সুশাসনের অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটে ভুগছে খাতটি। বাজেটে যে বরাদ্দ দেয়া হয়, সেটিও কার্যকরভাবে ব্যয় করা যায় না। আবার স্বাস্থ্য খাতের পরিসরও যথাযথভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। সমন্বিত পাবলিক হেলথ পলিসি বা জনস্বাস্থ্য নীতি এখনো গড়ে তোলা যায়নি। স্বাধীনতার পর থেকে মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু ও নবজাতক মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণে বড় সাফল্য থাকলেও এখনো শিশুর অপুষ্টি অনেক বেশি। গত ১২ বছরে নবজাতক মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। ইমিউনাইজেশন কাভারেজ ৮০-৮২ শতাংশে স্থির হয়ে আছে, পরিবার পরিকল্পনা কাভারেজও আটকে আছে ৬৪-৬৫ শতাংশের মধ্যে। বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন সুসংগঠিত, আধুনিক ও কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বণিক বার্তার কার্যালয়ে গতকাল অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তাদের আলোচনায় এসব কথা উঠে আসে। যৌথভাবে এ গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে বণিক বার্তা ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। বৈঠকের প্রতিপাদ্য ছিল ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্বাস্থ্য খাতের বাজেট: একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গঠনে নাগরিক প্রত্যাশা।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন। বিশেষ আলোচক ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট অনুবিভাগ) এসএম হুমায়ুন কবির সরকার। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এছাড়া বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক, সাবেক স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের জ্যেষ্ঠতম সদস্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন, পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল, গ্যাভি সিএসও স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার ডা. নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ, পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (পিএসটিসি) নির্বাহী পরিচালক ড. নূর মোহাম্মদ, হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রীতি চক্রবর্তী, স্কয়ার হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসাম ইবনে ইউসুফ সিদ্দিক, এভারকেয়ার হাসপাতালের পরিচালক গ্রুপ মেডিকেল ডিরেক্টর ডা. আরিফ মাহমুদ ও ল্যাবএইড হাসপাতালের সিইও আহমেদ দাউদ। সূচনা বক্তব্য রাখেন বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সহকারী সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ বিশেষ সংবাদদাতা বদরুল আলম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখনো মূলত চিকিৎসা ব্যবস্থা হিসেবেই পরিচালিত হয়। অর্থাৎ স্বাস্থ্যকে আমরা চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। কিন্তু প্রকৃত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বড় অংশ হওয়া উচিত রোগ প্রতিরোধ, জনস্বাস্থ্য এবং প্রতিরোধমূলক বিনিয়োগ। অসুস্থ হওয়ার আগেই মানুষকে সুস্থ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য জনস্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা প্রয়োজন। অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্রও আমাদের সামনে আছে। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান—সব মিলিয়ে একটি কাঠামো আছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেবার কাঙ্ক্ষিত মান নেই। বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কীভাবে উন্নত করা যায় এবং কীভাবে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে সমন্বিত করা যায় সে পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে।’
সরকারের নিজস্ব সক্ষমতার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সক্ষমতাও কাজে লাগানোর প্রয়োজন রয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতের জন্য মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রকল্প মিলিয়ে এর মধ্যে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৩ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির বাস্তবায়ন, নির্বাচনী ইশতাহার এবং বিভিন্ন খাতভিত্তিক প্রতিশ্রুতিগুলোর দ্রুত বাস্তবায়নের জন্যই এ থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য খাতেও বিভিন্ন উদ্যোগ চলমান রয়েছে। যেমন সর্বজনীন হেলথ কার্ডের পরিকল্পনা।