রাজধানীবাসীর নিরাপদ ও সহজে সড়ক পারাপারের জন্য বিভিন্ন ব্যস্ত পয়েন্টে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল চলন্ত সিঁড়ি বা এস্কেলেটর-সংবলিত ফুটওভার ব্রিজ। কিন্তু নির্মাণের পর এসব স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফুটওভার ব্রিজের এস্কেলেটর দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এসব এস্কেলেটরের প্রবেশমুখ কোথাও বাঁশ-কাঠ দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও ভেঙে পড়েছে কাচ ও সুরক্ষা কাঠামো। কোথাও আবার অচল সিঁড়ির ওপর জমেছে ময়লা-আবর্জনা। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ ও শারীরিকভাবে দুর্বল পথচারীরা।
রাজধানীর অন্তত চারটি গুরুত্বপূর্ণ ফার্মগেট, বনানী সৈনিক ক্লাব, বিমানবন্দর বাসস্ট্যান্ড ও যমুনা ফিউচার পার্কসংলগ্ন ‘আবরার আহমেদ ফুটওভার ব্রিজ’ ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। এর মধ্যে ফার্মগেটে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ফুটওভার ব্রিজটি উদ্বোধনের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এস্কেলেটরের প্রবেশমুখ বাঁশ দিয়ে আটকে দেয়া হয়। দীর্ঘদিন এভাবে থাকার পরে মাঝখানে কিছুদিন সচল ছিল। এরপর আবারো অচল হয়ে পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে থাকা অংশটি এখন আবর্জনা ফেলার স্থান হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে উদ্বোধন করা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্মিত নিউমার্কেট এলাকার ফুটওভার ব্রিজের চলন্ত সিঁড়ি কার্যকর রয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, সেটাও মাঝেমধ্যে অচল থাকে। এছাড়া গত মাসে উদ্বোধন করা ডিএনসিসির অর্থায়ন ও উদ্যোগে রামপুরা খালের ওপর নির্মিত আফতাবনগর-বনশ্রী সংযোগকারী ওভার ব্রিজের চলন্ত সিঁড়িটিও চালু আছে।
সম্প্রতি সরজমিন ফার্মগেটের ইন্দিরা রোড অংশের ফুটওভার ব্রিজে গিয়ে দেখা যায়, চলন্ত সিঁড়ির নিচের ও ওপরের প্রবেশমুখ বাঁশ দিয়ে আড়াআড়ি বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ওপরের দিকে একটি পুরনো কাঠের পাটাতন ফিতা ও সুতা দিয়ে রেলিংয়ের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। ধাপগুলো ধুলায় ধূসর হয়ে আছে। দুই পাশের কাচেও জমেছে ময়লা। অচল এস্কেলেটরের পাশের সাধারণ সিঁড়ি দিয়ে পথচারীদের ওঠানামা করতে হচ্ছে। ব্যাগ কাঁধে শিক্ষার্থী, অফিসযাত্রী ও নারীদের সেখানে ঠাসাঠাসি করে উঠতে দেখা যায়।
ফার্মগেটের এ ফুটওভার ব্রিজটি ২০২৩ সালের ১৫ অক্টোবর উদ্বোধন করা হয়। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ব্রিজটির সঙ্গে পথচারীদের ওঠানামার সুবিধার জন্য এস্কেলেটরের ব্যবস্থা রাখা হয়। তবে উদ্বোধনের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কোনো ঘোষণা ছাড়াই এস্কেলেটরের প্রবেশমুখ বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয় বলে স্থানীয় পথচারীরা জানান। এর পর থেকে সেটি আর স্বাভাবিকভাবে চালু হতে দেখা যায়নি।
ফার্মগেটে চলাচলকারী এক পথচারী বলেন, ‘অফিস ছুটির সময় প্রচুর মানুষ এ ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করে। চলন্ত সিঁড়িগুলো সবসময় বন্ধ থাকে। ফলে ব্রিজে জট লেগে যায়। এতে অসুস্থ মানুষের চলাচলে অনেক অসুবিধা হয়। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় বয়োবৃদ্ধদের।’
