপের মুখে ফেলে। সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল—এ নীতিগুলো গ্রহণের সময় আঞ্চলিক বৈষম্য ও সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করা। বিপ্লবের সূতিকাগার ছিল তিউনিসিয়ার অবহেলিত ও প্রান্তিক অঞ্চল, যেখানে অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে ছিল। কিন্তু আইএমএফ-নির্দেশিত সংস্কার এসব অঞ্চলে বিনিয়োগ না করে বরং শহুরে ও উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়নকে উৎসাহিত করে। ফলে অসন্তোষ আরো বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এ পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক স্থবিরতা তৈরি করেনি, বরং রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণতন্ত্রবিরোধী প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
‘গণতন্ত্র এলে উন্নয়ন আসবে’—এ সরলরৈখিক ধারণা তিউনিসিয়ায় ব্যর্থ হয়। কারণ দুর্বল রাষ্ট্রক্ষমতা, ক্রোনি নেটওয়ার্ক ও আঞ্চলিক বৈষম্য ভাঙা হয়নি বা ভাঙার পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ‘জেসমিন বিপ্লব’ হয়ে পড়ে ক্ষমতার রূপান্তর। যেখানে সম্পদ বা ক্ষমতার বণ্টনে কোনো বড় পরিবর্তন আসেনি। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের সরকারি চাকরি দেয়। অনেক পদ ছিল শুধু কাগজে-কলমে, তবু বেতন চলত। এতে রাষ্ট্রের খরচ বেড়ে ঋণফাঁদে পড়ে, আর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামোতে বিনিয়োগ কমে যায়। একের পর এক সরকার আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। কিন্তু স্থানীয় বাস্তবতা আমলে না নিয়ে সংস্কার আর কর্মসংস্থানমুখী পরিকল্পনাহীনতায় অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না। পশ্চিমা অর্থনীতির বৌদ্ধিক ঐতিহ্য যে উত্তর আফ্রিকা-মধ্যপ্রাচ্যে কার্যকর হবে না—সে বাস্তবতা উপেক্ষা করে ঋণ বা সহায়তা ঠিকই এসেছে কিন্তু ওয়াশিংটন কনসেনসাসের কপি-পেস্ট নীতি তিউনিসিয়ায় ফল দিতে পারেনি (ক্যুপ ইন তিউনিসিয়া: ইজ ডেমোক্রেসি লস্ট, ডেমোক্রেসি জার্নাল)।
আরেকটি বড় ব্যর্থতা ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারা। বিপ্লবের সময় ও পরে বেন আলির ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী-রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের অনেক সদস্য দেশত্যাগ করেছিল বা প্রভাব হারিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নতুন অলিগার্ক গোষ্ঠী তৈরি হয়, যারা রাষ্ট্রের মূল অর্থনৈতিক সেক্টরে দখলদারত্ব বজায় রাখে। এছাড়া সংবিধানে যে প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলা হয়েছিল, যেমন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক আদালত, দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতা—এসবের কোনোটিই পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বে এতটাই নিমগ্ন ছিল যে এসব প্রতিষ্ঠান গঠন ও শক্তিশালী করায় অগ্রাধিকার দেয়নি। ফলে সংবিধানের অনেক প্রগতিশীল ধারা কাগজে রয়ে যায়, বাস্তবে প্রয়োগ হয়নি। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জনগণের মৌলিক চাহিদা—কাজ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান—এসবের দিকে মনোযোগ দেয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক মঞ্চে তিউনিসিয়াকে গণতন্ত্রের সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখানো হলেও দেশবাসীর দৈনন্দিন জীবনে সে সাফল্যের প্রতিফলন ছিল না।
ইউরোপ ও আমেরিকা ধরে নেয় স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলেই সব ঠিক হবে। কিন্তু ২০১৯ সালের পর স্পষ্ট হয় সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কেউ আগ্রহী নয়, শিক্ষিত এলিটদের সংস্কারের ঐকমত্যও ততদিনে ভেঙে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদ পুরনো অলিগার্কদের ফিরিয়ে আনেন। ২০২১ সালে তিনি পার্লামেন্ট স্থগিত করে শাসন ব্যবস্থা কার্যত নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন। ২০২২ সালে গণভোটের মাধ্যমে নতুন সংবিধান গৃহীত হয়, যা প্রেসিডেন্টকে বিস্তৃত ক্ষমতা দেয়। যে সংবিধান ২০১৫ সালে নোবেল এনে দিয়েছিল সাত বছরের মাথায় সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে রহিত হয়। ২০২৩ সালের ১৭ এপ্রিল এন্নাহদার শীর্ষ নেতা রাশেদ ঘান্নুশিকে গ্রেফতার করা হয়। বিশ্লেষকদের ভাষায়, তিউনিসিয়ায় ২০১১ সালের বিপ্লব-পরবর্তী সময়কাল নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করেনি; বরং বেন আলি যুগের নিরাপত্তা-ব্যুরোক্রেটিক এলিটদের ধীরে ধীরে ফিরিয়ে এনেছে।
বলা যায়, বহুল বিতর্কের পর ২০১৪ সালের সংবিধান ছিল এক ধরনের ফাঁপা পরিবর্তনের প্রতীক। আন্তর্জাতিক প্রশংসা, নোবেল জয়, প্রগতিশীল ধারা—সবই ছিল, কিন্তু অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো মৌলিক ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ছিল স্পষ্ট। দেখা যায় নিউ লিবারেল অর্থনৈতিক নীতি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আরো বিপদে ফেলেছে, পুরনো অলিগার্ক গোষ্ঠী আবার ফিরে এসেছে, রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র হয়েছে আর সংবিধানের প্রতিশ্রুত অনেক প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়িতই হয়নি। বিপ্লবের যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, তার জায়গায় এসেছে হতাশা ও নতুন রূপের কর্তৃত্ববাদ। যে সংবিধান একসময় আরব বিশ্বের গণতান্ত্রিক মডেল হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত পর্যবসিত হয় ব্যর্থতার দলিল হিসেবে।