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, ‘সরকারের নির্বাচনী ইশতাহারে পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। এখানে ‘পর্যায়ক্রমে’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। আমার ধারণা, প্রথম বছরে এটি হয়তো ১ থেকে দেড় শতাংশের মধ্যে থাকবে। গত বছর মূল বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল জিডিপির প্রায় দশমিক ৭৪ শতাংশ। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে সেটি নেমে যায় দশমিক ৫ শতাংশেরও নিচে। অর্থাৎ যদি আমরা ১ শতাংশেও যেতে চাই, তাহলেও গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। আমরা অনেক সময় বাজেট বরাদ্দ পেলেও তা কার্যকরভাবে ব্যয় করতে পারি না। এ বাস্তবতা মেনেই আমাদের এগোতে হবে। এ দুর্বলতা কাটাতে প্রথমেই সক্ষমতা উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছি। কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিলে বাজেট বাস্তবায়নের দক্ষতা অবশ্যই বাড়ানো সম্ভব।’
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট অনুবিভাগ) এসএম হুমায়ুন কবির সরকার বিশেষ আলোচকের বক্তব্যে বলেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্য বাজেটকে দুটি দিক থেকে দেখতে হবে। একটি হলো রাজস্ব বা ট্যাক্স আদায়ের অংশ, আরেকটি হলো স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের অংশ। এ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও আবার দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে—একটি ব্যবস্থাপনা, অন্যটি বাস্তবায়ন। অনেকেই বলেন, স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বাজেট দেয়া হয় না। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনুযায়ী সরকার স্বাস্থ্য খাতে খারাপ বাজেট দেয়নি। আমাদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বাজেট বাস্তবায়নে দুর্বলতা। অনেক সময় উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশই খরচ করা যায় না। শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না, সেটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।’
শুভেচ্ছা বক্তব্যে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্য খাত যুগ যুগ ধরে অবহেলিত। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হামের প্রাদুর্ভাব। এর আগে আমরা কভিড-১৯ মহামারীর সময়েও সংকটময় মুহূর্তে আমাদের প্রস্তুতিহীনতা ও এর কারণে ঘটে যাওয়া অপূরণীয় ক্ষতির উদাহরণ দেখেছি। এ পরিস্থিতি এড়াতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে স্বাস্থ্য খাতকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া দরকার। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার বা ব্যক্তির নিজের বহনকৃত ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৭৫ শতাংশ। এর পাশাপাশি সুশাসনের অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটও রয়েছে। আউট অব পকেট এক্সপেনডিচারের কারণে দারিদ্র্য বাড়ছে। ২০১০ থেকে ২০২৬ সময়কালে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। বরাদ্দের ক্ষেত্রে উন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয় বেশি। বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রপাতি কেনায়ও বেশি ব্যয় হচ্ছে। এটি ২০১০ সালের ৪৪ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন প্রায় ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অবকাঠামো, ভবন কিংবা যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় স্বাস্থ্য খাতের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল কম এসেছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের যে বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়, তার বড় অংশই আমরা খরচ করতে পারি না। বলা হচ্ছে জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া হবে। তবে তার আগে আমাদের ভাবা উচিত বাজেট ব্যয় করার জন্য আমাদের সক্ষমতা আছে কিনা।’
ঢাবির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্য খাতের পরিসরটিকেই সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করি না। সাধারণত স্বাস্থ্য খাত বলতে আমরা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বুঝি। অথচ এর পরিধি অনেক বিস্তৃত। দীর্ঘদিন ধরেই আমরা সোশ্যাল ডিটারমিন্যান্টস অব হেলথ বা স্বাস্থ্য খাতের সামাজিক প্রভাবক নিয়ে কথা বলে আসছি। অর্থাৎ স্বাস্থ্যের বাইরের নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক উপাদান স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। স্থানীয় সরকার, পানি ও স্যানিটেশন, শিক্ষা, কৃষি—এসব খাত মানুষের স্বাস্থ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে একটি সমন্বিত ও কার্যকর পরিকল্পনা করতে হলে অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে কীভাবে একসঙ্গে কাজের আওতায় আনা যায় বা কীভাবে একটি ‘ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচে’ যাওয়া যায়, সেই আলোচনা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু আমাদের আলোচনা বিষয়টি এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।’
