ভাষা শেখার বদলে বিষয় হিসেবে নেয়া ইংরেজিতে দুর্বলতার অন্যতম কারণ

পড়াশোনার ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে। আমি যে গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছি, সেখানে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি ছিল। এখনো গ্রামের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ সমস্যা রয়েছে। অন্যদিকে সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের পদ সাধারণত পূরণ থাকে।

হাফছা জাহান। শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের সহকারী শিক্ষক। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি একজন আবৃত্তিকার ও স্ক্রিপ্টরাইটার। কাজ করেন প্রোগ্রাম উপস্থাপক হিসেবেও। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগ থেকে। শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গনের নানা দিক নিয়ে তিনি কথা বলেছেন বণিক বার্তার নিয়মিত আয়োজন ‘শিক্ষালয়’-এ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

আপনার শিক্ষকতার যাত্রা সম্পর্কে জানতে চাই। এখন পর্যন্ত কোথায় কোথায় পড়িয়েছেন এবং কত বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন?

আমার শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা প্রায় চার বছরের। এ যাত্রা শুরু হয়েছে মিলিটারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাধ্যমে। বর্তমানে আমি পদ্মা ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত আছি। এখানে তিন বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। মূলত চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়েই এ প্রতিষ্ঠানে আসা। তবে এটিকে আকস্মিক ঘটনা বলব না। কারণ ছাত্রজীবন থেকেই শিক্ষকতার প্রতি আমার কিছুটা আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই আজকের এ অবস্থানে আসা।

আপনি নিজেও নিশ্চয়ই শিক্ষার্থী হিসেবে গ্রামের সাধারণ স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। ক্যান্টনমেন্ট স্কুলগুলোর সুনাম মূলত সুশৃঙ্খল পরিবেশ ও ভালো ব্যবস্থাপনার জন্য। একটি সাধারণ গ্রামের স্কুলের সঙ্গে ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের পার্থক্য কীভাবে অনুভব করেন?

এখানে বেশকিছু পার্থক্য রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে প্রথমেই আসে শৃঙ্খলাবোধ। সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক বেশি শৃঙ্খলিত। শিক্ষার্থীদের আচরণ ও শৃঙ্খলার বিষয়ে এখানে বিশেষ নজর দেয়া হয়।

বর্তমান প্রজন্মকে অনেক সময় প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্ম বলা হয়। গেমিং অ্যাপ্লিকেশনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্লাটফর্মে তাদের বিচরণ রয়েছে। ক্যান্টনমেন্টের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার্থীদের এসব কর্মকাণ্ডের ওপর বিশেষ নজরদারি থাকে। শ্রেণীশিক্ষক কিংবা বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রত্যেক শিক্ষার্থীর আচরণ ও শৃঙ্খলার বিষয়টি তদারকি করেন। কারো আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন কিংবা নেতিবাচক কোনো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে কিনা, সেটিও তারা খেয়াল রাখেন।

পড়াশোনার ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে। আমি যে গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছি, সেখানে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি ছিল। এখনো গ্রামের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ সমস্যা রয়েছে। অন্যদিকে সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের পদ সাধারণত পূরণ থাকে। ফলে তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন। সব মিলিয়ে পড়াশোনার গুণগত মান ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে পার্থক্যগুলো সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান।

ক্যান্টনমেন্ট স্কুলগুলো সাধারণত সহশিক্ষা কার্যক্রমের জন্যও পরিচিত। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সারা বছর কী ধরনের খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়?

