চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগ

চিকিৎসক সংকটে সাত বছরে রোগী কমেছে ৫২ শতাংশ

চট্টগ্রামের জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক সংকটে শিশু স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধস নেমেছে।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, গত সাত বছরে এখানে শিশু রোগীর সংখ্যা কমেছে ১২ হাজার ৫৬০ জন, যা মোটের ওপর ৫১ দশমিক ৭০ শতাংশ। বর্তমানে মাত্র তিনজন চিকিৎসক দিয়ে বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও শিশু ওয়ার্ড চালাতে হচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে অন্য হাসপাতালে, বিশেষ করে সরকারি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালমুখী হচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, চিকিৎসক সংকট ও সেবা সীমিত হয়ে পড়ায় জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগে চিকিৎসা কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে সংকুচিত হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা না পেয়ে অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে শিশুদের নিয়ে চমেক হাসপাতালসহ নগরীর অন্যান্য হাসপাতালে ছুটছেন। এতে একদিকে যেমন অভিভাবকদের ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে চমেক হাসপাতালেও তৈরি হয়েছে রোগীর বাড়তি চাপ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক ডা. মাহফুজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালকে নিয়ে স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের কোনো পরিকল্পনা নেই। নয়তো এত বড় একটি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেয়া হতো। জেনারেল হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেয়ে রোগীরা চমেকে চলে যাচ্ছেন। চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল সংকটে সেবাপ্রার্থীরা বিকল্প হাসপাতালের দিকে ঝুঁকছেন। শিশু চিকিৎসা স্পর্শকাতর হওয়ায় অভিভাবকরা কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। সে কারণে চমেকে চিকিৎসকের পাশাপাশি অন্যান্য সেবা বেশি পাওয়ায় রোগীরা সেদিকে যাচ্ছেন। সরকারের উচিত জেনারেল হাসপাতালকে চমেকের বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা।’

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তথ্যমতে, নগরীর আন্দরকিল্লা এলাকায় অবস্থিত ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট এ হাসপাতালে ২০১৯ সালে (শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী) প্রায় ২৪ হাজার ২৯৩ জন শিশু চিকিৎসা নেয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে মাত্র ১১ হাজার ৭৩৩ জন শিশু এ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে। গত সাত বছরে শিশু রোগী কমেছে ১২ হাজার ৫৬০ জন বা ৫১ দশমিক ৭০ শতাংশ। ২০১৯ সালের দিকে চিকিৎসা নিতে আসা বেশির ভাগ শিশুই ছিল নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। তবে ক্রমশ রোগী কমে যাওয়ায় এখন সব ধরনের রোগী হাসপাতালে ভিড় করছে।

হাসপাতালের তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে ২০ হাজার ২৩৪ জন, ২০১৮ সালে ২২ হাজার ৩৩২, ২০১৯ সালে রেকর্ড ২৪ হাজার ২৯৩ জন শিশু জেনারেল হাসপাতালের বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করে। ২০২২ সালে ১৫ হাজার ৬২৮ জন, ২০২৩ সালে ২২ হাজার ৯৯৬, ২০২৪ সালে ১৪ হাজার ৪৭৪ এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে ১১ হাজার ৭৩৩ জন শিশু চিকিৎসা নেয়। তবে ২০২০ ও ২০২১ সালে হাসপাতালে কভিড চিকিৎসার জন্য বিশেষভাবে বরাদ্দ দেয়া হলেও সেখানে সীমিত পরিসরে শিশু রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়।

এদিকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হলেও নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার রোগীই বেশি ছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ সালে নিউমোনিয়ায় ৩ হাজার ৪২৫ জন ও ডায়রিয়ায় ৩ হাজার ৮২৬ জন শিশু চিকিৎসাসেবা নেয়। ২০১৮ সালে নিউমোনিয়ায় ৩ হাজার ৫২২ জন ও ডায়রিয়ায় ৪ হাজার ২৫ জন, ২০১৯ সালে নিউমোনিয়ায় ৩ হাজার ৩৪৭ ও ডায়রিয়ায় ৪ হাজার ১০০, ২০২২ সালে নিউমোনিয়ায় ৮৭১ ও ডায়রিয়ায় ১ হাজার ২৯৩, ২০২৩ সালে নিউমোনিয়ায় ১ হাজার ৪৬১ ও ডায়রিয়ায় ১ হাজার ৩৬৪, ২০২৪ সালে নিউমোনিয়ায় ১ হাজার ৩৬৬ ও ডায়রিয়ায় ৫৩৪ এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে নিউমোনিয়ায় ১ হাজার ১১৬৪ জন ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৪৭৭ জন চিকিৎসা গ্রহণ করে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ৫২ শয্যাবিশিষ্ট শিশু ওয়ার্ড থাকলেও সেখানে মেডিকেল অফিসারের পদ এখন শূন্য। মাত্র একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও দুজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট দিয়ে শিশু ওয়ার্ড চালাতে হচ্ছে। এ তিনজন চিকিৎসক দিয়েই বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ডের শিশুদের চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে।

শিশু রোগীর সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রসঙ্গে দায়িত্বরতরা জানান, যেখানে ১০-১৫ জন চিকিৎসক প্রয়োজন, সেখানে মাত্র তিনজন দিয়ে বিভাগ পরিচালনা করা হচ্ছে। এখন জরুরি বিভাগে একজন দায়িত্ব পালন করলে আরেকজন বহির্বিভাগ দেখেন এবং অন্যজন ওয়ার্ডে ভর্তি শিশুদের চিকিৎসা দেন। জরুরি চিকিৎসার জন্য কোনো মেডিকেল অফিসার নেই। ফলে বিকাল বা রাতে জরুরি সেবার প্রয়োজন হলে চিকিৎসক পাওয়া যায় না। এ কারণে রোগীরা জেনারেল হাসপাতালে এসে পরে অন্যত্র চলে যান।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেন বলেন, ‘হাসপাতালটি নানা সংকটে রয়েছে। নিরাপত্তার কারণে রোগীরা ভর্তি হলেও পরে অন্যত্র চলে যান। পুরনো অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী হাসপাতাল পরিচালনা করতে হচ্ছে, যার কারণে বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসক সংকট রয়েছে। বিষয়টি সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক ও লজিস্টিক সুবিধার অভাব রয়েছে। বর্তমানে হামের প্রকোপ বাড়ায় অনেক শিশু চমেকে চিকিৎসা নিচ্ছে। সেখানে প্রতিদিন হামের উপসর্গ নিয়ে ৫০ জনের বেশি শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। অন্যদিকে জেনারেল হাসপাতালে এ ধরনের রোগী খুবই কম।

সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘জেনারেল হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা বাড়াতে কাজ চলছে। চিকিৎসকস্বল্পতার কারণে সেবা ব্যাহত হচ্ছে। নতুন চিকিৎসক পদায়ন, সংযুক্তি বাতিল করে চিকিৎসকদের ফিরিয়ে আনা এবং জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জেনারেল হাসপাতালকে চট্টগ্রামের একটি বিকল্প স্বাস্থ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পরিকল্পনা রয়েছে।’

আরও