সাবেক আমলা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান চলতি দায়িত্ব হিসেবে ব্যাংকটির পর্ষদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান না থাকার পাশাপাশি যেকোনো মুহূর্তে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে পরিবর্তন আসতে পারে—এ শঙ্কা থেকে সোনালী ব্যাংকের কার্যক্রমেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি না বেড়ে উল্টো ১১ হাজার কোটি টাকা কমে গেছে।
কেবল সোনালী ব্যাংকই নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতিও প্রায় একই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এরই মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাস বা ১৮০ দিন পূর্ণ হয়েছে। এ সময়ে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার কিংবা কার্যকর সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের তরফে তেমন কোনো তৎপরতা দৃশ্যমান হয়নি। সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বাংলাদেশ কৃষিসহ অন্য সরকারি ব্যাংকগুলোর নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতে পারে—এ শঙ্কা থেকে ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের মধ্যে ‘চেইন অব কমান্ড’ কাজ করছে না।
আবার সরকারের পক্ষ থেকে মেয়াদ পূর্ণ করার নিশ্চয়তা না পাওয়ায় বর্তমান চেয়ারম্যান-এমডিরাও কঠোর হতে পারছেন না। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম চলছে অনেকটা দায়সারাভাবে। আমানত সংগ্রহ, রেমিট্যান্স আহরণ ও বিতরণ, সরকারি ঋণপত্র (এলসি) খোলা, ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ ও সরকারি বিভিন্ন সেবা প্রদানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে এসব ব্যাংকের কার্যক্রম। সরকারি ব্যাংকগুলো থেকে বেসরকারি খাত তথা উদ্যোক্তাদের মাঝে ঋণ বিতরণ একেবারেই থমকে গেছে। এর প্রভাবে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণ স্থিতি না বেড়ে উল্টো কমছে।
প্রায় ছয় মাসেও সোনালী ব্যাংকে একজন চেয়ারম্যান নিয়োগ না দিতে পারাকে সরকারের বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) ও অর্থ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাবেক এ আমলা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত ২ মার্চ আমি সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ ছেড়েছি। সে হিসাবে সাড়ে পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো দেশের বৃহত্তম ব্যাংকটিতে সরকার চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে পারেনি। এটি বড় ব্যর্থতা।’
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, ‘এমনিতেই দেশের ব্যাংক খাত অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের ভারে বিধ্বস্ত-বিপর্যস্ত। সরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের অর্ধেক খেলাপি হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে কেবল “প্যারাসিটামল” দিলে হবে না, বরং “কোরামিন” দিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কারে কঠোর পদক্ষেপ নেবে, এমনটাই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু গত ছয় মাসে আমরা কিছুই দেখিনি।’
দেশে সরকারের মালিকানাধীন তফসিলি ব্যাংক রয়েছে ৯টি। এর মধ্যে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসাবে পরিচিত। আর বিশেষায়িত তিন ব্যাংক হলো বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। এর বাইরে তফসিল-বহির্ভূত ব্যাংক রয়েছে আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক।
গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলে সরকারের মালিকানাধীন এ ব্যাংকগুলোতে একের পর এক বৃহৎ আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়েছে। সুশাসনের সীমাহীন ঘাটতির পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে কয়েকটি ব্যাংক দেউলিয়াত্বের মুখে পড়েছে। এর মধ্যে জনতা ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের পরিস্থিতি একেবারেই নাজুক। বিপর্যস্ত পরিস্থিতি রয়েছে অগ্রণী, রূপালী, বিকেবি, রাকাবসহ অন্য ব্যাংকগুলোরও। এক্ষেত্রে কিছুটা ভালো অবস্থানে আছে কেবল সোনালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ৯ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। এ ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৪৫ দশমিক ২০ শতাংশই এখন খেলাপি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সরকারি সবক’টি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিদের সরিয়ে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। পরে সবক’টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের পাশাপাশি এমডি নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগ দেয়া নতুন চেয়ারম্যান ও এমডিদের অনেকের যোগ্যতা-দক্ষতা নিয়ে ওই সময়েই অভিযোগ ওঠে। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে গভর্নর পদে দায়িত্ব দেয়া হয় মো. মোস্তাকুর রহমানকে। এরপর ডেপুটি গভর্নর পদেও পরিবর্তন আনা হয়।