আমার প্রতিষ্ঠানের কথা বললে বলতে হয়, এখানে বছরজুড়েই বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম চলে। আমার জানা অনুযায়ী, অন্যান্য ক্যান্টনমেন্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও প্রায় একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আমাদের প্রতিষ্ঠানে মেডিটেশন, ডিবেটিং সোসাইটি, কবিতা আবৃত্তি ক্লাব, আর্ট ক্লাব ও ফটোগ্রাফি ক্লাবসহ নানা ধরনের ক্লাব রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সারা বছর খেলাধুলার আয়োজন থাকে। আমাদের স্পোর্টস শিক্ষকরা বেশ সক্রিয়। শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জনে তারা নিরলসভাবে কাজ করেন।

পাশাপাশি কারাতে ও তাইকোয়ান্দোর প্রশিক্ষণও রয়েছে। এগুলো সারা বছর চলমান থাকে। শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতেও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। লাইব্রেরিকেন্দ্রিক এসব উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করা হয়।

বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের সামনে নানা ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। সেখান থেকে তাদের দূরে রাখা এবং পড়াশোনা ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখার ক্ষেত্রে এসব সহশিক্ষা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা সাধারণত কৈশোরে প্রবেশ করে। এ সময় তাদের শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তন আসে। এ পরিবর্তনগুলো বিবেচনায় নিয়ে শ্রেণীকক্ষে বা শ্রেণীকক্ষের বাইরে শিক্ষকরা কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন? কিশোর গ্যাং, মাদক কিংবা ভিডিও গেমে আসক্তির মতো প্রবণতাগুলো কীভাবে মোকাবেলা করা হয়?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা অবশ্যই ভিন্ন। তবে আমি যেহেতু একটি সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করি, তাই আমাদের অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি।

আমাদের এখানে শ্রেণীশিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখেন। কোনো শিক্ষার্থী ক্লাসে অমনোযোগী থাকলে, দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে কিংবা তার আচরণে কোনো পরিবর্তন দেখা গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।

আমি নিজেও ক্লাস নেয়ার সময় অনেক কিছু খেয়াল করি। যেমন কোনো শিক্ষার্থীর চোখ লাল দেখা গেলে কিংবা তাকে ঝিমাতে দেখলে বিষয়টি আমার নজরে আসে। তখন মনে হতে পারে, সে হয়তো রাতে দীর্ঘ সময় গেম খেলেছে বা অন্য কোনো কারণে পর্যাপ্ত ঘুমায়নি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে অভিভাবকদের অবহিত করা হয়। কারণ অভিভাবকদের সঙ্গে আমাদের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।

আবার কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে পড়াশোনায় অমনোযোগিতা কিংবা নেতিবাচক কোনো অভ্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা দেখা গেলে আমাদের প্রতিষ্ঠানের মনোবিজ্ঞানীর কাছে তাদের পাঠানো হয়। সেখানে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনার পরিবেশে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষকদের পক্ষ থেকেও সহযোগিতা করা হয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে এখন নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যম শিক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শ্রেণীকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি আপনারা কীভাবে সামলান?

আমাদের প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক, প্রাথমিক ও কলেজ—তিনটি শাখার সব শ্রেণীকক্ষেই মাল্টিমিডিয়া সুবিধা রয়েছে। মাইক্রোফোনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সরঞ্জামের ব্যবস্থাও আছে। এসব প্রযুক্তির পূর্ণ ব্যবহার আমরা করে থাকি। যেমন শিক্ষকরা স্লাইড প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে পাঠদান করে। যেসব পাঠ মাল্টিমিডিয়ার সাহায্যে সহজে বোঝানো সম্ভব, সেগুলো এ পদ্ধতিতে পড়ানো হয়।

পাশাপাশি শিক্ষাদান পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। এখন আর কেবল লেকচারভিত্তিক শিক্ষার ওপর নির্ভর করা হয় না। বর্তমান শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীরা কী দেখছে, কী অভিজ্ঞতা অর্জন করছে এবং নির্ধারিত শিখনফল অনুযায়ী কতটুকু শিখতে পারছে, সেদিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হয়। কারণ কোনো বিষয় নিজে হাতে করে বা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিখলে তা দীর্ঘ সময় মস্তিষ্কে সংরক্ষিত থাকে। এর ইতিবাচক প্রভাব তাদের শেখার ফলাফলেও পড়ে।

তবে শ্রেণীকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের বিষয়টি আমরা আলাদাভাবে দেখি। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহারে আমরা অনেকাংশেই নিরুৎসাহিত করি। কারণ মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ পেলে তারা অনেক সময় বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনে চলে যায়, যা এ বয়সে তাদের জন্য সমীচীন নয়। তাই শিক্ষার্থীরা যেন প্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে না পড়ে, সে বিষয়ে শিক্ষকরা সতর্ক নজর রাখেন।

শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিষয়ে আপনাদের প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা কী?

