ডুবে যাওয়া ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধারে গ্রিসকে অনুসরণ করতে পারে বাংলাদেশ

২০০৮ সাল-পরবর্তী সময়ে এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছিল গ্রিস। দেশটির সেই বিপর্যয়কে বিশ্বের গত অর্ধশতকের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

পুরো ইউরোজোনকে নাড়িয়ে দেয়া এ সংকটে গ্রিসের প্রায় সব ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। গ্রিসজুড়ে ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেয়ার হিড়িক পড়েছিল। গ্রাহকের অর্থ উত্তোলনের চাপ সামাল দিতে না পেরে দেশটির বেশির ভাগ এটিএম বুথ বন্ধ করে দেয়া হয়। এক সময় খেলাপি ঋণ পৌঁছায় ৪৯ শতাংশে। বিপর্যস্ত গ্রিসের সেই ব্যাংক খাত আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দেশটির ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার নেমে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশে। আর শক্তিশালী ব্যাংকের ওপর ভর করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে গ্রিসের অর্থনীতিও।

ব্যাংক খাতে গ্রিস গত এক দশকে আমূল সংস্কার বাস্তবায়ন করেছে। সংকট শুরুর সময় ২০০৮ সালে দেশটিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৬৪। অর্থনীতিকে টেনে তোলা ও সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে ব্যাংকের সংখ্যা এখন মাত্র চারটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। বৃহৎ এ ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগান দেয়া হয়। অন্য ব্যাংকগুলো হয় বন্ধ করে দেয়া হয়, নয়তো পুনর্মূলধনীকরণের পর বড় চার ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সংস্কার কার্যক্রমে ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগান দেয়া হয় প্রায় ৫০ বিলিয়ন ইউরো; বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ইউরো ১৪৫ টাকা হিসাবে)। গ্রিস সরকার ও ইউরোপীয় তহবিল থেকে এ অর্থের জোগান দেয়া হয়।

অবশ্য কেবল মূলধন জোগানই নয়, হেলেনিক অ্যাসেট প্রটেকশন স্কিমের (এইচএপিএস) আওতায় ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ব্যাংক পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে গ্রিস। ‘হারকিউলিস’ নামে পরিচিত রাষ্ট্রীয় এ গ্যারান্টি স্কিমের আওতায় প্রায় ৫৭ বিলিয়ন ইউরোর খেলাপি ঋণ সিকিউরিটাইজ করে ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিংয়ে উন্নতির পাশাপাশি গ্রিস এ মুহূর্তে পুরো ইউরোপের অন্যতম বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।

গ্রিসের মতো দেউলিয়াত্বের মুখোমুখি না হলেও কয়েক বছর ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি, প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ না হওয়া, সরকারের ঋণ ও ঋণের সুদ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্বসহ বিভিন্ন সংকটের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়ার পর এসব সংকট বর্তমান সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আরো খারাপ পরিস্থিতি দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে। দেশের ৬২টি ব্যাংকের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই এখন দুর্বল। এর মধ্যে এক ডজন ব্যাংক গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। মূলধন ঘাটতিতে পড়া ব্যাংকের সংখ্যা ঠেকেছে ২৪-এ। আর পুরো ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে। অবশ্য গত বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের এ হার ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

ব্যাংকের চেয়ে আরো খারাপ পরিস্থিতিতে আছে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০টিরও বেশি এখন অস্তিত্ব সংকটে। এর মধ্যে নয়টি প্রতিষ্ঠান বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এগুলোর কোনো কোনোটির ৯৯ শতাংশ ঋণই এখন খেলাপি। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশে। দেশের ৮২টি বীমা কোম্পানির এক-তৃতীয়াংশের অবস্থাও নাজুক।