ইউরোপ ও আমেরিকা শুরুতে তিউনিসিয়া ও আরব বসন্তকে দেখেছিল সন্দেহের চোখে, পরে উচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে দিয়েছিল, আর দ্রুতই হতাশার দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করেছে। কিন্তু তারা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে—যখন জনগণের অর্থনৈতিক দাবি পূরণ হয় না, জীবনমানের উন্নতি ঘটে না, তখন শুধু ভোটাধিকার দিয়েই স্থিতিশীলতা আসে না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ১০ আগস্ট ‘তিউনিসিয়ার জেসমিন বিপ্লবের ভুলগুলো বাংলাদেশ এড়াতে পারবে কি’ শিরোনামে একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বণিক বার্তা। প্রতিবেদনে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যর্থতা ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে তিউনিসিয়ার ‘জেসমিন বিপ্লবের’ ব্যর্থতার বিষয়টি উঠে আসে। বাংলাদেশেও এসব চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবেলা না করলে একই ধরনের ব্যর্থতার ঝুঁকি রয়েছে বলে মত দেন বিশ্লেষকরা।
‘তিউনিসিয়ার বিপ্লবোত্তর ভুলগুলো এড়াতে পারেনি বাংলাদেশ’ শিরোনামে ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যেখানে তিউনিসিয়ার ব্যর্থতার কারণ তুলে ধরে বাংলাদেশ সেগুলো এড়াতে পারবে কিনা তা বিশ্লেষণ করা হয়। একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর ‘শ্রীলংকা নয় তিউনিসিয়ার পথেই হাঁটছে কি বাংলাদেশ?’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের ছয় মাস পূর্তিতে প্রকাশ করা হয় ‘তিউনিসিয়ার মতো খাদে পড়তে যাচ্ছে কি বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রতিবেদন। যেখানে বিপ্লবোত্তর তিউনিসিয়ার পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি উঠে আসে।
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী গত এক বছরে বাংলাদেশের বাস্তবতায় যে বিচ্যুতি স্পষ্ট হয়েছে, তা তিউনিসিয়ার ব্যর্থতার পথের সঙ্গে বহু ক্ষেত্রে অস্বস্তিকর মিল তৈরি করছে। সে মিল-অমিলের ধারাবাহিকভাবে তূলনামূলক বিশ্লেষণ ও সতর্কতা বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। তিউনিসিয়ার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী ব্যর্থতার পথ ও বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী গতিমুখের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মিল উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তিউনিসিয়ায় ২০১১ সালের ‘জেসমিন বিপ্লব’-পরবর্তী সময়ে ইসলামপন্থী ও উদারপন্থী শক্তির বিভাজন ক্রমেই গভীরতর হয়। সংবিধান প্রণয়নের সময় আপসের মাধ্যমে এক প্রগতিশীল কাঠামো গড়ে উঠলেও পারস্পরিক অবিশ্বাস কখনো কাটেনি। এ মতাদর্শিক বিভাজন শুধু রাজনীতিকে স্থবির করেনি, বরং দেশটিকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেয়।
২০১৪ সালে তিউনিসিয়া সংবিধান প্রণয়ন, ক্ষমতার ভারসাম্য, মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকার—সবই করেছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিতও হয়েছিল। কিন্তু মৌলিক অর্থনৈতিক সংস্কার, আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, জীবনমান উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করায় এবং নতুন রূপে অলিগার্কদের ফিরে আসায় সে বিপ্লব ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অভ্যুত্থান-পরবর্তী গত এক বছরে কিছু অস্বস্তিকর সাদৃশ্য স্পষ্ট হয়েছে। দারিদ্র্যের হার বেড়েছে, বিশেষত শহুরে নিম্ন আয়ের মানুষ ও গ্রামীণ প্রান্তিক শ্রেণী জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। বেকারত্ব ও ছদ্ম বেকারত্বের হারও ঊর্ধ্বমুখী, কর্মসংস্থানের গতি স্থবির। গণ-অভ্যুত্থানের সময় যেসব দাবি ছিল—স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, প্রশাসনিক সংস্কার—সেগুলো ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাচ্ছে। শিল্প খাত অনিশ্চয়তায় ভুগছে, সামাজিক সূচকে অগ্রগতি থমকে আছে, অলিগার্ক ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠী অন্য রূপে ফিরে আসছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান দ্রুত বেড়ে চলেছে।
তিউনিসিয়ায় যে গণ-অভ্যুত্থান একদিন পরিবর্তনের আগুন জ্বেলেছিল, সেটি এখন কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে ব্যর্থতার ভেতরে—যেখানে আশা আর হতাশা কেবল স্থান বদলায়, কিন্তু মুক্তির পথ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সে সংবিধান, সে নোবেলজয়ী ঐক্যের গল্প—সবই আজ তিউনিসিয়ার ইতিহাসে এক ফাঁপা প্রতীকে রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর দাঁড়ানো কাঠামো অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সামাজিক ন্যায্যতার পরীক্ষায় টিকতে পারেনি। পুরনো ক্ষমতাকাঠামো ফিরেছে, বৈষম্য-দারিদ্র্য-অসন্তোষ থেকে গেছে, আর তিউনিসিয়া ঘুরপাক খাচ্ছে ব্যর্থতার চক্রাকার বৃত্তে।
দেওয়ান হানিফ মাহমুদ: সম্পাদক, বণিক বার্তা
[অনুলিখন ও সহায়তায় মাহফুজ রাহমান]