চাকরির ক্ষেত্র নেই, হতাশায় পালি, উর্দু, সংস্কৃত ও ফারসি বিভাগের শিক্ষার্থীরা

স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী ইশারাত জাহান সমাপ্তি (ছদ্মনাম)। পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বৌদ্ধ শিক্ষা বিভাগে। পড়াশোনা শেষে চাকরির অনিশ্চয়তা নিয়ে কাটছে তার দিন।

স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী ইশারাত জাহান সমাপ্তি (ছদ্মনাম)। পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বৌদ্ধ শিক্ষা বিভাগে। পড়াশোনা শেষে চাকরির অনিশ্চয়তা নিয়ে কাটছে তার দিন। শুধু তিনি নন, এ বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা প্রায় সব শিক্ষার্থীই চরম হতাশায় ভুগছেন। পড়াশোনা শেষে সুনির্দিষ্ট চাকরির ক্ষেত্র না থাকাটা তাদের হতাশার কারণ।

সমাপ্তি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভাগের বিশেষায়িত ক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ নেই বললেই চলে। স্কুল-কলেজে হাতেগোনা কিছু পালি শিক্ষক পদ থাকলেও চাকরিপ্রার্থী অনেক। আবার বৌদ্ধ দর্শন পড়লেও চাকরির ভাইভায় শুধু পালি ভাষা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, যেখানে অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে থাকে।’ তার মতে, পালি ও বৌদ্ধ শিক্ষা বিভাগের মতো বিষয়গুলো বাস্তবমুখী প্রস্তুতির অভাবে শিক্ষিত বেকার তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে।

শুধু পালি ও বৌদ্ধ শিক্ষা বিভাগ নয়, উর্দু, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য এবং সংস্কৃত বিভাগের অধিকাংশ শিক্ষার্থী একই কারণে হতাশায় ভুগছেন। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংস্কৃত, পালি ও বৌদ্ধ শিক্ষা, উর্দু এবং ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের গ্র্যাজুয়েটদের জন্য বিশেষায়িত কোনো কর্মক্ষেত্র নেই বললেই চলে। বিসিএস ও সরকারি-বেসরকারি চাকরি ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না তাদের হাতে। ফলে এ দুই বিভাগের প্রায় সব গ্র্যাজুয়েট সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, যা তাদের পঠিত বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়।

দেশের প্রধান তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়—ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রামে এ চার বিভাগে প্রতি বছর ৬১১ শিক্ষার্থী ভর্তি হন। এ বিভাগগুলোয় বর্তমানে ১০৮ শিক্ষকের অধীনে তিন হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এর মধ্যে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগে যথাক্রমে ৩৫০ ও ২০০ শিক্ষার্থী রয়েছেন। ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে যথাক্রমে ৩৭৫, ২৭০ ও ২৫০ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে যথাক্রমে ৩০০, ২৫৫, ৩৫০ শিক্ষার্থী রয়েছেন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বৌদ্ধ শিক্ষা বিভাগে পড়ছেন যথাক্রমে ২৫০ ও ৪২৫ জন শিক্ষার্থী।

এ বিভাগগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে। সে সময় ‘সংস্কৃত স্টাডিজ এবং সংস্কৃত ও বাংলা’ নামে একটি বিভাগ ছিল। ১৯৩১ সালে যা ‘সংস্কৃত ও বাংলা’ নাম ধারণ করে। ১৯৩৭ সালে বাংলা ও সংস্কৃত পৃথক দুটি বিভাগে পরিণত হয়। সে সময় বর্তমানের সংস্কৃতি বিভাগের নাম ছিল সংস্কৃতি ও পালি বিভাগ। ২০০৭ সালে আরেকটি ভাঙনের পর ‘সংস্কৃত’ এবং ‘পালি ও বৌদ্ধ শিক্ষা’ বিভাগ নামে দুটি পৃথক বিভাগ চালু হয়। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত এ দুই বিভাগে যথাক্রমে ১০০ ও ৯০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হতো। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ৬০ ও ৫০ জন করে শিক্ষার্থী নেয়া হচ্ছে। এছাড়া রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত বিভাগে প্রতি বছর যথাক্রমে ৫৬ ও ৭০টি আসন রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বৌদ্ধ শিক্ষা বিভাগে আসন রয়েছে ৪০টি।

১৯২১ সালে ‘ফারসি ভাষা ও সাহিত্য ও উর্দু’ নামে যাত্রা শুরু করা বিভাগে ফারসিতে স্নাতকোত্তর এবং উর্দু সাবসিডিয়ারি হিসেবে পড়ানো হতো। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর উর্দুতে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর কোর্স শুরু হয়। ২০০৭ সাল থেকে ‘ফারসি ভাষা ও সাহিত্য’ এবং ‘উর্দু’ দুটি পৃথক বিভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত এ দুই বিভাগে যথাক্রমে ১০০ ও ১১০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হতো। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ৭৫ ও ৭০ জন করে শিক্ষার্থী নেয়া হচ্ছে। এছাড়া ফারসি বিভাগে প্রতি বছর রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাক্রমে ৫৫ এবং ৫০টি আসন রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগে রয়েছে ৪০টি আসন।