রাজধানীতে চলন্ত সিঁড়ির সুবিধাসংবলিত ফুটওভার ব্রিজের যাত্রা শুরু হয় বনানী সৈনিক ক্লাবসংলগ্ন এলাকায়। ২০১৪ সালে ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট প্রজেক্টের (কেইস) আওতায় সেখানে এস্কেলেটরযুক্ত ফুটওভার ব্রিজ স্থাপন করা হয়। পরে এটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সরজমিনে দেখা যায়, ব্রিজটির এস্কেলেটরের দুই পাশের সুরক্ষা কাচের কিছু অংশ ভেঙে গেছে। ভেতরের যান্ত্রিক গিয়ার, চেইন ও মোটরের অংশ কোথাও কোথাও উন্মুক্ত। কোনো যন্ত্রাংশ আবার চুরি হয়ে গেছে। এস্কেলেটরের ওপর ও নিচের প্লাটফর্মে জমেছে ধুলা ও ময়লা। ধাপের ওপর পড়ে আছে টিস্যু, ছেঁড়া প্যাকেট, পানির বোতল ও সিগারেটের টুকরো। চলন্ত সিঁড়ি বন্ধ থাকায় কেউ কেউ অচল ধাপ দিয়েই হেঁটে ওঠানামা করছে।
বনানীতে নিয়মিত চলাচলকারী ও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারকারী প্রবীণ কামরুজ্জামান শফিক বলেন, ‘আমি একজন হৃদরোগী, হাঁটুতেও ব্যথা। চলন্ত সিঁড়িটা আমার মতো অসুস্থ ও বয়স্ক মানুষের জন্য খুব দরকারি ছিল। চালুর কয়েকদিন পরই বন্ধ হয়ে গেছে। এখন সেই কষ্ট করেই হেঁটে হেঁটে উঠতে হচ্ছে।’
আরেক পথচারী সালেক বলেন, ‘বনানীর এ রাস্তায় আমি চার-পাঁচ বছর ধরে চলাচল করি। এ চলন্ত সিঁড়ি সবসময়ই বন্ধ থাকে। প্রায় দুই বছর ধরে এ সমস্যা দেখছি। এটা ঢাকার খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সারা দিনে প্রচুর মানুষ এখান দিয়ে চলাচল করে। রোগী, বয়স্ক মানুষসহ শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা অনেকেই চলন্ত সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারে না। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে তাদের অনেক কষ্ট হয়।’
২০১৬ সালে তৎকালীন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের উদ্যোগে বিমানবন্দর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নির্মিত ফুটওভার ব্রিজের সঙ্গে এস্কেলেটর স্থাপন করা হয়। বর্তমানে ব্রিজটির দুই পাশের এস্কেলেটরই দীর্ঘদিন ধরে অচল। সরজমিনে দেখা যায়, এস্কেলেটরের কিছু অংশের কাচ ও সুরক্ষাকবচ ভেঙে গেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ধাপ ও আশপাশের অংশে ময়লা জমেছে। কোথাও কোথাও যন্ত্রাংশও উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, চার-পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে দুই পাশের এস্কেলেটর পুরোপুরি বন্ধ।
এ ফুটওভার ব্রিজটি বিমানবন্দরগামী বিপুলসংখ্যক পথচারী ব্যবহার করে। মহাখালী থেকে বিমানবন্দরমুখী ব্যস্ত সড়কের এ অংশে নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া রাস্তা পারাপারের সুযোগ না থাকায় ফুটওভার ব্রিজটিই পথচারীদের প্রধান ভরসা। তবে এর এস্কেলেটর অচল থাকার ফলে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষকে সাধারণ সিঁড়ি ব্যবহার করেই ব্রিজ পার হতে হচ্ছে।
২০১৯ সালে যমুনা ফিউচার পার্কসংলগ্ন সড়কে বাসচাপায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হন। ওই ঘটনার পর সেখানে নিরাপদে সড়ক পারাপারের জন্য ‘আবরার আহমেদ ফুটওভার ব্রিজ’ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০২১ সালে উদ্বোধন করা হয় এস্কেলেটর-সংবলিত ব্রিজটি।
তবে উদ্বোধনের পর থেকেই এর চলন্ত সিঁড়ি নিয়মিত সচল রাখা যায়নি বলে স্থানীয় ও পথচারীদের অভিযোগ। কখনো চালু থাকলেও অধিকাংশ সময়ই এটি বন্ধ বা মেরামতাধীন দেখা যায়। ফলে ব্রিজটি নির্মাণের যে উদ্দেশ্য—সহজ ও নিরাপদে পথচারীদের সড়ক পারাপার—তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
