নিজস্ব ভাষার মর্যাদা চান নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা

শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ছিল নানা আয়োজন।

শুক্রবার রাত ১২টায় প্রথম প্রহরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরা। এ সময় কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। তারা নিজেদের মাতৃভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় নিয়ে অনুভূতি তুলে ধরেন।

তাদের ভাষায়, মাতৃভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি শেকড়, স্মৃতি ও অস্তিত্বের অংশ। ছোটবেলার গল্প, লোকগান, পারিবারিক আচার—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভাষা। কিন্তু উচ্চশিক্ষা ও নগরজীবনের চাপে সেই ভাষাচর্চার পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে বলে মনে করেন তারা।

শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ বলেন, অনেক সময় নিজস্ব ভাষায় কথা বললে বিদ্রূপ বা কৌতূহলী দৃষ্টির মুখে পড়তে হয়। এতে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাতৃভাষা ব্যবহারে অনীহা তৈরি হয়।

তাদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাষাগত বৈচিত্র্যের প্রতি আরো সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার পরিসরে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা ও চর্চার সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানান তারা।

তবে শঙ্কার পাশাপাশি রয়েছে দৃঢ় অঙ্গীকারও। আদিবাসী শিক্ষার্থীরা বলেন, পরিবার ও সমাজে নিয়মিত ভাষাচর্চা, বই প্রকাশ, লোকগান ও গল্প সংরক্ষণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে কনটেন্ট তৈরির উদ্যোগ নিলে মাতৃভাষা টিকিয়ে রাখা সম্ভব। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তাদের প্রত্যাশা, রাষ্ট্রভাষার মর্যাদার পাশাপাশি দেশের সব মাতৃভাষাই সমান সম্মান ও সুরক্ষা পাক।

ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী উষাং চাক বলেন, মাতৃভাষা তার কাছে কেবল ব্যাকরণ নয়; এটি মায়ের মুখে শোনা ‘আউক পদুংমাং’ কিংবা ‘অজগর রাজা’র মতো রূপকথার গল্প। ছোটবেলায় ঘুমানোর আগে মা যে গল্প শোনাতেন, সেখানে ছিল অভাবী এক মায়ের সংগ্রাম, সন্তানের প্রতি মমতা আর জীবনের গভীর শিক্ষা।

তিনি বলেন, ‘আজ আমি বড় হয়েছি, গল্পের অর্থ বুঝি। কিন্তু আমি কি আমার পরবর্তী প্রজন্মকে চাক ভাষায় সেই গল্প শোনাতে পারব? শহরে এসে টিকে থাকার লড়াইয়ে আমাদের ভাষাটা যেন ব্যাগের এক কোনায় পড়ে থাকে। উচ্চশিক্ষার পথে এগোলেও মাতৃভাষাচর্চার পরিবেশ না থাকায় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অনেক শিক্ষার্থী নিজ সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।’ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তাই তাদের দাবি শিক্ষার মূলস্রোতে নিজ নিজ ভাষার চর্চা ও সংরক্ষণের উদ্যোগ।

শিক্ষার্থী উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘২১ ফেব্রুয়ারি শুধু একটি দিবস নয়, এটি আত্মত্যাগের গৌরবময় ইতিহাস। ১৯৫২ সালে ভাষার অধিকারের জন্য বরকত, সালামদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছে। এখনো অনেক ক্ষেত্রে অন্যের মাতৃভাষা নিয়ে হাসি-তামাশা বা কটাক্ষ করা হয়। বাংলাদেশে বাংলা ছাড়াও প্রায় চল্লিশের বেশি ভাষা প্রচলিত। এসব ভাষাভাষী শিক্ষার্থীরা অনেক সময় স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ ভাষার কারণে বিদ্রূপের শিকার হন। সব মাতৃভাষার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এবং সাংবিধানিক ও শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে ভাষাগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষিত হয়।’

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী পাইখিনুং মাথিং মারমা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। বাংলা ভাষা যেমন রাষ্ট্রভাষা ও সংগ্রামের ভাষা, তেমনি মারমা ভাষাও একটি প্রাচীন ও প্রাণবন্ত ভাষা। এর ভেতর লুকিয়ে আছে পাহাড়ের প্রকৃতি, জীবনদর্শন, লোকগান ও প্রজন্মের স্মৃতি।’

তার মতে, একটি ভাষা হারিয়ে গেলে শুধু শব্দ নয়, হারিয়ে যায় ইতিহাস ও অস্তিত্ব। এ দিবস ইউনেস্কোর উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়, যার মূল বার্তা ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সহনশীলতা। মারমা শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, ডিজিটাল মাধ্যমে ভাষার কনটেন্ট তৈরি এবং গবেষণা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আরও