কর্মক্ষেত্রে অপ্রতুলতার কথা স্বীকার করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী ফায়াজ আহমেদ নিশা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা একটি ভাষাভিত্তিক বিভাগে পড়াশোনা করি। আমাদের পূর্ণাঙ্গ বই পাওয়া যায় না, দেশেও এক্ষেত্রে সংকট রয়েছে। ভর্তি প্রক্রিয়ায় যদি গণবিজ্ঞপ্তির পরিবর্তে যোগ্যতা ও আগ্রহের ভিত্তিতে ভর্তি করা হতো, তাহলে ভালো হতো। ভালোবাসা থেকে শিক্ষার্থীদের এ বিভাগে ভর্তি হওয়া উচিত। তবে একটা বড় চ্যালেঞ্জ হলো এখানে চাকরির সুযোগ খুবই সীমিত, এমনকি শিক্ষা ক্যাডারও নেই। তাই অনেক শিক্ষার্থীর অনীহা থাকে। কিন্তু আমি ইচ্ছা করেই এ বিভাগ বেছে নিয়েছি, কারণ এখানে গবেষণার অফুরন্ত সুযোগ রয়েছে।’

গবেষণার সুযোগ কাজে লাগাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এ শিক্ষার্থী উর্দু বিভাগ বেছে নিলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। দফায় দফায় মনোনয়নের তালিকা প্রকাশ করেও নির্ধারিত আসন পূরণ করতে পারে না উর্দু, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য, সংস্কৃত এবং পালি অ্যান্ড বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগ।

অন্য বিষয়গুলোয় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডার পান। কিন্তু উর্দু, সংস্কৃত, পালি ও বৌদ্ধ শিক্ষা, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য এবং উর্দুর মতো বিভাগের শিক্ষার্থীদের সে সুযোগও নেই। বিভাগের শিক্ষক হওয়ার সুযোগ থাকলেও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি আসে কয়েক বছর পরপর।

তবে ওই চার বিভাগের শিক্ষকদের দাবি, তাদের বিভাগের চাহিদা নেই—এ অভিযোগ সত্য নয়। এসব ভাষার ওপর দখল থাকলে অনুবাদসহ নানা কাজে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া গবেষণাকাজেরও যথেষ্ট সুযোগ আছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. মো. শফিউল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের বিভাগেই একজন বিদেশী (পাকিস্তানি) শিক্ষক রয়েছেন। এটি শিক্ষার্থীদের একটি বিদেশী ভাষায় দক্ষ করে তোলে। পাশাপাশি গবেষণা ও ফলাফলের ক্ষেত্রেও ভালো করার সুযোগ রয়েছে। তবে ভর্তি প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের অনীহার বিষয়ে বলতে গেলে—এটা অনেকটা চিলে কান নিয়ে গেছে শুনে চিলের পেছনে দৌড়ানোর মতো। আসলে আগে দেখা উচিত সত্যিই কান আছে কিনা। শিক্ষার্থীরা যাচাই-বাছাই না করেই শুনে শুনেই এমন ধারণা তৈরি করে। দিন শেষে বিষয় নয়, ফলাফলই আসল। তবে শিক্ষক সংকট আমাদের বাস্তব সমস্যা।’

ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এ চারটি বিভাগে মোট শিক্ষক মাত্র ১০৮ জন। তাদের মধ্যে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগে মোট ২৬ জন; ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে মোট ২৫ এবং সংস্কৃত বিভাগে মোট ৩৫; ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বৌদ্ধ শিক্ষা বিভাগে মোট ২১ শিক্ষক রয়েছেন। বিভাগগুলোর অধিকাংশই ভাষাভিত্তিক হলেও শিক্ষার্থীদের প্রায় কারোরই সংশ্লিষ্ট ভাষায় পারদর্শিতা নেই। এমনকি খোদ এসব বিভাগের শিক্ষকদের বড় অংশের সংশ্লিষ্ট ভাষার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

শুধু এ বিভাগগুলোর ক্ষেত্রে নয়; উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটি বিভাগের শিক্ষার্থীরাই বেকারত্বের কারণে হতাশায় ভোগেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এ চারটি বিভাগের মতো আরো অসংখ্য বিভাগ রয়েছে, যার বিশেষায়িত কোনো কর্মক্ষেত্র নেই। উদাহরণস্বরূপ লোকপ্রশাসন বিভাগের অতগুলো গ্র্যাজুয়েট কি দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য দরকার আছে? তাছাড়া শুধু ওই বিভাগ থেকেই কি প্রশাসনে নিয়োগ দেয়া হয়? সুতরাং আমাদের দেশে বিশেষায়নের ভিত্তিতে নিয়োগ পদ্ধতি চালু নেই। এটি সামগ্রিক সমস্যা।’ তবে এ চারটি বিভাগের প্রাসঙ্গিকীকরণের পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এগুলো অধিকাংশ ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক। ফলে সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষী রাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা যেতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে এসব বিষয়ের শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট ভাষায় কথা বলতে পারে না। আরো দুঃখজনক হলো তারা সবাই সংশ্লিষ্ট সাহিত্য অধ্যয়ন করে বাংলা ভাষায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের ভাষায় পারদর্শী করে তুললে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর, উচ্চশিক্ষায় বৃত্তির ব্যবস্থা, একাডেমিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা দুয়ার খুলতে পারে।’ এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোয় শিক্ষার্থী সংখ্যা যৌক্তিকীকরণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

আরও