আমাদের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন আনার কোনো অনুমতি নেই। তবে বিশেষ প্রয়োজনে, যেমন কোনো শিক্ষার্থীর বাড়ি অনেক দূরে এবং অভিভাবক কোনো কারণে তার সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকলে, এক-দুইদিনের জন্য ফোন আনার অনুমতি দেয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে শ্রেণী শিক্ষকের মাধ্যমে আগে অনুমতি নিতে হয়। এছাড়া আমাদের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য মোবাইল ফোন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার সর্বব্যাপী হয়ে উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশনসহ বিভিন্ন কাজে শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করছে। আপনাদের স্কুলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কতটা হচ্ছে? শিক্ষার্থীরা কীভাবে এটি ব্যবহার করছে এবং এ বিষয়ে শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গি কী?

আমি দেখেছি, ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থীরাও এআই ব্যবহার করছে। তারা মাত্র প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে এসেছে। অথচ কোনো ক্লাসে পড়ানোর সময় কিংবা অ্যাসাইনমেন্ট দেয়ার পর কেউ কেউ বলে, ‘মিস, আমি চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করেছি, সে এই উত্তর দিয়েছে।’ অর্থাৎ কিছু শিক্ষার্থী বয়সের তুলনায় প্রযুক্তি ব্যবহারে বেশ এগিয়ে।

তবে শিক্ষক হিসেবে আমি এআই ব্যবহারের পুরো বিষয়টিকে সমর্থন করি কিনা সেটি আলাদা প্রশ্ন। সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের পক্ষে আমি। কারণ শিক্ষার্থীরা এখনো তাদের জ্ঞান ও চিন্তাশক্তি গড়ে তোলার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এ সময়ে তারা যদি জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও শ্রম না দিয়ে সরাসরি তৈরি উত্তর নিয়ে আসে, তাহলে তাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আমার মনে হয়, নিজেরা চিন্তা করা ও ব্রেইনস্টর্মিংয়ের মাধ্যমে মস্তিষ্কের যে কার্যক্ষমতা বাড়ে, এআইয়ের তৈরি উত্তর সরাসরি গ্রহণ করলে সেই চর্চাটিও ব্যাহত হয়।

আপনি সমাজবিজ্ঞান পড়ান। আমাদের স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিকীকরণের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কেউ অন্তর্মুখী হয়ে পড়ছে, কেউ আবার অন্যদের সঙ্গে সহজে মিশতে পারছে না। বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্যের শিক্ষার্থীদের শ্রেণীকক্ষে কীভাবে সামলান?

এ প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইমের একটি কথা মনে পড়ছে। তিনি শিক্ষাকে সামাজিকীকরণের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন। এ প্রসঙ্গে ছোট্ট একটি বিষয় বলতে চাই। আমাদের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায়, বিশেষ করে নগরায়ণের ফলে শিক্ষার্থীদের সামনে স্ক্রিনের বাইরে কী কী বিকল্প সুযোগ আমরা তৈরি করতে পেরেছি, সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

আমাদের শ্রেণীতে সাধারণত ৫০-৫৫ জন শিক্ষার্থী থাকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মূল পাঠটি বুঝতে পারে না কিংবা অন্যদের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। আমরা তাদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করি এবং নিয়মিত শিখন কার্যক্রম ও শিখনফল পর্যবেক্ষণ করি। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলা হয়, প্রয়োজনে তাদের নিয়ে অভিভাবক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এরপর শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদাভাবে যত্ন নেয়া হয়।

