কক্সবাজার থেকে ১ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকায় যাচ্ছিল যাত্রীবাহী ট্রেন পর্যটক এক্সপ্রেস। পথে চট্টগ্রামের পটিয়া আনসার ক্যাম্প এলাকায় নতুন এ ট্রেনটির ইঞ্জিনের বাফার হুক ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ১৮টি কোচ। পরে উদ্ধারকারী ইঞ্জিন দিয়ে কয়েক ঘণ্টা পর সেটিকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়। ট্রেনটিতে ছিল প্রায় ৯০০ যাত্রী। মধ্যরাত হওয়ায় সবাইকেই পড়তে হয় বিড়ম্বনায়।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেনে চলন্ত অবস্থায় ইঞ্জিন ও বগি বিচ্ছিন্ন হওয়ার এমন ঘটনা দিন দিন বাড়ছেই। গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন রুটে এমন একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। রেলওয়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, যাত্রাপথে বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলেও ট্রেন পার্টিং ছিল (একটি ট্রেন আলাদা হয়ে যাওয়া) ছিল খুবই কম। কিন্তু নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ, দীর্ঘদিন মেরামতহীন থাকার পাশাপাশি দক্ষ জনবল সংকটের কারণে ট্রেন পার্টিংয়ের মতো বিরল দুর্ঘটনা বাড়ছে। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ২৫টিরও বেশি ঘটেছে এমন ঘটনা।
পূর্বাঞ্চল রেলে কয়েকটি ট্রেন পার্টিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নতুন করে উদ্ধারকারী ইঞ্জিন পাঠিয়ে ট্রেন নিয়ে আসতে লেগেছে দীর্ঘ সময়। এতে যাত্রী ভোগান্তির পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো, কানেক্টিং ইঞ্জিন ও কোচে ফিরতি ট্রেনগুলোর যাত্রা শুরু করতে বিলম্ব হয়। এমনকি নির্ধারিত সময়ে কানেক্টিং ট্রেন পৌঁছতে না পারায় যাত্রা বাতিলও করতে হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত ছয় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে রেলে। এগুলো হলো মুখোমুখি সংঘর্ষ, এড়ানোর সংঘর্ষ, ওভার সুটিং, ট্রেন পার্টিং, ট্রেন লাইনচ্যুত ও এলসি (লেভেল ক্রসিং) গেটে দুর্ঘটনা। এর মধ্যে কয়েকটি দুর্ঘটনা নিয়মিত ঘটলেও মুখোমুখি সংঘর্ষ ও ট্রেন পার্টিং হয় খুবই কম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেন পার্টিং উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। এ ধরনের দুর্ঘটনায় হতাহতের ঝুঁকি কম থাকলেও বেরিয়ে আসে রেলের যান্ত্রিক প্রকৌশল ও ট্রেন অপারেশনে অদক্ষতা।
তথ্যমতে, ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত পূর্বাঞ্চল রেলে সর্বমোট দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৩৩টি। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৫৮টি, ২০২৪ সালে ৬৬ ও চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ঘটেছে নয়টি দুর্ঘটনা। ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম বিভাগে কেবল একটি ট্রেন পার্টিং দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে। অথচ কয়েক মাসে অন্তত এমন ঘটনা ঘটেছে চারটি। দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্রাংশ মেরামত ও পরীক্ষা না করা, ট্রেন সংযোগ বা সান্টিংয়ের জন্য দক্ষ জনবলের অভাব থাকায় ট্রেন পার্টিং দুর্ঘটনা ট্রেন অপারেশনকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে দুটি ট্রেন পার্টিংয়ের ঘটনা ঘটেছে নতুন কোচ ও নতুন ইঞ্জিনে। সর্বশেষ কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনটি কয়েক বছর আগে কোরিয়া থেকে আমদানি করা হুন্দাই রোটেমের ইঞ্জিন দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছিল। ইঞ্জিনটির কাপলিং স্ক্রু ভেঙে যাওয়ায় চলন্ত ট্রেন থেকে র্যাক বা কোচগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারও আগে কোরিয়া থেকে সদ্য আমদানি হওয়া মিটার গেজ কোচের কাপলিং ভেঙে ট্রেন পার্টিংয়ের ঘটনা ঘটেছে।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাবশালী ঠিকাদাররা কম দামে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছেন। অথচ কাগজে-কলমে উচ্চমানের বিদেশী যন্ত্রাংশ দেখানো হয়। এতে একদিকে যেমন সরকারি অর্থ অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি।
জানা গেছে, চলতি বছরের ২৬ জুলাই গোমদণ্ডী-জান আলীহাট সেকশনে কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনের বাফার শেং ভেঙে যায়। গত ১৮ আগস্ট তালশহর-আশুগঞ্জ সেকশনের মহানগর এক্সপ্রেস (চট্টগ্রাম-ঢাকা) ট্রেন পার্টিংয়ের কবলে পড়ে। এছাড়া ২ আগস্ট বুড়িমারী এক্সপ্রেস টঙ্গী-ঢাকা বিমানবন্দর সেকশনে এবং ১ সেপ্টেম্বর রাতে পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন পার্টিং হয়।
জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলওয়ে যাত্রী ও পণ্যসেবায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। এর পরও মানবসৃষ্ট কিংবা যান্ত্রিক কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। রেলপথে দুর্ঘটনা ঘটলেও সেটি স্থলপথের যেকোনো পরিবহনের তুলনায় খুবই নগণ্য। তাছাড়া আমরা এখন দ্রুত সংকট মোকাবেলায় দক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠছি।’