১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ করতে চাই আগামী পাঁচ বছরে

—ইকবাল হাসান মাহমুদ

মন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়

আমি চাই, দক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই (বিদ্যুৎ) বিতরণ ব্যবস্থার দায়িত্ব নিক। ভারতের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। কলকাতায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সফলভাবে বিদ্যুৎ বিতরণ করছে।

মুম্বাইয়ে রিলায়েন্স, দিল্লিতে আদানির মতো কোম্পানিগুলো এ দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করছে। তাহলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা কেন পারবেন না? সরকারের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা। খুচরা পর্যায়ের ব্যবসা পরিচালনা করা উচিত নয়। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, বাল্ক পর্যায়ে বিক্রি করতে পারে। কিন্তু খুচরা বিতরণ ব্যবস্থাটি দক্ষ বেসরকারি খাতের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত, এটা আমার ব্যক্তিগত মত। আমার অধীন যেসব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি রয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে আমি সেগুলোর বেসরকারীকরণ দেখতে চাই। বিদ্যুতের বিল আদায় করা বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ সময়মতো বিল পরিশোধ করতে চান না। এ কারণেই আমি মনে করি, এসব ক্ষেত্রে প্রাইভেট সেক্টরকে আরো বেশি সম্পৃক্ত করা উচিত। কারণ প্রাইভেট সেক্টরে জবাবদিহিতা বেশি থাকে, কালেকশন এফিশিয়েন্সিও ভালো হয়। ফলে সরকারের আর্থিক দায় কমে আসে এবং পুরো ব্যবস্থাপনাও আরো কার্যকর হয়।

আমরা বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা তৈরির চেষ্টা করছি। আমাদের প্রধানমন্ত্রীরও (তারেক রহমান) স্পষ্ট নির্দেশনা হলো সরকারি অর্থে আর সবকিছু করার প্রয়োজন নেই। যেখানে সম্ভব, বেসরকারি খাতকে দায়িত্ব দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। দেশ তো সবার।”আরেকটি বিষয় আমি বলতে চাই, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে দেশের জ্বালানি খাতে কার্যকর পরিকল্পনার অভাব ছিল। এ সময় দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে গুরুত্ব দেয়া হলেও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে জ্বালানি দরকার, সেই গ্যাস অনুসন্ধানে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। গত ১৭ বছরে একটি গ্যাসকূপও খনন করা হয়নি। ফলে পুরো দেশ এখন আমদানীকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।”আবার আমদানিনির্ভর জ্বালানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে দেশে মাত্র দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) রয়েছে। এর একটি এখন দুর্ঘটনার কবলে পড়ায় গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষ গ্যাস পাচ্ছে না, সিএনজি স্টেশনে গ্যাস পাচ্ছে না। অনেক জায়গায় মানুষ সড়ক অবরোধ করছে। এটি প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।”

দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির অবকাঠামোও আরো শক্তিশালী করতে হবে, যাতে কোনো একটি স্থাপনায় সমস্যা দেখা দিলে সারা দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি না হয়। এখন আমি সোলার এনার্জির বিষয়ে আসি। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সম্প্রতি আমরা একটি সোলার পলিসি ঘোষণা করেছি। আমার জানা মতে, এ প্রথম কোনো সোলার নীতিমালা ঘোষণার পর সিপিডি (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) প্রকাশ্যে এর প্রশংসা করেছে। সিপিডির মতো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়া সহজ বিষয় নয়। কিন্তু তারা আমাদের এ নীতিমালাকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছে। এ নীতিমালাটি পুরোপুরি বিনিয়োগবান্ধব। এখানে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ আমার বিশ্বাস, একজন বিনিয়োগকারী যদি তার বিনিয়োগের যথাযথ রিটার্ন না পান, তাহলে তিনি কেন বিনিয়োগ করবেন?

পাকিস্তানের উদাহরণও এখানে এসেছে। তারা একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ সোলার সরঞ্জাম আমদানি করে মানুষের কাছে সহজলভ্য করে দিয়েছিল। মানুষ নিজেরাই সোলার স্থাপন করেছে এবং সেখানে সোলারের বিস্তার ঘটেছে। আমরা অবশ্য সেই মডেলে যাচ্ছি না। আমাদের পরিকল্পনা হলো ফিসক্যাল সাপোর্ট দেয়া। অর্থাৎ কর-সুবিধার মাধ্যমে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা। আমরা সোলার খাতে বিদ্যমান বিভিন্ন কর কমিয়ে এনেছি, অনেক ক্ষেত্রে ন্যূনতম কর নির্ধারণ করেছি এবং ট্যাক্স হলিডে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাংলাদেশে ট্যাক্স হলিডে বরাবরই শিল্পায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। পাকিস্তান আমলেও এ ধরনের নীতির মাধ্যমে শিল্প খাতকে উৎসাহ দেয়া হয়েছিল। সে অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা সোলার খাতে একই ধরনের নীতিগত সহায়তা দিচ্ছি।

এখন সারা বিশ্বেই সোলার বিদ্যুতের ট্যারিফ কমে আসছে। কারণ সূর্যের শক্তির জন্য কোনো জ্বালানির খরচ নেই। মূল ব্যয় হচ্ছে ব্যবস্থাপনা, ব্যাটারি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। আমার বিশ্বাস, আমরা যদি এ মডেলে এগোতে পারি এবং আমাদের উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসেন, তাহলে এ খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হবে।

এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মোট এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। সবার সহযোগিতা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে আমাদের দায়িত্বকালের শেষ নাগাদ ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এটিই আমাদের লক্ষ্য। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে এ পুরো বিষয়টি সরকারের হাতে রাখতে চাই না। কারণ সরকারি প্রকল্পে প্রায়ই বিপুল অংকের বকেয়া তৈরি হয়। আমার নিজেরই হাজার হাজার কোটি টাকার বকেয়া রয়েছে। তাই আমি চাই, এটি প্রাইভেট টু প্রাইভেট মডেলে পরিচালিত হোক। বাজারে যে সবচেয়ে ভালো সেবা ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্য দিতে পারবে, সে-ই কাজ করবে। আর জমির বিষয়টি নিয়ে আমরা এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি। এখন মূল লক্ষ্য হবে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে রুফটপ সোলারের দ্রুত সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা।

এলপিজির বিষয়েও আমাদের প্রধানমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—যাদের ফ্যামিলি কার্ড আছে, তারা প্রতি মাসে একটি করে এলপিজি সিলিন্ডার কনসেশনাল রেটে পাবেন। অর্থাৎ একজন কৃষক বা সুবিধাভোগী তার ফ্যামিলি কার্ড ব্যবহার করে বাজারমূল্যে সিলিন্ডার কিনবেন। এরপর ভর্তুকির যে পার্থক্য থাকবে, সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। আমরা এ মডেলটি নিয়ে কাজ করছি। ভারতে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং তারা এ ক্ষেত্রে খুবই সফল হয়েছে।

আরও