আবার এমন শিক্ষার্থীও থাকে, যারা পড়াশোনায় ভালো, কিন্তু বেশ চঞ্চল বা দুষ্টুমি করে। তাদের শ্রেণীকক্ষে পড়াশোনায় মনোযোগী করাও শিক্ষকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে আমরা বোঝার চেষ্টা করি, কোন বিষয়টি তাকে বেশি আগ্রহী করে। যেমন কোনো শিক্ষার্থী হয়তো বিতর্ক পছন্দ করে, কেউ খেলাধুলায় ভালো। তাকে তার আগ্রহের জায়গা থেকে প্রশ্ন করলে সে বেশ উদ্যম নিয়ে উত্তর দেয়। তখন খেলাধুলা বা তার পছন্দের বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলতে ধীরে ধীরে পাঠের প্রসঙ্গে নিয়ে আসার চেষ্টা করি।

কারণ সব শিক্ষার্থীর শেখার ধরন এক নয়। কারো ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি কার্যকর, অন্য কারো ক্ষেত্রে সেটি নাও হতে পারে। তাই তাদের আগ্রহের জায়গা বুঝে পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করি। নিঃসন্দেহে এটি কঠিন ও সময়সাপেক্ষ কাজ। সব সময় যে সফল হই, তা-ও নয়। তবে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে চেষ্টার ঘাটতি থাকে না।

আমাদের স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা যায়—ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড হওয়ার প্রতিযোগিতা। অথচ জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতামূলক মনোভাব ও দলগত কাজের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এ ধরনের সহযোগিতার চর্চা কতটা রয়েছে? শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার মনোভাব তৈরিতে আপনারা কী করছেন?

বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের এ অবস্থার জন্য আমি পুরোপুরি তাদের দোষ দেব না। কারণ অভিভাবকরাই প্রত্যাশা করেন তাদের সন্তান জিপিএ ৫ পাক কিংবা শ্রেণীতে প্রথম হোক। ফলে চাপটা অনেকাংশে অভিভাবকদের পক্ষ থেকেই আসে।

পাশাপাশি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটিও কিছুটা সনদসর্বস্ব। প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ কিংবা জ্ঞান অন্বেষণের পদ্ধতি আমরা শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারছি কিনা সেটিও প্রশ্ন। কিছু শিক্ষার্থী অবশ্য এসব চর্চা করছে, তবে তাদের সংখ্যা হয়তো খুব বেশি নয়। অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে প্রকৃত জ্ঞান অন্বেষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে আমরা এখনো পিছিয়ে আছি।

তবে বর্তমান যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমে দলগত কাজ ও সহযোগিতামূলক কার্যক্রমের সুযোগ রয়েছে। পাঁচ, সাত কিংবা ১০ জনের দল করে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কাজ দেয়া হয়। তারা কোনো বিষয় পড়ে, পোস্টার তৈরি করে কিংবা প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে তাদের অর্জিত জ্ঞান ও কাজের ফলাফল তুলে ধরে। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের সহযোগিতামূলক মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। তবে এ পরিবর্তনের গতি বেশ মন্থর, সেটি স্বীকার করতে হবে। ভবিষ্যতে শিক্ষার রূপরেখায় আরো পরিবর্তন এলে এ জায়গায় কিছুটা উন্নতি হবে বলে আশা করি।

স্কুল পর্যায়ে পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলাও শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও চিন্তাশক্তি বিকাশের জন্য জরুরি। আপনাদের প্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরির ব্যবস্থা কেমন? শিক্ষার্থীরা সেখানে বই পড়তে যায় কিংবা বই নিয়ে আলোচনা করে কি?

