পাইপলাইন কেটে তেল চুরি

নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজে অনিয়ম পেয়েছে তদন্ত কমিটি

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা ও বেসরকারি নিরাপত্তা প্রহরা থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিতভাবে পাইপলাইনে ছিদ্র করে দীর্ঘ সময় ধরে তেল চুরি করা হয়েছে। অথচ এ পুরো সময় বিষয়টি দায়িত্বরত কোনো কর্মকর্তা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার নজরে আসেনি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চট্টগ্রাম–ঢাকা জ্বালানি পরিবহন পাইপলাইনে ডিজেল চুরির ঘটনায় পাইপলাইন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুতর দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বড় তাকিয়া এলাকায় সংঘটিত এ ঘটনায় অন্তত ৫ হাজার ৬৩৭ লিটার ডিজেল ঘাটতির হিসাব পাওয়া গেছে।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা ও বেসরকারি নিরাপত্তা প্রহরা থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিতভাবে পাইপলাইনে ছিদ্র করে দীর্ঘ সময় ধরে তেল চুরি করা হয়েছে। অথচ এ পুরো সময় বিষয়টি দায়িত্বরত কোনো কর্মকর্তা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার নজরে আসেনি।

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি (পিটিসি) পিএলসির এক চিঠির প্রেক্ষিতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা ডিপোর উদ্দেশ্যে মোট ১৪ লাখ ১৯ হাজার ৬২ লিটার ডিজেল পাঠানো হলেও সেখানে পৌঁছায় ১৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯১২ লিটার। লাইনপ্যাক ও উদ্ধার করা তেল হিসাব করেও প্রায় ৫ হাজার ৬৩৭ লিটার ডিজেল ঘাটতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত ৭ ও ৮ জানুয়ারি চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা ডিপোতে ডিজেল পাম্পিং চলাকালে মীরসরাই উপজেলার হাদিফকিরহাট এলাকায় পাইপলাইনে অবৈধ সংযোগ স্থাপন করে তেল চুরি করা হয়। নিরাপত্তা কর্মীদের মাধ্যমে খবর পেয়ে পিটিসি পিএলসির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পান, একটি অস্থায়ী টিনশেড ঘরের ভেতর থেকে ক্রমাগত ডিজেল বেরিয়ে আসছে এবং তেল পাশের একটি ডোবায় ছড়িয়ে পড়েছে। পরবর্তী সময়ে পাইপলাইনের ওপর থেকে মাটি খনন করে দেখা যায়, পাইপলাইনে প্রায় ৮ মিলিমিটার ছিদ্র করে ২ ইঞ্চি চওড়া একটি ক্ল্যাম্প বসানো হয়েছে। ওই ক্ল্যাম্পের সঙ্গে একটি স্টিল পাইপ, ভাল্ব এবং প্রায় ২০ ফুট দীর্ঘ হোজ পাইপ সংযুক্ত ছিল, যার মাধ্যমে তেল সংগ্রহ করা হচ্ছিল। ঘটনাস্থল থেকে এক হাজার ১৬০ লিটার ডিজেল ছাড়াও ড্রিল মেশিন, ওয়েল্ডিং রড, হ্যান্ড পাম্প, প্রেশার গেজসহ বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি উদ্ধার করা হয়। এসব আলামতে প্রমান হয় যে এই তেল চুরি ছিল দীর্ঘসময় ধরে করা হচ্ছিল এবং কাজটি পরিকল্পিত ভাবে করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, ঘটনার সময় পাইপলাইনের নিরাপত্তায় ব্যবহৃত লিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা কোনো ধরনের সংকেত দেয়নি। একইভাবে পাইপলাইন অনুপ্রবেশ শনাক্তকরণ ব্যবস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করেও সংশ্লিষ্ট স্থানে খনন বা অনুপ্রবেশের কার্যকর সংকেত পাওয়া যায়নি। অথচ বাস্তবে পাইপলাইনের একেবারে গা ঘেঁষে খনন করে ছিদ্র করা হয়েছিল। তদন্তে দেখা গেছে, গত তিন মাসে পাইপলাইন অনুপ্রবেশ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা অন্তত ১০৮ বার অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং লিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা টানা ৪৯ দিন বন্ধ ছিল। এছাড়া নিয়ন্ত্রণকক্ষে প্রতিদিন হাজার হাজার সংকেত আসায় একজন শিফট ইঞ্জিনিয়ারের পক্ষে প্রকৃত ঝুঁকিপূর্ণ সংকেত আলাদা করে শনাক্ত করতে পারেনি। মূলত সড়ক ও জনপথ বিভাগের জমির ওপর দিয়ে পাইপলাইন স্থাপিত হওয়ায় যানবাহনের চলাচল ও আশপাশের যান্ত্রিক কর্মকাণ্ড থেকেও বিপুল ভুয়া সংকেত তৈরি হয়। এ ভুয়া সংকেতের কারণে চুরির সংকেতটি নজরে আসেনি।

পাইপলাইনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বেসরকারি ঠিকাদার জেএসএস সার্ভিসেস লিমিটেডের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। ঘটনাস্থলে যে অস্থায়ী টিনশেড ঘরটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তা অন্তত দুই থেকে তিন মাস আগে তৈরি হলেও বিষয়টি নিরাপত্তা টহল প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে সেটি উল্লেখ করেনি জেএসএস সার্ভিস। তাছাড়া কমিটি জেএসএসের কর্মকর্তা, গার্ড কমান্ডার ও প্যাট্রোলম্যানদের বক্তব্যে নেওয়ার সময় তাদের বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতিও পায়। এই অসংগতি নিরাপত্তা দেওয়া প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এমন তথ্য উঠে এসেছে তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে।

