প্রথম ধাপে ময়মনসিংহ বিভাগের সংসদ সদস্যদের ৫০ কোটি টাকা করে থোক বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। নিজ এলাকার পল্লী অবকাঠামো উন্নয়নে তারা প্রতি বছর ১০ কোটি টাকা করে ব্যয়ের সুযোগ পাবেন। পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এ-সংক্রান্ত প্রকল্প সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। তবে অতীতে পল্লী উন্নয়নের নামে এমপিদের জন্য দেয়া এ বরাদ্দ ঘিরে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। এবারও তা হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা যায়, অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের দাবিতে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ শুরু করে তৎকালীন বিএনপি সরকার। এরপর পরবর্তী চার সংসদে আওয়ামী লীগ সরকারও ধারাবাহিকভাবে এ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েছে। ২০০৫ সালে এ প্রকল্পের আওতায় আসনপ্রতি ২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও দ্বাদশ সংসদে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ কোটিতে। যদিও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে প্রকল্পটি আর অনুমোদন পায়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর আবারো এ প্রকল্পের প্রস্তাব দেয় এলজিইডি। নতুন সংসদ সদস্যদের জন্য নেয়া এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। সংসদ সদস্যরা অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিজ নির্বাচনী এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ ও মেরামত, হাটবাজার, ঘাট উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণসহ অন্যান্য উন্নয়নে বরাদ্দের অর্থ ব্যবহার করতে পারবেন।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা এলজিইডির সহকারী প্রধান প্রকৌশলী (নির্বাহী প্রকৌশলী) মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগের প্রকল্পটা তো শেষ হয়ে গেছে, তাই পল্লী উন্নয়নের নতুন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগ প্রথমে বাস্তবায়ন হবে। প্রকল্পের ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অন্য বিভাগের জন্যও করা হবে। এখানে এমপিরা কাজের প্রস্তাব দেন, সে অনুসারে আমরা বাস্তবায়ন করি।’
প্রথম ধাপে ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি সংসদীয় আসনের জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প ময়মনসিংহ বিভাগ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গত মে মাসে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে এলজিইডি। এর জন্য ১ হাজার ৪৯৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সূত্রে জানা যায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ৫৬৯ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন, ১৭৯ কিলোমিটার সড়ক পুনর্বাসন, ৮৬৭ মিটার ব্রিজ নির্মাণ এবং ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪২০টি গাছ রোপণ করা হবে। বিভাগটি কৃষি, শিল্প ও পর্যটন এলাকা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এবং ঢাকার সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করতে এ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, প্রকল্প যাচাই কমিটির (পিইসি) সভা গত ২৩ মে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রকল্পের সমীক্ষা, ব্যয় বিভাজনে পুনর্মূল্যায়ন, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার এলাকার বাইরে স্কিম বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। সেই সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত ডিপিপিতে যুক্ত করতে বলা হয়।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অতীতে সরকারের ধারাবাহিকতায় এবারো প্রকল্পটি নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এমপিদের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। এর আওতায় রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট মেরামত, পুনর্বাসন করা যাবে। তবে বড় নির্মাণকাজ করা হবে না। অবশ্য অতীতে এসব প্রকল্প ভাগাভাগি হতে আমরা দেখেছি। এখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাটাই চ্যালেঞ্জ। সেটা নিশ্চিত করতে আমরাও কিছু সুপারিশ দিয়েছি।’
ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি আসনে ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দিলেও রাস্তাঘাট মেরামত ও অবকাঠামো উন্নয়নে তা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম বলে মনে করছেন স্থানীয় এমপিরা। তারা বলছেন, অনেক এলাকায় এখনো ৯০ শতাংশ কাঁচা রাস্তা, আবার অনেক এলাকায় ব্রিজ-কালভার্ট করতে হবে। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভঙ্গুর রাষ্ট্র মেরামতে গ্রামীণ পর্যায়ে উন্নয়ন অবশ্যই দরকার। বিশেষ করে পল্লী ও প্রত্যন্ত গ্রামে। ৫০ কোটি টাকার চেয়ে আমাদের আরো বেশি কাজ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটি হাতে নিয়েছেন মূলত শহর ও গ্রামের মানুষের মধ্যে একটা সংযোগ তৈরি করতে। তবে অতীতে এমন প্রকল্পে দুর্নীতি-অনিয়ম হয়েছে। সেখান থেকে অবশ্য শিক্ষা নেয়ার কিছু নেই। আমরা সামনের দিনে স্বচ্ছতার মাধ্যমে কাজ করতে চাই। ভুল-ভ্রান্তি হতেই পারে, সেটার চেয়ে বড় কথা কীভাবে দুর্নীতি দূর করে স্বচ্ছতা আনা যায়।’
তবে সরকারি প্রকল্পে বৈষম্য করা হচ্ছে জানিয়েছেন শেরপুর-১ (সদর) আসনের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম। তার উপজেলায় এখনো ৮০০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা ও ১২টি ব্রিজের প্রয়োজন বলে জানান। জামায়াতে ইসলামীর এ সংসদ সদস্য বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পল্লী উন্নয়নে কোনো প্রকল্প নিয়ে থাকলে এটি ভালো উদ্যোগ। ছোট কাজগুলো করা যাবে। তবে এখানে আমরা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চাই। আগের মতো ঠিকাদারি আর থাকবে না। তবে গ্রামীণ পর্যায়ে আরো অনেক বরাদ্দের প্রয়োজন। সরকার বরাদ্দ দিচ্ছে কিন্তু সেখানে আমরা বৈষম্য দেখতে পাচ্ছি।’
অতীতে এমন প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরাও। দুর্নীতি রোধে কাজ করা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২০ সালে ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’র আওতায় করা ৬২৮টি কর্মসূচি নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ শতাংশ হারে কমিশন বাণিজ্য হয়। পরিবারের সদস্য, দলীয় নেতাকর্মী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনৈতিক সুযোগ দেয়ার অভিযোগও ছিল। আবার ৩৩ শতাংশ স্কিমে কাজের মান ভালো ছিল না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কর্তৃত্বপরায়ণ চোরতন্ত্রের আমলে সংসদীয় আসনভিত্তিক থোক বরাদ্দের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়নের নামে জনগণের অর্থের বহুমাত্রিক দুর্নীতি, অনিয়ম, অপচয় ও আত্মসাৎ হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবেও যে তা ব্যবহার হয়েছে, সুনির্দিষ্ট গবেষণায় প্রতীয়মান। এ অভিজ্ঞতার নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ না করে ঢালাওভাবে যদি একই পদ্ধতি চলমান রাখা হয়, বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে যদি জনপ্রতিনিধি ও তাদের স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অংশগ্রহণ রোধ করা না হয়, তাহলে একই পরিণাম হবে। পার্থক্য শুধু পালাবদলের।’
অতীতের দুর্নীতি, অনিয়ম থেকে বের হয়ে এসে প্রকল্প প্রণয়নের কথা বলছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানও। এ বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অতীতে থোক বরাদ্দের নামে এসব প্রকল্পের কোনো হিসাবনিকাশ সঠিকভাবে হয়নি। ফলে অবাধে দুর্নীতি হয়েছে। এমপিরা নিজেদের মতো করে ব্যয় করেছেন। সুতরাং নতুন প্রকল্পে নিশ্চিত করতে হবে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং কে কে কী করছেন সে হিসাবনিকাশ।’
টিআইবি ছাড়াও পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে দুর্নীতির তথ্য উঠে আসে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে। সংস্থাটির মূল্যায়নে ভুয়া বিল তৈরি, কাজে নিম্নমানের সামগ্রীর ব্যবহার, রাজনৈতিক ও স্বজনপ্রীতি, কমিশন বাণিজ্যের চিত্র পাওয়া যায়।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন আল রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমন প্রকল্পে এমপিদের একচ্ছত্র আধিপত্য দেয়া হয়। যার কারণে তারা স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি-অনিয়মের সুযোগ পান। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কিছু কমন ক্রাইটেরিয়া ঠিক করে দিতে হবে। প্রতিটা কাজের ছক তৈরি করে তা দায়িত্বশীলদের নজরদারিতে করতে হবে।’