বিশ্ব ডাক দিবস আজ

ই-কমার্সের বাজার বাড়ছে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক কাজে লাগাচ্ছে না ডাক বিভাগ

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাবেক সহসভাপতি সাহাব উদ্দিন শিপন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডাক বিভাগের বিদ্যমান যে অবকাঠামো ও প্রান্তিক পর্যায়ের নেটওয়ার্ক, তাতে ই-কমার্সে ২৫ শতাংশ সেবা দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে। বিশেষ করে লাস্ট মাইল ডেলিভারি, কোল্ড চেইন ও প্রত্যন্ত এলাকায় পণ্য পৌঁছে দিতে এই নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

কুমিল্লার একটি স্থানীয় পোস্ট অফিসে ডাকপিয়ন হিসেবে ২৫ বছর ধরে কাজ করছেন রমেশ চক্রবর্তী। একসময় সকাল হলেই ব্যাগ কাঁধে সাইকেল নিয়ে ছুটতেন তিনি। বিদেশ থেকে আসা সন্তানের চিঠি, শহর থেকে স্বামীর লেখা চিঠি কিংবা কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়ের খবর জানতে রমেশের অপেক্ষায় থাকত বহু পরিবার। চিঠি হাতে পাওয়ার মুহূর্তে ঘরের মানুষের মুখে ফুটে উঠত আনন্দ।

সেই দিন এখন আর নেই। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বদলে দিয়েছে মানুষের যোগাযোগের ধরন। হাতে লেখা চিঠির জায়গা নিয়েছে ফোনকল, মেসেজ ও চ্যাটিং। ফলে রমেশের ব্যস্ততাও কমেছে নাটকীয়ভাবে। এখন সপ্তাহে হাতেগোনা কয়েকটি পার্সেল ও সরকারি চিঠি বিতরণ করেই দায়িত্ব শেষ। ডাকঘরেই বসে কিংবা ঘুমিয়ে কাটে দিনের বড় একটি সময়।

রমেশের মতোই অনেকটা অলস হয়ে পড়েছে দেশের ডাক বিভাগের বিশাল অবকাঠামো। সারা দেশে প্রায় ১০ হাজার ডাকঘর, বিস্তৃত জনবল ও প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দ্রুত বাড়তে থাকা ই-কমার্সের বাজারে কার্যকরভাবে প্রবেশ করতে পারেনি সরকারি এ প্রতিষ্ঠান। চিঠির ব্যবহার কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনার দিকে ঘুরে দাঁড়াতেও পারেনি ডাক বিভাগ।

আজ বিশ্ব ডাক দিবস। ১৯৬৯ সাল থেকে ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের (ইউপিইউ) উদ্যোগে দিবসটি উদযাপন হয়ে আসছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘একটি ডাক নেটওয়ার্ক, অসীম সম্ভাবনা’। প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ডাক বিভাগের বাস্তবতার যেন বড় ধরনের বৈপরীত্যই ফুটে উঠছে। বিস্তৃত নেটওয়ার্ক থাকলেও নতুন অর্থনীতির অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল খাত ই-কমার্সে সেই নেটওয়ার্কের ব্যবহার এখনো সীমিত।

দেশে প্রতিদিনই বাড়ছে ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের পার্সেল। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ লাখ পার্সেল সরবরাহ হচ্ছে। এর বড় অংশই যাচ্ছে বেসরকারি কুরিয়ার ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। ডাক বিভাগের অংশ সেখানে নগণ্য, সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের মধ্যে বলে খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা। অথচ শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ডাক বিভাগের যে নেটওয়ার্ক রয়েছে, সেটিকে কাজে লাগানো গেলে ই-কমার্সের পিকআপ, পার্সেল সংরক্ষণ, বিতরণ ও লাস্ট মাইল ডেলিভারিতে বড় ভূমিকা রাখা সম্ভব বলে তারা জানান।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাবেক সহসভাপতি সাহাব উদ্দিন শিপন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডাক বিভাগের বিদ্যমান যে অবকাঠামো ও প্রান্তিক পর্যায়ের নেটওয়ার্ক, তাতে ই-কমার্সে ২৫ শতাংশ সেবা দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে। বিশেষ করে লাস্ট মাইল ডেলিভারি, কোল্ড চেইন ও প্রত্যন্ত এলাকায় পণ্য পৌঁছে দিতে এই নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। শুধু নিজস্ব ডেলিভারি সেবা নয়, বেসরকারি ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও ডাক বিভাগ সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে। এতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি ডাক বিভাগেরও আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।’