এস্কেলেটর অচল থাকায় সাধারণ সিঁড়ির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে অফিস ছুটির সময় ও ব্যস্ত সময়ে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ সিঁড়ি ব্যবহার করায় সেখানে ভিড় তৈরি হয়। উঁচু সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তিদের।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব ফুটওভার ব্রিজে শুধু নির্মাণ করেই দায়িত্ব শেষ হচ্ছে কিনা—এখন সেই প্রশ্নও উঠছে। কারণ একটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের পর সেটির এস্কেলেটর সচল রাখা, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ভাঙা অংশ মেরামত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে পথচারীবান্ধব অবকাঠামোটি শেষ পর্যন্ত উল্টো ভোগান্তি ও ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ চলন্ত সিঁড়িগুলোর প্রায় সবগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ডিএনসিসির।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যাওয়ার কারণে বেশির ভাগ চলন্ত সিঁড়িই বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু যন্ত্রাংশ ঠিক করা হয়েছে এবং কিছু চালু আছে; একদম সব বন্ধ নয়।’
তিনি বলেন, ‘ফার্মগেটের ফুটওভার ব্রিজের বিষয়টি মনে হয় আমরা এখনো বুঝে পাইনি, এটি এখনো সেনাবাহিনীর কাছে রয়েছে। তবে রামপুরা খালের ওপর নির্মিত আফতাবনগর-বনশ্রী সংযোগকারী ফুটওভার ব্রিজের চলন্ত সিঁড়িটি চালু আছে। উত্তরার একটিতে আমরা লিফট লাগাচ্ছি। সব জায়গায় না থাকলেও ভালো অবস্থায় মোট ছয়টি জায়গায় চলন্ত সিঁড়ি আছে। বিমানবন্দর এলাকার বন্ধ থাকা অংশটি আমাদের সরাতে হবে। চলন্ত সিঁড়িগুলো সচল করতে সিটি করপোরেশন থেকে কী কী পদক্ষেপ বা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তা কাগজপত্র বা তথ্য দেখে নিশ্চিত হয়ে বলতে হবে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলন্ত সিঁড়ি ব্যবহারের জন্য রাষ্ট্র ও নাগরিক—কারোরই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেই। মেকানিক্যাল ডিভাইসের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, তদারকি ও নষ্ট হলে মেরামতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি না করেই একের পর এক প্রযুক্তিনির্ভর সিঁড়ি লাগানো হচ্ছে। অথচ আমাদের প্রয়োজন ছিল সাধারণ ও ব্যবহারবান্ধব (ইউজার ফ্রেন্ডলি) ডিজাইন।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের আবহাওয়ায় যে পরিমাণ ধুলাবালি থাকে, তাতে এসব সংবেদনশীল যন্ত্র খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এসব মেকানিক্যাল ডিভাইসের ওপর নির্ভর করার মতো বাস্তব পরিবেশ ও শৃঙ্খলা এখনো আমাদের তৈরি হয়নি। বাস্তবমুখী সমাধানের চেয়ে কর্তৃপক্ষের কেনাকাটা বা পারচেজ করার দিকেই আগ্রহ বেশি কাজ করে। যেসব প্রকল্পে ব্যয় বেশি, সেগুলোতেই ঝোঁক বেশি দেখা যায়। সহজ সমাধানের দিকে না গিয়ে এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করা আসলে জনগণের অর্থ অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।’
ড. আদিল মুহাম্মদ খান আরো বলেন, ‘চলন্ত সিঁড়ির পাইলটিং প্রকল্প ব্যর্থ হওয়া এবং বিদ্যমান সিঁড়িগুলো নষ্ট থাকা সত্ত্বেও নতুন করে আবার উত্তরাসহ বিভিন্ন স্থানে তা বসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বারবার প্রকল্প অকার্যকর প্রমাণিত হওয়ার পর এখান থেকে শিক্ষা না নিয়ে পুনরায় একই ভুল করা দুঃখজনক।’