অর্থনৈতিক মন্দা ও ব্যাংক খাতের সংকট উত্তরণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পথ খুঁজছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক খাত সংস্কারে কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও সেগুলোর সফল সমাপ্তি হয়নি। বরং শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, তা এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আর পুনঃতফসিল ও নীতিসহায়তা দিয়ে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার যে চেষ্টা হচ্ছে, সেটিও টেকসই সমাধান নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যাংক নির্বাহীসহ খাতসংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও ব্যাংক খাত সংস্কারে গ্রিসের মডেল অনুসরণ করতে পারে বাংলাদেশ। বিভিন্ন সময় গ্রিসের মতো সংকটে পড়েছিল এশিয়া, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার অনেক দেশ। তবে সংকটের উত্তরণ ঘটিয়ে দেশগুলো একসময় সমৃদ্ধির পথে এগিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সংকট উত্তরণের প্রাথমিক পর্যায়েই ঘুরপাক খাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘অনিয়ম-দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের অনেক দেশই বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক খাত নিয়ে বিপদে পড়েছিল। তবে সে রকম পরিস্থিতি থেকে সফল উত্তরণের অনেক উদাহরণও আমাদের সামনে রয়েছে। এক্ষেত্রে গ্রিস, ইউক্রেন, তুরস্ক, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার মতো দেশের নাম উল্লেখ করা যায়। আফ্রিকার অনেক দেশও নানা উত্থান-পতনের পর এখন সমৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে। আমরা সংস্কার ও সংকট উত্তরণের সেসব মডেল নিয়ে পর্যালোচনা করতে পারি। একই সঙ্গে ভালো উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগোতে পারি।’

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক এ মুখ্য অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, ‘ব্যাংকসহ আর্থিক খাত সংস্কারে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছিল। এর মধ্যে ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্সসহ আইনি যেসব সংস্কার করা হয়েছে, সেগুলোর সফল প্রয়োগ হলে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের নীতির ধারাবাহিকতা থাকছে না। আবার নীতিনির্ধারকরা কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সেটিতে অটল থাকতে পারছেন না।’

বাংলাদেশ যে আর্থিক সংকটে পড়েছে, সেটির সঙ্গে গ্রিসের সংকটের অনেক মিল রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। গ্রিসের সংকটের সূত্রপাত ছিল ২০০৮ সালের আগের এক দশকে ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধিতে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত গ্রিসের অর্থনীতি দ্রুত বড় হচ্ছিল। ইউরোজোনে অন্তর্ভুক্তি এবং কম সুদের কারণে ঋণ পাওয়া সহজ হয়ে যায়। আর্থিক উদারীকরণ ও কম সুদে বেসরকারি ঋণে বড় উল্লম্ফন ঘটে, বিশেষ করে ভোক্তা ঋণে। এর ফলে ব্যক্তিগত সঞ্চয় কমে যায় এবং বৈদেশিক ঋণ বাড়ে।

উন্নয়নের কথা বলে দেশটির সরকারও দ্রুতগতিতে ব্যয় বাড়ায়। বিপরীতে রাজস্ব আয় ও উৎপাদনশীলতা সে হারে বাড়েনি। সরকারের ঋণ ক্রমান্বয়ে বাড়লেও বাজেট ঘাটতি লুকানো হয়। দেশটিতে কর ফাঁকি ব্যাপক আকার ধারণ করে। সামাজিক ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অর্থনীতি আমদানি ও ভোগনির্ভর হয়ে পড়ে। গ্রিসের রাজনীতিবিদ ও সরকারি আমলাদের দুর্নীতিও ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে।

২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারেন গ্রিসের প্রকৃত ঋণ পরিস্থিতি ঘোষণার চেয়ে অনেক খারাপ। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রিসের ওপর আস্থা ভেঙে পড়ে। ঋণের সুদ আকাশচুম্বী হয়ে যায় এবং দেশটি তখন নতুন ঋণ নিতে প্রায় অক্ষম। অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাবে দেশটির সরকারও ভেঙে পড়ে।