আমাদের প্রতিষ্ঠানে বেশ সমৃদ্ধ একটি লাইব্রেরি রয়েছে। বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায়, বিশেষ করে ক্যান্টনমেন্টের বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এ ধরনের সমৃদ্ধ লাইব্রেরি খুব কম দেখা যায় বলে আমার মনে হয়। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত লাইব্রেরিতে আসে, বই নেয় এবং পড়ে। তবে যারা একাডেমিক পড়াশোনায় বেশি মনোযোগী, তাদের লাইব্রেরিমুখী হওয়ার প্রবণতাও বেশি।

লাইব্রেরিতে বইয়ের ভালো সংগ্রহ রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বই পড়ায় আরো আগ্রহী করে তুলতে আমাদের প্রতিষ্ঠানে বুক টক সেশনের আয়োজন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত কয়েকটি সেশন হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের পড়া বইয়ের সারসংক্ষেপ অনেকটা বুক রিভিউর মতো করে মঞ্চে উপস্থাপন করেছে। এ ধরনের কার্যক্রম আমাদের প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত হয়ে থাকে।

শিক্ষক হিসেবে কী ধরনের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে? বর্তমান সময়ের শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এসব প্রশিক্ষণ কতটা যথেষ্ট বলে মনে করেন?

শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিষয়টি তাত্ত্বিকভাবে শুনতে বেশ ভালো লাগে। তবে বড় প্রশ্ন হলো, প্রশিক্ষণ শ্রেণীকক্ষে পাঠদান ও কার্যক্রম পরিচালনায় কতটা সহায়তা করছে।

আমি যেহেতু একটি সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে কাজ করি, এখানে বছরে অন্তত দুবার, কখনো কখনো তারও বেশি প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পরপরই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবহার এবং ডিজিটাল লিটারেসি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। মাল্টিমিডিয়া শ্রেণীকক্ষ কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, সে বিষয়েও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ হয়।

পাশাপাশি বর্তমান কারিকুলাম অনুযায়ী কীভাবে শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশ্নপত্র প্রণয়নের বিষয়েও নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। নতুন যোগ দেয়া শিক্ষক কিংবা কয়েক বছর ধরে কাজ করছেন—এমন শিক্ষকদেরও এ প্রশিক্ষণ নিতে হয়। একটি মানসম্মত প্রশ্নপত্র প্রণয়নের জন্য এ ধরনের প্রশিক্ষণ আমাদের প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আয়োজন করা হয়।

আপনি স্কুলে ইংরেজিও পড়ান। আমাদের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে দুর্বলতার কারণ কী বলে মনে করেন? পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণেও দেখা যায়, ইংরেজি ও গণিতে তুলনামূলক বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়। বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষার দুর্বলতার জায়গাটি কোথায়?

আমার কাছে মনে হয়েছে, ইংরেজিতে দুর্বলতার অন্যতম কারণ হলো আমরা ইংরেজিকে ভাষা হিসেবে না শিখিয়ে একটি বিষয় হিসেবে শেখাচ্ছি। অথচ ইংরেজি অন্য পাঁচটি ভাষার মতোই একটি ভাষা। কিন্তু আমাদের এখানে ইংরেজি একটি বিষয়, যার ব্যাকরণসহ বিভিন্ন বিষয় শিখতে হবে—এভাবেই পড়ানো হয়।

আমাদের শিক্ষণ পদ্ধতিতে ভাষা শেখার স্বাভাবিক চর্চার সুযোগ তৈরি করা কঠিন। কারণ শিক্ষকদের নির্দিষ্ট সিলেবাস থাকে এবং সেটি শেষ করার তাড়া থাকে। সামনে পরীক্ষা থাকলে সেই চাপ আরো বাড়ে।

তবে আমার কাছে মনে হয়, শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে মূল ঘাটতিটা তৈরি হয় আগের শ্রেণীর ভিত্তি ঠিকভাবে তৈরি না হওয়ার কারণে। প্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষকদের প্রচেষ্টার ঘাটতিও থাকতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর যে শ্রেণীতে যে বিষয় শেখার কথা, সেটি যদি যথাযথভাবে শেখানো হয়, তাহলে পরবর্তী শ্রেণীতে গিয়ে তার শেখার ক্ষেত্রে বড় কোনো ব্যবধান তৈরি হওয়ার কথা নয়। তখন তার শেখার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

