পদ্মা সেতু ও রেল যোগাযোগ সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা। নাব্য সংকটের কারণে বছরের একটি বড় সময় ফাঁকা থাকছে জেটি। চ্যানেলে পলি জমে গভীরতা কমায় ভিড়তে পারছে না বেশি ড্রাফটের জাহাজ। তবে সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিকায়নসহ নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দরসংশ্লিষ্টরা জানান, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থায় দেশের পাঁচ অঞ্চলের মধ্যে তিনটির সঙ্গেই চট্টগ্রামের তুলনায় মোংলার দূরত্ব কমেছে। এছাড়া রেল যোগাযোগ চালুর দেড় বছরেও উল্লেখযোগ্য পণ্য পরিবহন হয়নি।
বন্দরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোংলায় জাহাজ এসেছে ৯৮৭টি। আগের অর্থবছরে এর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫২। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জাহাজের আগমন কমেছে ৬৫টি। গত কয়েক বছরে কার্গো হ্যান্ডলিং বাড়লেও জাহাজের সংখ্যা কমেছে।
মোংলা বন্দরের সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘পর্যাপ্ত পণ্য না থাকায় নিয়মিত জাহাজ পরিচালনায় আগ্রহী হচ্ছে না শিপিং লাইনগুলো। আবার নিয়মিত জাহাজ না থাকায় ব্যবসায়ীরাও মোংলা বন্দর ব্যবহারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এ পরিস্থিতি কাটাতে ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়ানোর পাশাপাশি বন্দর ব্যবহারে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।’
বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, বর্তমানে বন্দরের বড় চ্যালেঞ্জ নাব্য সংকট। চ্যানেলে পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়ায় বেশি ড্রাফটের (পানির গভীরতা) জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হচ্ছে। প্রতি বছর ড্রেজিং করে পলি সরানো হলেও নাব্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলছে না। আউটার বার ও ইনার বার ড্রেজিংয়ের পর এখন রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং চললেও বড় জাহাজ আনার সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
তাদের অভিযোগ, বর্তমানে সর্বোচ্চ সাত মিটার ড্রাফটের জাহাজও আনা যাচ্ছে না। এতে সময় ও খরচ দুটিই বাড়ছে। তারা মোংলা বন্দরের আরো কিছু সমস্যা তুলে ধরেন। বন্দর থেকে খুলনা শহর পর্যন্ত যোগাযোগের প্রধান সড়কটি সরু এবং পিচ উঠে খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। এতে পণ্যবাহী যানবাহন পরিবহনে কিছুটা সমস্যা হয়। এছাড়া বন্দর এলাকায় আবাসন সুবিধা না থাকায় বন্দরসংশ্লিষ্টদের বেশির ভাগকে খুলনা বা বাগেরহাট শহর থেকে গিয়ে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। পণ্য খালাসেও দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অভিযোগ রয়েছে বন্দর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
বন্দরসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, মোংলা বন্দরের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পুরো পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার কার্যকর সমন্বয় জরুরি। বন্দর, সড়ক ও রেল যোগাযোগের সুবিধাগুলো সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানান, মোংলা বন্দরের নাব্যতা নিশ্চিত করতে কার্যকর ড্রেজিং প্রয়োজন। তিনি অভিযোগ করেন, এর আগে ড্রেজিং পরিকল্পনায় সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতও যথাযথভাবে নেয়া হয়নি। জাহাজ চলাচলের বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে ড্রেজিং পরিকল্পনা ও কাজ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিকায়নসহ নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) শেখ শওকত আলী জানান, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে ১২ অক্টোবর চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক (এক্সিম ব্যাংক) এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ৩ হাজার ৫৯২ কোটি ৮৯ লাখ টাকার একটি সহজ শর্তের ঋণ চুক্তি সই হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৬৮ মিটার দীর্ঘ দুটি নতুন কনটেইনার জেটি, কনটেইনার ইয়ার্ড এবং আধুনিক ক্রেন ও স্বয়ংক্রিয় পণ্য ওঠানো-নামানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নতুন জেটি ও আধুনিক সরঞ্জাম যুক্ত হলে বন্দরের পণ্য হ্যান্ডলিং সক্ষমতা অনেক বাড়বে।’
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, ‘বন্দরে বেশি ড্রাফটের জাহাজ আনার উপযোগী নাব্যতা নিশ্চিত করতে নতুন প্রকল্পে ড্রেজিংসহ একাধিক উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বন্দরের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সক্ষমতা বাড়াতে কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘শুধু বন্দর নয়, পুরো মোংলাকে ঘিরেই রয়েছে বড় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। ১১০ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পাশাপাশি ইপিজেড সম্প্রসারণ, মোংলা নদীর ওপর ঝুলন্ত সেতু, বিমানবন্দর নির্মাণ এবং সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের পরিকল্পনাও নেয়া হচ্ছে।’