২০০৭ সালে গ্রিসের মাথাপিছু প্রকৃত জিডিপি ছিল ২২ হাজার ৫০০ ইউরো, যা ২০১৪ সালে নেমে আসে ১৬ হাজার ৮৩০ ইউরোতে। অর্থাৎ এ সময়ে মাথাপিছু আয় ২৫ দশমিক ২ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে বেকারত্বের হার ৮ দশমিক ৪ থেকে বেড়ে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছে। তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার উঠে যায় ৫০ শতাংশের ওপরে। এ সময়ে হাজার হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়। বিশেষ করে এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে। ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেয়ার হিড়িক পড়ে। অর্থনীতির এতসব সংকটের পাশাপাশি গ্রিসের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের গতিও ছিল ধীর। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মাথাপিছু প্রকৃত জিডিপি ছিল প্রায় স্থির।

অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সার্বভৌম ঋণ এবং ব্যাংক খাতের সংকট। ২০১২ সালে গ্রিস তার সরকারি ঋণ পুনর্গঠন করে। এতে ঋণের মূল্যমান ২০৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন থেকে কমে ৯৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে আসে, অর্থাৎ প্রায় ৫২ দশমিক ১ শতাংশ কমানো হয়। এটি ছিল বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সার্বভৌম ঋণ পুনর্গঠন। সংকট উত্তরণে ইউরোজোনভুক্ত দেশ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে গ্রিস যে সহায়তা প্যাকেজ পায়, সেটিও ছিল ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বেইলআউট কর্মসূচি।

বাংলাদেশেও ২০০৮ সাল-পরবর্তী সময়ে উন্নয়নের কথা বলে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার দেশী-বিদেশী উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে সরকারের নেয়া ঋণ স্থিতি প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা। অথচ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখনো সরকারের ঋণ স্থিতি মাত্র ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা ছিল। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে সরকারের ঋণ স্থিতি সাড়ে ১৫ লাখ কোটি টাকার বেশি বেড়েছে। বর্তমানে কেবল বিদেশী উৎস থেকে দেশের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৩ বিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যে ৯৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের নেয়া।

আর্থিক সংকটে পড়ার পরও গ্রিস সরকার ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদের ঋণ নিয়েছিল। ব্যাংকগুলোও বেশি সুদ পেয়ে সরকারকে ঋণ দেয়া বাড়িয়ে দেয়। যদিও পরে সে ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি সরকার। ২০১২ সালে এসে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সার্বভৌম ঋণ পুনর্গঠন করা হয়। ওই সময় ঋণের সুদ কমিয়ে দেয় গ্রিস সরকার। আর বন্ডের সুদ কমে যাওয়ার প্রভাবেই ব্যাংকগুলো একের পর এক ভেঙে পড়তে শুরু করে।

বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এখন সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী। কারণ ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার অনেক উচ্চ। সরকারকে ঋণ দিলে খেলাপির ঝুঁকি নেই, এ বিবেচনায় ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ না দিয়ে সরকারকে দিচ্ছে। ২০২২ সালেও যে বিল-বন্ডের সুদহার ছিল ২ থেকে ৫ শতাংশ, তিন বছর ধরে তা ১০-১৩ শতাংশে বেচাকেনা হচ্ছে। কেবল ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই সরকার সুদ খাতে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। এখন সরকার যদি বিল-বন্ডের সুদহার কমিয়ে দেয়, তাহলে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতিও গ্রিসের মতো হতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি ঋণে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। আর গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক বছরে প্রবৃদ্ধির এ হার দ্বিগুণেরও বেশি তথা ৩৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। যেখানে একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ ছিল।

বেসরকারি খাতের ভঙ্গুরতার প্রভাবে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার অস্বাভাবিক পর্যায়ে ঠেকেছে, যা ২০০৮ সাল-পরবর্তী দেড় দশকে ব্যাংকগুলোতে সংঘটিত সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের ফলাফল। গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৩০ শতাংশ। অবশ্য এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা। ওই সময় খেলাপি ঋণের হার ছিল প্রায় ৩৬ শতাংশ। বছরের শেষ তিন মাসে ব্যাংকগুলো পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমাতে পেরেছে।

বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা না থাকার কারণেই ব্যাংকগুলো সরকারকে ঋণ দেয়ায় ঝুঁকছে বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক নানা সংকটের কারণে দেশের বেসরকারি খাত সংকুচিত হয়ে গেছে। আর অনেক ব্যাংকের পক্ষে নতুন বিনিয়োগ করার অবস্থাও নেই। খেলাপি ঋণ যে পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে, তাতে ব্যাংকাররা এখন উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতেও ভয় পাচ্ছেন।’