সরকারের নেয়া এসব পদক্ষেপে শুরু থেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পদে পরিবর্তনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২ মার্চ পদত্যাগ করেন সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যানও পদত্যাগ করেন। এমডি পদে পরিবর্তন আসতে পারে—এ শঙ্কা থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ডিএমডিদের অনেকে সরকারের বিভিন্ন মহলে তদবির শুরু করেন।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, গত ছয় মাস ধরেই শোনা যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সরকার নতুন এমডি নিয়োগ দেবে। একই সঙ্গে চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সরকার ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় তেমন কোনো পরিবর্তন আনেনি। সরকারের দিক থেকে কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা বা সিদ্ধান্ত না আসায় সবক’টি ব্যাংকের কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বর্তমান এমডিরাও স্বাধীনভাবে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
ঋণ বিতরণসহ ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসার বিষয়টি ব্যাংকগুলোর আর্থিক সূচকেও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। রূপালী ব্যাংকের প্রকাশিত চলতি বছরের অর্ধবার্ষিক (জানুয়ারি-জুন) প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণ স্থিতি বেড়েছে মাত্র ৮৯২ কোটি টাকা। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ৫১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা ছিল। চলতি বছরের জুনে এসে এ স্থিতি ৫২ হাজার ২০৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যদিও একই সময়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সরকারি ব্যাংকটির বিনিয়োগ স্থিতি ২২ হাজার ৭৫২ কোটি থেকে বেড়ে ২৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। বিনিয়োগ বলতে কেবল সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড কিনছে রূপালী ব্যাংক। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ৬১১ কোটি টাকার পরিচালন লোকসান গুনেছে ব্যাংকটি।
নতুন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে রূপালীর চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি সোনালী ব্যাংকের। গত জুনে সরকারি খাতের সর্ববৃহৎ এ ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল মাত্র ৯৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকটির ঋণ-আমানত অনুপাত বা এডি রেশিও এখন ৫০ শতাংশেরও নিচে। গত ডিসেম্বর শেষে সোনালী ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণ স্থিতি ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা ছিল। সে হিসাবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ঋণ না বেড়ে উল্টো প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা কমে গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শওকত আলী খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঋণ স্থিতি দেখলে মনে হবে, সোনালী ব্যাংক নতুন কোনো ঋণই বিতরণ করেনি। কিন্তু সত্য হলো চলতি বছরে আমরা প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার নতুন ঋণ বিতরণ করেছি। সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১৫ শতাংশের ঘরে। খেলাপি ও নিয়মিত ঋণ থেকে আমাদের আদায় ভালো। এ কারণে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি বাড়েনি। অবশ্য ঋণ স্থিতি এতটা কমে যাওয়ার পেছনে সরকারের কিছু এলটিআর সমন্বয় হওয়ার ভূমিকাই বেশি।’
অগ্রণী ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথমার্ধে রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংকটিরও বিতরণকৃত ঋণ স্থিতি না বেড়ে উল্টো কমে গেছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির ঋণ স্থিতি ছিল ৮০ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে এ স্থিতি ৮০ হাজার ৮৩ কোটি টাকায় নেমেছে।
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ছয় মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে কোন সংস্কার দৃশ্যমান হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী আমলে সৃষ্ট গ্লানি ও ক্ষত এত দ্রুত কাটিয়ে ওঠা খুবই কঠিন। যে ছিদ্র বা গর্তগুলো দিয়ে অগ্রণী ব্যাংকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে অর্থ বের হয়ে যেত, সেগুলো বন্ধ হয়েছে। ২০০৯ সাল-পরবর্তী ১৫ বছরে কেবল অগ্রণী ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যার অর্ধেকের বেশি এখন খেলাপি। পুনঃতফসিল ও আদায়ের মাধ্যমে আমরা খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। তবে পরিশ্রম ও প্রত্যাশার তুলনায় খেলাপি ঋণ আদায়ের পরিমাণ খুবই কম।’
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কারের পাশাপাশি চেয়ারম্যান-এমডি পদে নতুন নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার কার্যক্রম আমরা অনেকটাই গুছিয়ে এনেছি। শিগগিরই এর ফলাফল দৃশ্যমান হবে।’
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত সরকারের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পদোন্নতি হয়েছে ঘুস ও দলীয় বিবেচনায়। এ কারণে যোগ্য কর্মকর্তারা ডিজিএম পদ থেকে উপরে উঠতে পারেননি। এখন ডিএমডিদের মধ্যে এমডি হওয়ার যোগ্য নির্বাহী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদেরও বিবেচনা করা হতে পারে। অতীতে এ ধরনের নজিরও রয়েছে।