পংকবিলা গ্রাম সেজেছে লিচুর লাল আভায়

৬ কোটি টাকা বেচাকেনার আশা

নড়াইল চিত্রা নদীর পারের গ্রাম পংকবিলা। এ গ্রামের লিচুর ইতিহাস শত বছরের।

ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানকার চাষীরা লিচু চাষ করেন। চলতি মৌসুমেও ভালো ফলন ও দাম পেয়ে খুশি লিচুসংশ্লিষ্টরা। বিষমুক্ত (অর্গানিক) এসব লিচু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে দেশের অন্তত ২০টি জেলায়। পংকবিলা গ্রামটি লিচু গ্রাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে অনেক আগেই। কয়েকজন লিচুচাষী বলেন, ‘আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার লিচুর ফলন ভালো হয়েছে। শুধু পংকবিলায় প্রতি মৌসুমে এ গ্রাম থেকে অন্তত ৬ কোটি টাকার লিচু বেচাকেনা হবে বলে আশা করছি।’

সরজমিনে দেখা যায়, গ্রামের প্রতিটি বাড়ির আঙিনা এখন উৎসবের সাজে নয়, বরং থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা রসালো লিচুর লাল আভায় রাঙানো। প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনে পেতে রাখা হয়েছে চেয়ার। সেখানে বসে গল্প করছেন লিচুগাছের মালিকসহ দূরদূরান্ত থেকে লিচু কিনতে আসা ব্যক্তিরা। অনেকেই গাছ থেকে লিচু পাড়ছেন। কেউ কেউ পাটি বিছিয়ে গুনে গুনে ৫০টি বা ১০০টি করে লিচুর আঁটি বাঁধছেন।

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দাম কিছুটা বেশি হলেও অন্য এলাকার লিচুর চেয়ে এ এলাকার লিচুর চাহিদা বেশি। এ লিচুর এক ধরনের সুঘ্রাণ রয়েছে। মৌসুমে এ গ্রামের লিচু বাগান দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসেন। ছবি তোলেন, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেন। উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয় এখানে।

বাগান মালিকসহ পরিচর্যাকারীরা জানান, এ গ্রামের বড় লিচু বাগানের নাম হলো সোনাখাঁর লিচু বাগান। সোনাখাঁর লিচু বাগানের সাফল্য দেখে অন্তত শতাধিক বাগান গড়ে উঠেছে। এসব বাগানে দেশী জাতের পাশাপাশি চায়না-থ্রি, মোজাফফর ও বেদানা জাতের লিচু রয়েছে। এ বছর ফলনও ভালো হয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় জাতের দেশী লিচু বিক্রি শেষের দিকে। দূর-দূরান্ত থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা ভিড় করছেন। এরপর চায়না-থ্রি, মোজাফফর ও বেদানা জাতের লিচু বিক্রি শুরু হবে। আরো এক মাস এখানে লিচু পাওয়া যাবে। সব মিলিয়ে অন্তত ৮০ শতাংশ লিচু বেচাবিক্রি শেষ। এখানকার লিচু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকা ছাড়াও যাচ্ছে কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, খুলনাসহ আশপাশের জেলাগুলোতে। স্থানীয়দের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে।

পাইকারি লিচু ব্যবসায়ী নরসিংদী জেলার ইসলাম ফকির জানান, দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিচু ব্যবসা করি। প্রতি বছর লিচু মৌসুমে তার মতো অনেক ব্যবসায়ী লিচু কিনতে নড়াইলে আসেন। নড়াইলের লিচুর বেশ সুনাম রয়েছে। তাই ক্রেতাদের চাহিদা রয়েছে। এ লিচু কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, খুলনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় পাইকারি দরে বিক্রি করি।

লিচুচাষী রমিজ শেখ বলেন, ‘পংকবিলা গ্রামের সোনাখাঁর বাগান দেখে প্রায় ২০ বছর আগে নিজ জমিতে লিচু বাগান করেছি। চলতি বছর ফলন ভালো হয়েছে। বাগানের ৮০ শতাংশ লিচু বিক্রি হয়ে গেছে।’ নড়াইল সদর উপজেলা কৃষি অফিসার রোকনুজ্জামান বলেন, ‘গ্রামটিতে এ বছর বাণিজ্যিকভাবে ৪২ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। এখানে সাধারণত দেশী বিভিন্ন জাত এবং বোম্বাই, মোজাফফর, চাইনা-থ্রি জাতের লিচু আবাদ করা হয়। চলতি মৌসুমে এসব বাগান থেকে ৪০০-৪৫০ টন লিচু উৎপাদনের আশা করছে সংশ্লিষ্টরা, যার বাজারমূল্য অন্তত ৬ কোটি টাকা।’

নড়াইল জেলা কৃষি অফিসার মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, ‘গ্রামটি অনেক আগেই লিচু গ্রাম নামে পরিচিতি লাভ করেছে। লিচু গ্রামের সাফল্য দেখে আশপাশের গ্রামে লিচু চাষ শুরু হয়েছে।’ আগামীতে এ চাষ আরো বাড়বে বলে মনে করেন এ কৃষি কর্মকর্তা।

আরও