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আরো বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে ব্যাংক খাত সংস্কার করতেই হবে। তবে সমস্যা হলো আমরা সংস্কারের পথে এক পা এগোলে তিন পা পিছিয়ে যাই। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক খাত সংস্কারে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে ভালো কাজগুলো কোনো প্রশ্ন ছাড়াই এগিয়ে নেয়া দরকার। তাহলে অপরাধীদের কাছে একটি পরিষ্কার বার্তা যাবে। আবার সাধারণ মানুষও সরকারের কার্যক্রমে আস্থা পাবে। আমাদের মৌলিক সমস্যা হলো গভর্ন্যান্স বা করপোরেট সুশাসন। এটি ছাড়া আমাদের মুক্তির কোনো পথ নেই। ব্যাংকসহ আর্থিক খাতকে এগিয়ে নিতে হলে সুশাসন লাগবেই।’

ব্যাংক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে ২০০৮ সাল-পরবর্তী সময়ে গ্রিস ৬৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত ও একীভূতকরণের মাধ্যমে মাত্র চারটিতে নামিয়ে এনেছে। এর মধ্যে মূলধন জোগাড়ে ব্যর্থ হওয়ায় সাতটি সমবায় ব্যাংকের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। এছাড়া প্রোটন ব্যাংক, টি ব্যাংক, আচাইকি কো-অপারেটিভ ব্যাংক, লামিয়া কো-অপারেটিভ ব্যাংক, লেসবস-লিমনস কো-অপারেটিভ ব্যাংকসহ আরো কয়েকটি ছোট ব্যাংককে লিকুইডেশন ও স্পেশাল রেজল্যুশনে পাঠানো হয়। সংকট-পরবর্তী পুনর্গঠনের ফলে শেষ পর্যন্ত গ্রিসের ব্যাংক খাত মূলত চারটি বড় সিস্টেমিক ব্যাংকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এ চার ব্যাংক হলো ন্যাশনাল ব্যাংক অব গ্রিস, আলফা ব্যাংক, ইউরো ব্যাংক ও পিরেয়াস ব্যাংক। এ ব্যাংকগুলো এখন গ্রিসের ব্যাংক খাতের ৯৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।

সংকট উত্তরণে মূলধন জোগান দেয়া দরকার বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কেস স্টাডি হিসেবে আমরা পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সেটি বাস্তবায়ন করতে গিয়েই নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছি। আসলে আমাদের দেশে ব্যাংক একীভূতকরণের তেমন কোনো সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। গ্রাহকরাও এ ধরনের পদক্ষেপের সঙ্গে পরিচিত নন। এ কারণে সমস্যা বেশি হচ্ছে। ব্যাংক খাত সংস্কারে সরকারকে কঠোর সিদ্ধান্তে আসতে হবে। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।’

অবশ্য বাংলাদেশেও গত এক দশকে বেশকিছু ব্যাংককে মূলধন ও তারল্য সহায়তা দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেসব সহায়তার কোনো সুফলই মেলেনি। যেমন ২০০৯ সাল-পরবর্তী তিন বছরে লুণ্ঠনের শিকার হওয়া বেসিক ব্যাংককে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার মূলধন জোগান দিয়েছিল সরকার। কিন্তু ব্যাংকটি মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকা অনিয়ম-দুর্নীতির ধকল গত এক যুগেও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। উল্টো এখন পর্যন্ত বেসিক ব্যাংক প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার নিট লোকসান গুনেছে।

আবার লুণ্ঠনের শিকার বেসরকারি পদ্মা ব্যাংককে টেনে তোলার কথা বলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে ৭১৫ কোটি টাকার মূলধন জোগান দেয়া হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকটিকে কয়েক হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা ও নীতিসহায়তাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরু করা এ ব্যাংককেও টেনে তোলা সম্ভব হয়নি। অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের শিকার হওয়া শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোকে হাজার হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু সেগুলোও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

আরও