জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় জেলা কক্সবাজারে খাবার পানির সংকট দিন দিন বেড়েই চলেছে। বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন, লবণাক্ত পানির প্রবাহ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে এ সংকট তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা, যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর। চিকিৎসকরা বলছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে পানিতে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া বেড়ে গিয়ে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জরুরি ভিত্তিতে পানি সরবরাহ করতে তিন হাজার অগভীর, ৮০টি গভীর এবং এনজিও সংস্থা আরো ২০০-২৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করে। প্রতিদিন রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের জন্য ৩০ লাখ লিটার পানি উত্তোলন করা হচ্ছে শুধু উখিয়া ও টেকনাফ থেকে। অতিমাত্রায় পানি উত্তোলনের কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসানো ৯০ শতাংশ অগভীর নলকূপ থেকে এখন আর পানি উঠছে না। টেকনাফের হ্নীলা, টেকনাফ সদর, বাহারছড়া, সাবরাং, হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উনছিপ্রাং, হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা, রঙ্গিখালী, আলীখালী, জাদিমোরা, দমদমিয়া এলাকায় সবচেয়ে বেশি সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। উখিয়ায় গরমের তীব্রতা না থাকলেও পানির স্তর নিচে নামছে। এছাড়া ঈদগাঁও সদর, পোকখালী, গোমাতলী, ইসলামপুরের অনেক নলকূপে পানি উঠছে না। অকেজো হয়ে গেছে অনেক বৈদ্যুতিক মোটরও। এছাড়া কক্সবাজার শহরের নুরপাড়া, মাঝিরঘাট, টেকপাড়া, নতুন বাহারছড়া, বদরমোকামসহ বিভিন্ন এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক স্থানের পানি পান তো দূরের কথা, গৃহস্থালির কাজেও ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূগর্ভে পানি নেই কেন? কারণ হোয়াইক্যং এলাকার সংকট কাজে লাগিয়ে একটি চক্র পানি বিক্রি করছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে প্রধান ফসলসহ সবজি চাষাবাদ। রোহিঙ্গারা পানি পাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ। এনজিও সংস্থা কেন রিফাইনারি মেশিনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করছে না। প্রতি লিটার পানি সংস্থাগুলো ১ টাকা দামে কিনলে মূল বিক্রেতা ৩ হাজার লিটার পানি ৩০০ টাকা পাই কেন? এভাবে পানি সরবরাহের কারণে বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। সংস্থাগুলোর উচিত পানির জন্য ছড়া, বাঁধ ও পুকুরগুলো সংস্কার করা।
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মাওলানা নূর আহমদ আনোয়ারী বলেন, ‘হোয়াইক্যং ইউনিয়নের প্রায় সব ওয়ার্ডের কয়েক হাজার নলকূপে পানি উঠছে না। বিশেষ করে উলুবনিয়া গ্রামের নলকূপগুলো প্রায় ৭০০ ফুট গভীরে বসানো। সাব-মার্সিবল পাম্প বসিয়ে কৃষিজমিতে সেচ দেয়া ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরিকল্পিতভাবে সরবরাহ করায় পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এজন্য গভীর নলকূপগুলোতেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। লাখ টাকা খরচ করে বসানো নলকূপগুলোর অধিকাংশ অকেজো হয়ে গেছে। সংকট নিরসন করতে অপরিকল্পিতভাবে পানি উত্তোলন ও সরবরাহ বন্ধ করা জরুরি। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে এবং স্থায়ীভাবে পানির সংকট দূর করতে শোধনাগার নির্মাণসহ বিকল্প উৎস সন্ধান করা দরকার।’
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ও পাহাড়বেষ্টিত গ্রামগুলোতেও সুপেয় পানির অভাব দেখা দিয়েছে। নলকূপ অকেজো হওয়ার পাশাপাশি অকেজো হয়ে গেছে অনেক বৈদ্যুতিক মোটরও। একইভাবে পানি সংকট চলছে হ্নীলা ইউনিয়নেও।
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আলী জানান, তীব্র গরমে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সন্ধ্যা হওয়ার নারীরা বিভিন্ন জায়গা থেকে পানি সংগ্রহ করছেন। এ অবস্থা পুরো শুষ্ক মৌসুমজুড়ে থাকতে পারে।’
জানা গেছে, টেকনাফ, উখিয়া, কক্সবাজার শহর ও উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কায় ওয়াটার-এনার্জি-লাইভলিহুড (ওয়েল) নামে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। চলমান রয়েছে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রকল্প। সব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সুপেয় পানির সংকট দূর হবে। একই সঙ্গে সাগরের লবণাক্ত পানি পরিশোধন করে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তা নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এ ব্যাপারে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, ‘সুপেয় পানির সংকট দূর করতে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রকল্প চলমান। বিশেষ করে টেকনাফ পৌর এলাকার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এখন স্থানীয়রা খাবার পানি সংগ্রহ করতে পারছেন। প্রতিদিন পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জালিয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন স্থান থেকে ইউনিসেফের অর্থায়নে ও এনজিও ফোরামের ব্যবস্থাপনায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত ৮০০০-১০০০০ লিটার পানি দেয়া হবে। এছাড়া প্রতিদিন পৌরসভার পক্ষ থেকে দুটি ট্রাকে করে পানি সরবরাহ করা হবে। অন্যান্য ইউনিয়নে পানির সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদের কাজ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের নগরী কক্সবাজার। পর্যটন ঘিরে পৌর শহরে বিস্তৃত হচ্ছে নগরায়ণ। বাড়ছে জনসংখ্যা। বহুমুখী চাপে বেড়েছে সুপেয় পানির চাহিদাও। এক দশক ধরে জেলায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিম্নমুখী। শুধু পৌর শহর নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতি বছর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের কারণে ধ্বংস করা হয়েছে প্রায় ৮ হাজার হেক্টর বনভূমি। একই সঙ্গে প্রতিদিন ভূগর্ভ থেকে যে পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে মাটির নিচে সুপেয় পানি পাওয়া যাবে না। শুধু তাই নয়, বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি হওয়ায় বাড়ছে পানির লবণাক্ততা। এখান থেকে রক্ষা পেতে হলে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।’
এ সংকট দীর্ঘমেয়াদে চলতে থাকলে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া বেড়ে গিয়ে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা। এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. ইয়াসির আরাফাত বলেন, ‘লবণাক্ততা বাড়লে পান অযোগ্য পানিতে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া বেড়ে যেতে পারে। ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া বায়বীয় ও অবায়বীয় দুই অবস্থাতেই থাকতে পারে। এ ব্যাকটেরিয়ার কারণে মূত্রনালিতে সংক্রমণ, রক্তে বিষক্রিয়া, মেনিনজাইটিস টাইফয়েড, ডায়রিয়া, বমি ও রক্তযুক্ত মল, মূত্রত্যাগের সময় ব্যথা, প্রস্রাবে দুর্গন্ধ এবং প্রচণ্ড জ্বর হতে পারে।’