পাইপলাইনের রাইট অব ওয়ে ঘিরে দীর্ঘদিনের সংকটও তদন্তে ওঠে এসেছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের জমিতে পাইপলাইনের গা ঘেঁষে অসংখ্য অবৈধ দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনার কারণে পাইপলাইনের ওপর কার্যকর নজরদারি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যৌথ পরিদর্শনে পাইপলাইনের রাইট অব ওয়ের ভেতরে অন্তত ১১৪টি স্থানে ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যদিও জমি অধিগ্রহণ অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছে। বারবার তাগেদা দেওয়া সত্ত্বেও দখলদাররা জমির ভোগদখল ছাড়ছে না বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর পিটিসি পিএলসি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নকে (২৪ ইসিবি) জানায়, পাইপলাইন নিরাপত্তা ও মনিটরিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত অপটিকাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপনে গুরুতর অনিয়ম রয়েছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো ওএফসি ক্যাবলে ৬০টি জয়েন্ট কিট এবং এম আর জেড ক্যাবলে ৪০টি জয়েন্ট কিট বসিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি চার কিলোমিটার পরে একটি জয়েন্ট কিট বসানোর নিয়ম থাকলেও ঠিকাদাররা নিয়মের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত জয়েন্ট কিট বসিয়েছে পাইপলাইনে। এতে করে এই তিন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অ্যারিডোড টেকনিক্যাল সার্ভিসেস লিমিটেড, পিডিএল, আহাদ বিল্ডার্স এবং এম আর জেড লেইং ঠিকাদারের স্থাপিত অপটিকাল ফাইবার ক্যাবলে অস্বাভাবিক সংখ্যক জয়েন্ট কিট ব্যবহারের কারণে টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্কে বারবার যোগাযোগ বিঘ্ন ঘটছে।

তদন্ত কমিটির প্রতিবদনে বলছে, এই যোগাযোগ বিঘ্নের ফলে পাইপলাইন ইনট্রুশন ডিটেকশন সিস্টেম (পিআইডিএস), সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডাটা অ্যাকুইজিশন সিস্টেম (স্কাডা), লিক ডিটেকশন সিস্টেম (এলডিএস) এবং সিসিটিভি ব্যবস্থা সঠিক ভাবে চলছে না যার কারণে পুরো পাইপলাইন নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এ অতিরিক্ত জয়েন্ট কিটের বিষয়টি সমাধানে গত ৯ই অক্টোবর চিঠি দিলেও বিষয়টির কোন সমাধান হয়নি।

তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে পাইপলাইন নিরাপত্তা জোরদারে একাধিক সুপারিশ করেছে। এতে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য নিরাপত্তা ঠিকাদার জেএসএস সার্ভিসেস লিমিটেডের বিরুদ্ধে চুক্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ, সড়ক ও জনপথ বিভাগের জমি এবং বিপিসির অনুকূলে অধিগ্রহণকৃত ভূমিতে পাইপলাইনের সন্নিকটে গড়ে ওঠা ঘরবাড়ি, দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও গাছপালা দ্রুত অপসারণ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার্স কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের নিয়োজিত ভেন্ডর বেঞ্চমার্ক কনসালটিংয়ের মাধ্যমে পাইপলাইন ইনট্রুশন ডিটেকশন সিস্টেম ও লিক ডিটেকশন সিস্টেমের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, একই সঙ্গে নিউটেক ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে পাইপলাইনের ইনস্ট্রুমেন্টসমূহ রক্ষণাবেক্ষণ ও অনুপস্থিত যন্ত্রাংশ দ্রুত স্থাপন করা, অপটিকাল ফাইবার ক্যাবল অকার্যকর হওয়ায় তা দ্রুত প্রতিস্থাপন, অভিজ্ঞ জনবল নিয়োগ করে পৃথক নিরাপত্তা টিম গঠন, রাইট অব ওয়ে সুরক্ষায় নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন, পিটিসি পিএলসির অধীনে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ এবং পাইপলাইন বরাবর চেইনেজ পোস্ট হালনাগাদ করে কন্ট্রোলরুমের মোবাইল নম্বর সংযুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে সুপারিশে।

তদন্ত কমিটির সভাপতি সিডিপিএলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আমিনুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, মিরসরাইয়ে তেল চুরির ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে আমরা বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়ম পেয়েছি। নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের কাজে গাফিলতি, পাইপলাইন নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মের বেইরে গিয়ে ক্যাবল বসানোসহ বিভিন্ন অনিয়ম আমরা পেয়েছি। বিষয়গুলো সমাধানে কি কি করতে হবে সেটা বলা হয়েছে। বিপিসির এত বড় প্রকল্প সেখানে যে যে অনিয়মগুলো হয়েছে সেগুলো কোনোভাবে কাম্য নয়। আমরা সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদসহ সমস্যা সমাধানে কাজগুলো করব। পাইপলাইনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে আরো বড় পদক্ষেপ নিতে হবে বলে জানান তিনি।

আরও