ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দীঘি ইউনিয়নের ভাটবাউর গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছে ডাম্পিং স্টেশন। এর আশপাশে রয়েছে প্রায় ১০০ বিঘা আবাদি জমি। পৌরসভা ও হাসপাতালের বর্জ্য ফেলা হয় এখানে। ডাম্পিং গ্রাউন্ডের চারপাশে দেয়াল না থাকায় আবর্জনা পার্শ্ববর্তী জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ক্লিনিক্যাল বর্জ্য ফেলার কারণে বাতাস, মাটি ও পানি দূষিত হয়। এতে মানুষের শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা, ত্বকের রোগ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের নিজস্ব ডাম্পিং স্টেশন নেই। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ করে। পরে সেগুলো তারা ডাম্পিং স্টেশনে রাখে। তবে নির্দিষ্ট সময় পর বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলার নিয়ম রয়েছে।
মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মানবেন্দ্র সরকার বলেন, ‘এভাবে খোলা জায়গায় ক্লিনিক্যাল বর্জ্য ফেলার ফলে বাতাস, মাটি ও পানি দূষিত হচ্ছে। এতে মানুষের শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা, ত্বকের সমস্যাসহ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ক্লিনিক্যাল বর্জ্যগুলো সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করা না হলে রোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে। এছাড়া বায়ু, মাটি, পানিদূষণসহ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়।’
কৃষকরা বলছেন, হাসপাতালের বর্জ্যের সঙ্গে থাকা সুই, কাচের টুকরো ও রাসায়নিক উপাদান তাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। বর্জ্যের কারণে আশপাশের কৃষকরা ফসল ফলাতে পারছেন না। শত বিঘার বেশি কৃষিজমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যারা আবাদ করছেন তাদের উৎপাদনও কমে গেছে।
ভাটবাউর গ্রামের কৃষক সায়েদুল হক বলেন, ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ডের কারণে আমাদের জমিগুলোতে এখন আর চাষ করা সম্ভব নয়। মাটিতে বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা বহুবার পৌরসভায় অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।’
একই গ্রামের কৃষক রহম আলী বলেন, ‘ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের পরও আমি এখানে সবজিসহ ধান আবাদ করেছি। এখন জমিতে আবর্জনা ছড়িয়ে পড়ায় ১২ বছর ধরে কিছুই আবাদ করতে পারি না।’
একই এলাকার কৃষক হালিম মোল্লা বলেন, ‘ডাম্পিং স্টেশনের পাশেই রয়েছে আমার ৬০ শতাংশ জমি। প্রতিনিয়ত জমিতে আবর্জনা পড়ছে। জমির আকার ছোট হয়ে গেছে। ফসল উৎপাদনও কমে গেছে। শ্রমিকরা জমিতে কাজ করতে চান না। মেডিকেলের আবর্জনা-সুই হাতে বেঁধে।’
মানিকগঞ্জ পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে দুই একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয় পৌরসভার ডাম্পিং গ্রাউন্ড। পৌর এলাকার নয়টি ওয়ার্ডের বাসাবাড়ি, হাসপাতাল, ক্লিনিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আবর্জনা সংগ্রহ করে ওই ডাম্পিং গ্রাউন্ডে ফেলা হয়। পরবর্তী সময়ে একটি প্রকল্প তৈরি করে সেখানে ডাম্পিং স্টেশন স্থাপনে পরিকল্পনা নেয়া হয়। আশপাশের আরো জমি কেনারও পরিকল্পনা নেয়া হয়। ডাম্পিং গ্রাউন্ডের চারদিকে দেয়াল না থাকায় আবর্জনা পার্শ্ববর্তী জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক সানজিদা জেসমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ড সুরক্ষিত করতে ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। সেটি অনুমোদন হলেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হবে।’
সরজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের কাছে ভাটবাউর এলাকায় সড়ক ও পাশের কৃষিজমিতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এসব আবর্জনা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পাশেই রয়েছে মুলজান উচ্চ বিদ্যালয়, মুলজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দীঘি ইউনিয়ন পরিষদ, মসজিদ, মাদ্রাসা, ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর।
ওই এলাকার বাসিন্দা ওয়াসিম মিয়া জানান, এখানকার গজারিয়া বিলটি একসময় শস্য উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত ছিল। কিন্তু ডাম্পিং স্টেশন হওয়ার কয়েক বছর পর থেকে তারা সঠিক সময়ে কোনো ফসল চাষাবাদ করতে পারছেন না। নির্দিষ্ট জায়গায় আবর্জনা না ফেলায় জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে তিন ফসলি জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এসব আবর্জনা পরিষ্কারের জন্য কোনো শ্রমিকও পাওয়া যায় না। যারা একবার কাজে আসেন, তারাও পরদিন কাজ ছেড়ে চলে যেতে চান। প্রায় ১০০ বিঘার মতো জমি ডাম্পিং স্টেশনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দীঘি ইউনিয়নের বাসিন্দা আক্কাস আলী বলেন, ‘এক যুগ ধরে পৌরসভার আবর্জনা কৃষিজমিতে ফেলে পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। দিন দিন ময়লা ফেলার পরিমাণও বাড়ছে। এলাকার লোকজন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। সেই সঙ্গে আশপাশের কৃষিজমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অন্যসব এলাকায় বসতি বাড়লেও দুর্গন্ধের কারণে এ এলাকায় কেউ আসতে চায় না। দ্রুত এর সমাধান না হলে জমির মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’