সাবেক স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের জ্যেষ্ঠতম সদস্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘সামনের দিনগুলোয় দারিদ্র্য আরো বাড়বে। বিভিন্ন গবেষণা ও পূর্বাভাসেও এ কথাই বলা হচ্ছে। আর দারিদ্র্য বাড়লে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদাও অনেক বেশি বাড়বে। তাই বর্তমান ঘাটতি ও ভবিষ্যতের এ চাপ মাথায় রেখে স্বাস্থ্য পরিকল্পনা ও বাজেট তৈরি করতে হবে। এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দুটি—স্বাস্থ্যে বাজেট বৃদ্ধি ও বরাদ্দকৃত বাজেটের কার্যকর ব্যবহার। শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না, সেটি দক্ষতার সঙ্গে খরচ করতে হবে। আবার যেখানে প্রকৃত প্রয়োজন নেই, সেখানে বাজেট বরাদ্দ দিলে হবে না। অর্থাৎ সঠিক খাতে বরাদ্দ এবং স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে।’
পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অনেক নীতি বা পলিসি রয়েছে। যেমন জনসংখ্যা নীতি, পুষ্টি নীতি, প্রজনন স্বাস্থ্যনীতি, কিশোরস্বাস্থ্য নীতি ইত্যাদি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে একটি সমন্বিত পাবলিক হেলথ পলিসি বা জনস্বাস্থ্য নীতি এখনো নেই। অথচ এখানে হওয়া যাবতীয় আলোচনার প্রায় সবকিছুই জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এসেছে। তাই আমি সরকারের শুরুতেই অনুরোধ রাখব দেশের জন্য একটি সুসংগঠিত, আধুনিক ও কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন করা হোক।’
গ্যাভি সিএসও স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার ডা. নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু ও নবজাতক মৃত্যুহার প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। পৃথিবীতে খুব অল্প কয়েকটি দেশই এমন সাফল্য দেখাতে পেরেছে। আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী এবং মাঠপর্যায়ের সেবাদান ব্যবস্থা এ পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু ১৯৮৫ সালের পর থেকে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবহেলা করেছি। ওই সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতের যেসব কর্মী গড়ে তোলা হয়েছিল, তাদের ওপরই দেশের মা ও শিশু স্বাস্থ্য কার্যক্রম নির্ভর করত। কিন্তু তখনকার তুলনায় জনসংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, সে অনুপাতে স্বাস্থ্যকর্মী বাড়েনি। এখন একজন স্বাস্থ্যকর্মীকে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছাতে হয়। আর শহরাঞ্চলে এ ধরনের সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। শহরের প্রায় ৯৫ শতাংশ মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা এনজিও ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো দিচ্ছে। ফলে অর্জন থাকলেও এখনো দেশে শিশু অপুষ্টি অনেক বেশি। গত ১২ বছরে নবজাতক মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। ইমিউনাইজেশন কাভারেজ ৮০-৮২ শতাংশে স্থির হয়ে আছে এবং পরিবার পরিকল্পনা কাভারেজও ৬৪-৬৫ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে।’
পিএসটিসির নির্বাহী পরিচালক ড. নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তখনই আধুনিক হবে, যখন সেটি হবে ন্যায়ভিত্তিক, সহজপ্রাপ্য এবং মানুষের জন্য সম্মানজনক হবে। আমরা যে সেবা দিচ্ছি, সেটি মানুষ সহজে পাচ্ছে কিনা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সেটির আওতায় আসছে কিনা তা দেখতে হবে। বিশেষ করে নারী, কিশোর-কিশোরী, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী ও দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে। মানুষের প্রত্যাশা হলো স্বাস্থ্যসেবা যেন সাশ্রয়ী ও মানসম্মত হয়। তারা স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে সম্মানজনক আচরণ চায়। আরেকটি বিষয় মানুষ বারবার বলে—প্রেসক্রাইব করা ওষুধ যেন সেই কেন্দ্রেই পাওয়া যায়। অর্থাৎ তারা ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চায়। তারা দক্ষ ও অভিজ্ঞ সেবাদানকারীও চায়। একই সঙ্গে তারা চায় স্বাস্থ্যসেবায় যেন কোনো বৈষম্য না থাকে।’
হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মূল ভরকেন্দ্র হলো মধ্যম সারির হাসপাতালগুলো। এ কারণে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতকে কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য একটি স্বতন্ত্র দপ্তর বা অধিদপ্তর গঠন করা প্রয়োজন। নজরদারি, সহযোগিতা ও জবাবদিহিতা—এ তিনটি বিষয় নিশ্চিত না হলে এত বড় একটি খাতকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।’
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, ‘ব্যক্তিগত পুঁজিতে একটি বড় টারশিয়ারি বা বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এজন্য ব্যাংক ঋণ, আর্থিক সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে সুদহার, ঋণের শর্ত, মর্টগেজ সুবিধা—কোথাও স্বাস্থ্য খাতের জন্য আলাদা কোনো নীতিগত সুবিধা নেই। অন্যান্য শিল্প খাতের জন্য যদি সুদহার কমানো যায়, তাহলে স্বাস্থ্য খাতের জন্য কেন বিশেষ সুবিধা থাকবে না? নীতিগত সহায়তা ছাড়া বড় বিনিয়োগ সম্ভব নয়। বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। আর সেই বিনিয়োগ আনতে হলে সরকারের নীতিমালায় পরিবর্তন আনা অবশ্যম্ভাবী।’
স্কয়ার হাসপাতালের সিইও মো. ইসাম ইবনে ইউসুফ সিদ্দিক বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা হলো স্বাস্থ্য খাতকে একটি মৌলিক মানবিক সেবা হিসেবে বিবেচনা করা হোক। অথচ বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতকে অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মতোই প্রায় ৩০ শতাংশ করপোরেট ট্যাক্স দিতে হয়। শেষ পর্যন্ত এ করের বোঝা গিয়ে পড়ে রোগীদের ওপর। এরপর আসে ট্যাক্স হলিডে বা কর ছাড়ের বিষয়টি। আগে সরকারের একটি ট্যাক্স হলিডে স্কিম ছিল। গত বছর সেটি ছিল না, তবে সংবাদপত্রে দেখলাম আগামী বাজেটে হয়তো আবার চালু হতে পারে। এছাড়া দক্ষ মানবসম্পদের অভাবও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্য খাতের যে সহায়ক পেশাগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য মানসম্মত কোনো সরকারি উদ্যোগ দেখা যায় না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্য বীমা বা হেলথ ইন্স্যুরেন্স। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যব্যয়ের চাপ কমাতে জাতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা প্রয়োজন। সরকার যদি অন্যান্য শিল্প খাতের মতো স্বাস্থ্য খাতের অতিরিক্ত করের বোঝা কিছুটা কমিয়ে দেয়, তাহলে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় অন্তত ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
এভারকেয়ার হাসপাতালের গ্রুপ মেডিকেল ডিরেক্টর ডা. আরিফ মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার মান পরিমাপের জন্য কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড বা জাতীয় কাঠামো নেই। বর্তমানে আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করি, কিন্তু সেটি একটি পূর্ণাঙ্গ মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নয়। এ মান পরিমাপ করতে হলে কিছু নির্দিষ্ট সূচক বা ইন্ডিকেটর প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে দেশে প্রায় দুই লাখের বেশি হাসপাতাল শয্যা রয়েছে। কিন্তু কোন হাসপাতাল কতটা ভালো, কোথায় সেবার মান কেমন—এ তথ্যগুলো আমাদের কাছে সুসংগঠিতভাবে নেই। হাসপাতাল ও ল্যাবরেটরিগুলোর জন্য একটি স্বাধীন অ্যাক্রেডিটেশন বডি গঠন এখন অত্যন্ত জরুরি। আর স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি পূরণ না করতে পারলে সরকারি বা বেসরকারি কোনো খাতেই মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।’
ল্যাবএইড হাসপাতালের সিইও আহমেদ দাউদ বলেন, ‘সরকার স্বাস্থ্য খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে এবং সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও স্বাস্থ্য শিক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ করছে। সে বাস্তবতায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো একই হারে কর আরোপ করা উচিত নয়। এ করহার বিদ্যমান সাড়ে ২৭ থেকে কমিয়ে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হোক। এটি সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের প্রতি ইতিবাচক বার্তা দেবে এবং বিনিয়োগে উৎসাহ তৈরি করবে। হাসপাতালের জন্য যন্ত্রপাতি আমদানিতে সরকার ১ শতাংশ শুল্ক সুবিধা দিলেও কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাটের কারণে ব্যয় বেড়ে যায়, যা পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।’