আমাদের দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে দেখা যায়, অনেক শিক্ষার্থীর প্রাথমিক পর্যায়েই যে ভিত্তি তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে ঘাটতি রয়েছে। ফলে মাধ্যমিকের শিক্ষকদের অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। একজন শিক্ষার্থীকে তার কাঙ্ক্ষিত ফলাফলে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় ও শ্রম দিতে হয়। ইংরেজির ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটে। শ্রেণীভিত্তিক পাঠ যথাযথভাবে সম্পন্ন না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীকে একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করতে হয়।

বাংলা ও ইংরেজির বাইরে শিক্ষার্থীদের তৃতীয় একটি ভাষা শেখানোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ হতে পারে। তবে দেশে প্রায় ২০ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, এমনকি প্রধান শিক্ষকও নেই। এ অবস্থায় তৃতীয় ভাষা চালু করার বাস্তব চ্যালেঞ্জ কী হতে পারে বলে মনে করেন?

তৃতীয় ভাষা শেখার প্রস্তাব নিঃসন্দেহে চমৎকার। তবে ইংরেজির ক্ষেত্রেই আমরা এখন যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি, সেটি বিবেচনায় নেয়া জরুরি। শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেও ইংরেজিতে সাবলীলভাবে দু-একটি বাক্য বলতে পারে না। অর্থাৎ ভাষা শেখার ক্ষেত্রে আমাদের যে ঘাটতি রয়েছে, সেটি এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

এ অবস্থায় আরেকটি ভাষা চালু করার সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই। তবে এর বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সংশ্লিষ্ট ভাষার শিক্ষক পাওয়া। ধরুন, কোনো বিদ্যালয়ে ফরাসি ভাষা চালু করা হলো। সেখানে ফরাসি ভাষা শেখানোর জন্য শিক্ষক কোথায় পাওয়া যাবে? এ প্রশ্নের সমাধান প্রয়োজন।

পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যেখানে বাংলা ও ইংরেজি—দুটি ভাষা শেখার ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে, সেখানে তাদের ওপর তৃতীয় একটি ভাষার চাপ যুক্ত করা কতটা সমীচীন হবে, সেটিও ভেবে দেখা দরকার।

এক যুগের বেশি সময়ে আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে বেশ কয়েকবার পরিবর্তন এসেছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার পরিবর্তনের ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের বর্তমান কারিকুলাম কতটা যথাযথ বলে মনে করেন?

এখন আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দূরশিক্ষণসহ নানা ধরনের নতুন ধারণা ও প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি। এ অবস্থায় আমাদের কারিকুলামকে বহির্বিশ্ব, বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও হালনাগাদ রাখা জরুরি। সেজন্য কারিকুলামের নিয়মিত পর্যালোচনা, পরিমার্জন ও সংশোধন প্রয়োজন। আমার মনে হয়, এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে কারিকুলামের যেসব জায়গায় পরিবর্তন দরকার, সেগুলো চিহ্নিত করে সংশোধন করা সম্ভব হবে।

বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা একজন শিক্ষার্থীর শিখনমান অনেক ক্ষেত্রে সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর সমপর্যায়ের। এ ঘাটতির কারণ কোথায়?

এখন শিক্ষকতা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। সমাজের উচ্চ বিত্ত থেকে নিম্ন বিত্ত—সব শ্রেণীর মানুষই কোনো না কোনোভাবে শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সবার সন্তান বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সবারই প্রত্যাশা ও মতামত রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। বুয়েটসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা মেধাবী তরুণরা শিক্ষকতা পেশায় আসছে। এমনকি তারা প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও যুক্ত হচ্ছে। ফলে শিক্ষকরা চেষ্টা করছেন না কিংবা আগের মতো আধুনিক পদ্ধতিতে পড়াচ্ছেন না—এমন কথা বলার সুযোগ কমে আসছে।

তবে একজন শিক্ষক চাকরিতে যোগ দেয়ার পরই যে বড় পরিবর্তন ঘটাতে পারবেন, বাস্তবে তা সব সময় সম্ভব হয় না। কারণ তার সামনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকে। আমি শুধু আমার প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা দিয়ে পুরো বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিচার করতে পারব না। প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন।

