বিশেষ করে জার্মানি ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশে ব্যবহারিক শিক্ষায় ডিজিটাল সিমুলেশনের ব্যবহার ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাংলাদেশেও এক দশক ধরে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও ক্ষমতা গ্রহণের পর এ খাতকে অগ্রাধিকার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানে ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রয়োজনীয় সুবিধা নেই। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, যেসব প্রতিষ্ঠানে এ সুবিধা রয়েছে, সেগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই সংযোগ ও সরঞ্জামের মান সন্তোষজনক নয়।
‘শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৯ হাজার ৩১০টি। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান ১ হাজার ১০১টি এবং বেসরকারি ৮ হাজার ২০৯টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৩০ দশমিক ৮৮ শতাংশে পাঠদানে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে। বিপরীতে ৬৯ দশমিক ১২ শতাংশ বা প্রায় ৭০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানেই এ সুবিধা নেই। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল সুবিধার আওতা বাড়াতে দেশের ২ হাজার ৪১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন করে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী মো. তারিকুল হাকিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের সব শিক্ষার্থীর জন্য কম্পিউটার শিক্ষা বাধ্যতামূলক। কারিগরি শিক্ষায় হাতে-কলমে শেখার বিষয়টি মুখ্য। তাই শুধু কম্পিউটার শিক্ষা নয়, অন্যান্য বিষয়েও মানসম্মত পাঠদানের জন্য ইন্টারনেটের ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়ে। কোনো প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সুবিধা না থাকলে সেখানকার শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় পাঠদানে ইন্টারনেট ব্যবহারের কিছু সুযোগ-সুবিধা থাকলেও অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তা সীমিত। এসব সুবিধা আরো বাড়ানো প্রয়োজন।’
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের ডিজিটালাইজেশন উদ্যোগ বাস্তবায়নে সবার আগে প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অবকাঠামোগত এ বৈষম্যের কারণে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার অঙ্গীকার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, ‘কারিগরি শিক্ষায় ইন্টারনেট সংযোগ কোনো বাড়তি সুবিধা নয়; এটি এখন পাঠদানের মৌলিক মাধ্যম। বিশ্বজুড়ে কী ধরনের উদ্ভাবন হচ্ছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিক তথ্য ও মানসম্মত টিউটোরিয়াল পাওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ইন্টারনেট। বাজেট ও জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে ব্যয়বহুল আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা বা স্থাপন করা সম্ভব হয় না। ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে অনলাইন সিমুলেশন ও ভার্চুয়াল ল্যাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জটিল প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্যবহারিক প্রয়োগ অনুশীলন করতে পারে। ফলে ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের আধুনিক ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে।’
দেশের মূলধারার মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা সাধারণ, মাদরাসা ও কারিগরি—মূলত এ তিন ধারায় বিভক্ত। এর মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় ব্যবহারিক পাঠের সম্পৃক্ততা তুলনামূলক বেশি। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, এ ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেই পাঠদানে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা সবচেয়ে কম। ‘শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪’ অনুযায়ী, প্রায় ৬৯ শতাংশ সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। মাদরাসার ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৪৯ শতাংশ। বিপরীতে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ সুবিধা রয়েছে মাত্র ৩০ দশমিক ৮৮ শতাংশে।
শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে পাঠদানে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ থাকা জরুরি বলে মনে করেন পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন ডালি। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কারিগরি শিক্ষা ব্যবহারিকনির্ভর হওয়ায় এ ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি। অথচ দেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই আধুনিক ল্যাব ও যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষার্থীদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়ার সুযোগও সীমিত। ডিজিটাল সিমুলেশনের মাধ্যমে এসব সীমাবদ্ধতা অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলে সে সুযোগও কাজে লাগানো যাবে না।’
উন্নত ও উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশ কারিগরি শিক্ষায় ইন্টারনেট প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে শ্রমবাজারকে আধুনিক করে তুলছে। জার্মানির ‘ডুয়াল ভোকেশনাল ট্রেনিং’ ব্যবস্থায় ইন্টারনেট ও অগমেন্টেড রিয়ালিটি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের মেকানিক্যাল ও ন্যানোটেকনোলজির জটিল যন্ত্রপাতি পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। দেশটির ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের ইনোভেট প্রকল্পের আওতায় গড়ে তোলা ‘ভার্চুয়াল টেকনোলজি ল্যাব’ এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সেখানে প্রকৃত কারখানায় কাজ শুরুর আগেই ভার্চুয়াল সিমুলেশনের মাধ্যমে ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশে জটিল যন্ত্রপাতি পরিচালনা শিখছে শিক্ষার্থীরা।
সিঙ্গাপুরের ‘ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল এডুকেশন’ ও ‘স্কিলসফিউচার’ উদ্যোগের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই ক্লাউড কম্পিউটিং, ডিজিটাল সিমুলেশন ও ইন্টারনেটভিত্তিক প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ইউনেস্কোর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, আফ্রিকা ও এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোয় ডিজিটাল টিভিইটি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ফলে তরুণদের কর্মসংস্থানে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরিশাল বিভাগের একটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান বলেন, ‘কারিগরি শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সুবিধার কথা আমরা দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে আসছি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। এমনকি যে ৩০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে বলা হচ্ছে, সেই হিসাব নিয়েও প্রশ্ন আছে। আগে মূলত সরকারি প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সুবিধা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেয়া হয়েছিল। তবে অনেক ক্ষেত্রেই সরবরাহ করা পণ্যের মান ভালো ছিল না। এমন সরঞ্জামও দেয়া হয়েছে, যা একবার ব্যবহারের পরই নষ্ট হয়ে গেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েও অনেক ক্ষেত্রে সমাধান পাওয়া যায়নি। ফলে কাগজে-কলমে অনেক প্রতিষ্ঠানে সুযোগ-সুবিধা থাকলেও বাস্তবে সেগুলো কার্যকর নেই।’
সার্বিক বিষয়ে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রুহুল আমীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের ব্যবহার এখন অপরিহার্য। এটি ছাড়া শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা দিয়ে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এরই মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয়ও এ সুবিধা নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। ধাপে ধাপে শতভাগ প্রতিষ্ঠানকে ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় আনা হবে।’
ইন্টারনেট সংযোগ ও সরঞ্জামের মান নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রকল্পগুলোয় মানসম্মত পণ্য সরবরাহের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ফলে অতীতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে আমরা আশাবাদী। পাশাপাশি সরবরাহ করা পণ্য ও সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে।’