নারী ও শিশু পাচারের অন্যতম রুট হয়ে উঠেছে কৈখালী সীমান্ত

সাতক্ষীরার সুন্দরবনের গাঘেঁষে কৈখালী সীমান্ত। এক পাশে বাংলাদেশ, অন্য পাশে ভারত। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এ ইউনিয়ন ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হয়েছে নারী পাচারের সক্রিয় চক্র।

সাতক্ষীরার সুন্দরবনের গাঘেঁষে কৈখালী সীমান্ত। এক পাশে বাংলাদেশ, অন্য পাশে ভারত। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এ ইউনিয়ন ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হয়েছে নারী পাচারের সক্রিয় চক্র। গভীর বনের পাশে কাঁটাতারবিহীন এ সীমান্ত সম্প্রতি নারী ও শিশু পাচারের অন্যতম রুট হয়ে উঠেছে। এ সীমান্ত দিয়ে পাচারের সময় নারী-শিশুদের উদ্ধারের ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। তবে পাচার হয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা উদ্ধারকৃতদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বলে দাবি স্থানীয়দের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানব পাচারের অপরাধে গ্রেফতার হলেও পরবর্তী সময়ে পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির স্থাপন করা না গেলে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বলছে, সীমান্ত এলাকা দিয়ে নারী-শিশুসহ সব ধরনের পাচার রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বাহিনীটি।

স্থানীয়রা জানান, কৈখালী সীমান্তের ইছামতী নদীর পাশে বেশকিছু অংশে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। ফলে খুব সহজেই ছোট ছোট নৌকায় করে নারী ও শিশু পাচারের জন্য এ সীমান্ত বেছে নিচ্ছে পাচারকারীরা। গত ২২ এপ্রিল কৈখালী সীমান্ত দিয়ে পাচারের আগে মানব পাচার চক্রের সদস্যদের গোপন আস্তানা থেকে ১২ জনকে উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে চার শিশু ও চার নারী। মূলত সুন্দরবনের কোলঘেঁষে এ সীমান্তের অবস্থান হওয়ায় এর আশপাশেই বেশকিছু অস্থায়ী ক্যাম্প গড়ে তুলেছে পাচারকারীরা। এসব ক্যাম্পে নারী ও শিশুদের আটকে রেখে সুবিধামতো সময়ে নদীপথে পাচারের চেষ্টা করা হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ভারত থেকে পাচারকারীরা এসব ক্যাম্পে আসে। তারা আটকে রাখা নারী-শিশুদের সঙ্গে করে নিয়ে যায়। পাচারের পর তাদের গন্তব্য হয় ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন হোটেলে। সেখানে তাদের জোরপূর্বক আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে।

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, একটা সময় ঝিনাইদহের যাদবপুর সীমান্ত ছিল নারী-শিশু পাচারের সবচেয়ে নিরাপদ রুট। তবে সেখানে নজরদারি ও তৎপরতা বৃদ্ধির পর পাচারকারীরা নতুন রুট হিসেবে কৈখালী সীমান্ত এলাকাকে বেছে নেয়। এ সীমান্ত সুন্দরবনসংলগ্ন গহিন অরণ্যে ঘেরা। এর মধ্য দিয়ে সহজেই পাচারকারীরা সীমান্তের খুব কাছাকাছি চলে যেতে পারে। কৈখালী সীমান্তের সবচেয়ে বেশি পাচারের ঘটনা ঘটে কালিন্দী, রায়মঙ্গল, বয়ারসিং, ঝাড়াখাল, কচুখালী ও ঝেটামুখ এলাকা দিয়ে। এখানে বাংলাদেশ অংশে মামুন কয়াল, আইজুল গাজী, রেজাউল গাজীসহ বড় একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। তাদের সহযোগী রয়েছে ভারতের দক্ষিণ ২৪ পরগনার হেমনগর ও কালীতলা এলাকা। এ দুটি এলাকা ভারতে পাচার হয়ে যাওয়া নারী-শিশুর অন্যতম গন্তব্য। সেখান থেকে চাহিদা অনুযায়ী এসব নারী-শিশুকে কলকাতাসহ আশপাশ এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

সীমান্ত সুরক্ষা ও চোরাচালান দমনের পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশু পাচার রোধে কাজ করছে বিজিবি। বিজিবির রিভারাইন বর্ডার গার্ড কোম্পানির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সৈয়দ আব্দুর রউফ এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৈখালীসহ সুন্দরবনের জল সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান দমনসহ যেকোনো পাচার রোধে তৎপর রয়েছে বিজিবি। বিশেষ করে নারী-শিশু পাচার রোধে নিয়মিত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেও পাচার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধে যুক্তদের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিজিবি।’

বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মানব পাচারের মতো অপরাধের মাত্রা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের মতো অর্থনৈতিকভাবে নাজুক অবস্থানে থাকা ব্যক্তিরা এর শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে স্থলপথে নারী-শিশু সবচেয়ে বেশি পাচার হচ্ছে সাতক্ষীরার কয়েকটি সীমান্ত দিয়ে। মানবাধিকার সংস্থা রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয়কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, ‘২০২৪ সালে আমরা ৮০ জনকে ভারতে পাচার হয়ে যাওয়া থেকে উদ্ধার করেছি। সাতক্ষীরার কৈখালী, কলারোয়া ও ভাদুরিয়া সীমান্ত দিয়েও এখন বেশি নারী-শিশু পাচারের ঘটনা ঘটছে। বর্ষাকাল হওয়ায় ভেলা নিয়ে নদীপথে এসব পয়েন্ট দিয়ে নারী-শিশু পাচারের চেষ্টা করছে পাচারকারীরা। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের সতর্ক অবস্থান দরকার।’

এদিকে নারী-শিশুসহ মানব পাচারের অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক সাজার নজির দেখা যাচ্ছে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানব পাচার প্রতিরোধ সেলের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্ট থেকে পরবর্তী ছয় মাসে সারা দেশে মানব পাচারের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫৭০টি। এ সময়ে ৩৪৭টি মামলার বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এসব মামলায় ২০ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হলেও খালাস পেয়েছে ৪০৪ জন। দৃষ্টান্তমূলক সাজার নজির সৃষ্টি করতে না পারায় মানব পাচার নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না বলে মনে করেন পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী এএসএম নাসির উদ্দিন এলান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশে গত ১৫ বছরে পুরো বিচার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল। পুলিশের তদন্তগুলোও হতো পক্ষপাতমূলক। ফলে আদালতে এসব তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য হতো না। অপরাধীরা পার পেয়ে যেত। তবে এখন পুলিশের সংস্কারে যেসব প্রস্তাব দেয়া হয়েছে সেগুলো কার্যকর হলে মানব পাচারকারীদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করা গেলেই এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।’

তবে মানব পাচার মামলায় অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের সহযোগিতা না পাওয়ায় তদন্ত পরিচালনা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে বলে মনে করেন পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আসামির সাজা না হওয়ার অন্যতম কারণ যথাসময়ে সাক্ষী হাজির না হওয়া। আবার অনেক সময় বাদী-বিবাদী নিজেদের মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা করে ফেলে। কোনো পক্ষ দেশের বাইরে থাকলেও বিচারের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। তাছাড়া জিম্মি হওয়া ব্যক্তি যদি দেশের ভেতরে থাকে, তাহলে তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে দেশের বাইরে হলে ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে।’

আরও