সেখানে একজন শিক্ষক প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পাচ্ছেন কিনা, প্রযুক্তিগত সহায়তা পাচ্ছেন কিনা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছেন কিনা, সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শিক্ষার জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

এখানে শ্রেণীকক্ষের আকারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, একটি শ্রেণীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫-২০ জন হওয়া উচিত। প্রয়োজনে সেটি ৩০ জন পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু আমাদের অনেক শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০-৫৫ জন। এত বড় শ্রেণীকক্ষ পরিচালনা করা একজন শিক্ষকের জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। ফলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি আলাদাভাবে মনোযোগ দেয়া সম্ভব হয় না। এতে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি থেকে যায়।

অভিভাবকদের সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের নিজেদের প্রচেষ্টার ঘাটতিও রয়েছে। তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতও এক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী বলে আমি মনে করি।

শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সুযোগ-সুবিধা ও শিক্ষার মানের পার্থক্য দীর্ঘদিনের। এ শিক্ষাবৈষম্যকে কীভাবে দেখেন? দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে এ বৈষম্য কতটা বড় চ্যালেঞ্জ?

দেশের বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী গ্রামীণ পরিবেশে বসবাস করে কিংবা গ্রাম থেকে বেড়ে ওঠে। আমার নিজের বেড়ে ওঠাও গ্রামে। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও কাজের সূত্রে বিভিন্ন জায়গায় থাকার সুযোগ হয়েছে। তাই গ্রামীণ শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা কতটা জরুরি, সেটি আমি উপলব্ধি করি।

তবে এখানে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্রামের শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত কর্মপরিবেশ এবং ডিজিটাল লিটারেসির সুযোগ নিশ্চিত করা। আমি আগেও বলেছি, একবিংশ শতাব্দীতে এসে শিক্ষা পদ্ধতির ধারণাই পরিবর্তিত হয়েছে। আগে শিক্ষক কথা বলতেন, শিক্ষার্থীরা শুনত—এমন লেকচারভিত্তিক পদ্ধতির ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো। এখন শিক্ষার্থী নিজে কাজ করবে, বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেবে। কোনো সমস্যায় পড়লে শিক্ষক সেখানে সহায়ক বা ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে ভূমিকা রাখবেন।

এ পরিবর্তিত শিক্ষা পদ্ধতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে একটি ভিডিও দেখালে শিক্ষার্থীর কোনো বিষয় সম্পর্কে ধারণা অনেক বেশি স্পষ্ট হতে পারে। শিক্ষক হয়তো ১ ঘণ্টা লেকচার দিয়েও একই বিষয় সেভাবে বোঝাতে পারবেন না, যেভাবে একটি উপযুক্ত ভিডিওর মাধ্যমে শিক্ষার্থী বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে।

কিন্তু গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক শিক্ষার্থী এ ধরনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। কারণ তাদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নেই। এ সহায়ক ব্যবস্থাগুলো নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষা ক্ষেত্রে অবশ্যই বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

শিক্ষাঙ্গনের কোন কোন জায়গায় পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করেন? কী ধরনের পরিবর্তন হলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে এবং শিক্ষার্থীরা বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো মানসম্মত শিক্ষা পাবে?

শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই আমাদের নানা ধরনের সংকট রয়েছে। এ অবস্থায় আমি বলতে চাই, জিডিপির ৪-৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। সেই বরাদ্দের মাধ্যমে শিক্ষকদের বেতনবৈষম্য দূর করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজিটাল সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষা খাতের এসব জায়গায় উন্নতি করা গেলে শিক্ষকতা পেশার প্রতিও মেধাবী তরুণদের আগ্রহ বাড়বে। বর্তমানে অনেক তরুণ করপোরেট খাত কিংবা বিসিএসসহ বিভিন্ন পেশার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হন। শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য দূর করে একটি উপযুক্ত কর্মপরিবেশ তৈরি করা গেলে তারাও শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহী হবেন। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষা খাতের বিদ্যমান সংকটগুলো কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে মনে করি।

আরও