যশোর শিক্ষা বোর্ডে ১০ জেলার সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি

সনদ সংশোধনে ঘুরতে হয় দিনের পর দিন

গতকাল চার মাস বয়সী কন্যা সন্তানকে নিয়ে বোর্ডের প্রবেশদ্বারে বিভিন্ন কাগজপত্র হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় এ সেবাপ্রার্থীকে।

সনদে বাবার নাম সংশোধন করতে যশোর শিক্ষা বোর্ডে গত জুলাইয়ে আবেদন করেছিলেন বাগেরহাট জেলার ফকিরহাটের বাসিন্দা তৃপ্তি মির্জা। কিন্তু দুই মাস ধরে বোর্ডের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের কাছে ঘুরেও পাননি সমাধান। গতকাল চার মাস বয়সী কন্যা সন্তানকে নিয়ে বোর্ডের প্রবেশদ্বারে বিভিন্ন কাগজপত্র হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় এ সেবাপ্রার্থীকে। তার সঙ্গে কথা হলে ক্ষোভের স্বরে তিনি বলেন, ‘দুই মাস ধরে ঘুরছি। আজ আবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সেই বাগেরহাট থেকে এসে কাগজপত্র জমা দিয়েছি। এখন দুপুর গড়িয়েছে। ছোট সন্তানরে নিয়ে বোর্ডে ঘুরছি। এখনো কাজ হয়নি। একটা নাম সংশোধনের জন্য এ দেশে যদি এমন ভোগান্তি হয়, তাহলে আর সমস্যার কী হবে?’ শুধু তৃপ্তি নয়; যশোর বোর্ডে সেবা নিতে আসা অন্যদেরও একই অবস্থা।

জানা গেছে, ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যশিক শিক্ষা বোর্ড যশোর। এ বোর্ডের অধীনে একসময়ে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের সব জেলার একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা হতো। বর্তমানে বোর্ডের অধীনে রয়েছে খুলনা বিভাগের ১০ জেলার স্কুল ও কলেজ।

অভিযোগ রয়েছে, সনদে সংশোধন বা উত্তোলনের জন্য যশোর শিক্ষা বোর্ডে এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন দূর-দূরান্তের সেবাপ্রার্থীরাও। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে অনেককে। তবে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, এ সংকট তৈরি হয়েছে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে। তাদের দাবি, জনবল সংকটের কারণে সকাল থেকে শুরু করে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেলেও মানুষের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০ বছর ধরে জনবল সংকটের মধ্য দিয়েই চলছে যশোর শিক্ষা বোর্ডের দৈনন্দিন কার্যক্রম। ফলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সংকট নিরসনে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ৭৮টি পদে নতুন জনবল নিয়োগের অনুমোদন দেয়া হলেও এখনো শুরু হয়নি কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া। ফলে সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সেবাপ্রার্থীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

জানা গেছে, বোর্ডে অনুমোদিত মোট ২৫৩ পদের ১৫৭টিই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ৯৭ জন কর্মী নিয়ে কোনোমতে চলছে বোর্ডের যাবতীয় কার্যক্রম। ফলে জনবল ঘাটতির কারণে একজন কর্মচারীকে একাধিক শাখার দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে দাপ্তরিক কাজের গতি। সনদপত্র উত্তোলন কিংবা সংশোধনের জন্য সেবা নিতে ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবাপ্রার্থীরা।

কুষ্টিয়া থেকে আসা আমজাদ হোসেন বলেন, ‘মেয়ের সনদ তুলতে শিক্ষা বোর্ডে এসেছিলাম। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বসে আছি। দপ্তর থেকে বলছে লোক সংকট, দেরি হবে, অপেক্ষা করেন। সহজে সেবা মিলছে না।’

সাতক্ষীরা থেকে আসা সুদেব দাস বলেন, ‘আমরা যারা দূর থেকে আসি তাদের ভোগান্তির শেষ নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাজ হচ্ছে না। সংকট নিরসনে কর্তৃপক্ষকে আরো সোচ্চার হতে হবে।’

কথা হয় বরিশাল বিভাগের ভোলা থেকে আসা বাসিন্দা সুধাংশু কুমারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আগে আমরা যশোর বোর্ডের অধীনে ছিলাম। আগে বাংলায় সনদপত্র দিত। সেটির ইংরেজি ভাষান্তর করতে যশোর শিক্ষা বোর্ডে আসতে হয়েছে। গতকাল সারাদিন বসে থেকে সন্ধ্যায় পেয়েছি। সনদপত্র হাতে পাওয়ার পর দেখি বানান ভুল। ফের সংশোধনের জন্য আবেদন করেছি। এ বোর্ডে সেবা পেতে ভোগান্তির শেষ নেই।’

শিক্ষা বোর্ডের নিবন্ধন শাখার একজন কর্মচারী বলেন, ‘১০ জেলার জন্য ১০ জন লোক দরকার। কিন্তু আমি একা কাজ করছি। কাজ করতে হিমশিম খেতে হয়।’ প্রমাণ শাখার এক কর্মচারী বলেন, ‘একজন রাইটার অবসরে গেছেন। এখন আমি একা কাজ করছি। প্রচুর কাজের চাপ। সেবা দিতে অনেক কষ্ট হচ্ছে।’

এ বিষয়ে বিদ্যালয় পরিদর্শক এনামুল কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে রাত পর্যন্ত আমাদের কাজ করতে হয়। কিন্তু তাতেও সেবা নিতে আসা মানুষের কষ্ট লাঘব হচ্ছে না। জরুরি ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ করা জরুরি।’

যশোর শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক আবদুল মতিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জনবল সংকটে সেবাদানে সমস্যা হচ্ছে। জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ৭৮টি পদে নিয়োগের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়া হয়। যাচাই-বাছাই শেষে আপাতত ৪৫টি পদে নিয়োগ দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে একটি প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে সবুজসংকেত মিললেই সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। জনবল নিয়োগ হলে সংকট কেটে যাবে।’

আরও