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে চিঠির ব্যবহার কমেছে। একই সময়ে দ্রুত বেড়েছে অনলাইন কেনাকাটা ও পার্সেল সরবরাহের চাহিদা। ইউপিইউর ২০২৫ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক ই-কমার্সের আকার প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পথে। এ বাজারে ইউপিইউর সদস্য দেশগুলোর ৬ লাখ ৭৯ হাজারের বেশি পোস্ট অফিসের নেটওয়ার্ককে নতুনভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

ইউপিইউর মতে, ডাক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে এর অবস্থান, স্থানীয় ঠিকানা সম্পর্কে জ্ঞান এবং শেষ মাইল পর্যন্ত পৌঁছানোর সক্ষমতা। অর্থাৎ ই-কমার্সের যে অংশটি সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও জটিল—সেই লাস্ট মাইল ডেলিভারিতেই ডাক নেটওয়ার্কের বড় সুবিধা থাকার কথা।

বাংলাদেশেও একই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দেশের ই-কমার্স বাজারের আকার নিয়ে নির্ভরযোগ্য সাম্প্রতিক তথ্য সীমিত হলেও আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পে-এনএক্সটির হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজারের আকার ছিল প্রায় ৭৪১ কোটি ডলার। এর আগে ২০২২ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ‘মিডিয়াম অ্যান্ড লং টার্ম ইন্টিগ্রেটেড রেভিনিউ স্ট্র্যাটেজিস’ প্রতিবেদনে দেশের বিজনেস-টু-কনজিউমার ই-কমার্স বাজারের আকার ৬৬০ কোটি ডলার বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল, ২০২৬ সাল শেষে এ বাজার ১ হাজার ৫০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে।

বাজারের এ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পার্সেল পরিবহনে ডাক বিভাগের অংশীদারত্ব বাড়েনি। ফলে একদিকে ডাক বিভাগের পুরনো চিঠিনির্ভর ব্যবসা সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগও কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

ই-কমার্সের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা চালু করা গেলে ডাক বিভাগের বিশাল নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন রাষ্ট্রীয় এ সংস্থার অতিরিক্ত মহাপরিচালক জাকির হাসান নূর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ই-কমার্সের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা চালু হলে ডাক বিভাগের বিস্তৃত নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে। দেশে প্রায় ১ হাজার ৬০০টি নিজস্ব পোস্ট অফিস রয়েছে, যেগুলোকে হাব হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। এর বাইরে প্রায় ৮ হাজার ২৮৪টি গ্রামীণ পোস্ট অফিস রয়েছে। তবে জনবল ঘাটতির কারণে অনেক জায়গায় সংযুক্তি কমে যাচ্ছে। ফলে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সেটিকে ই-কমার্সের লাস্ট মাইল ডেলিভারিতে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।’

জনবল সংকটকে সামনে আনলেও ডাক বিভাগের অধিকাংশ কর্মীই এখন কর্মশূন্য। তবে সংস্থাটির প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং পরিচালনাগত জটিলতা রয়েছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়। ই-কমার্সের ব্যবসায় যেখানে রাত পর্যন্ত অর্ডার নেয়া, দ্রুত পিকআপ, রিয়েল টাইম ট্র্যাকিং, ওটিপি যাচাই, গ্রাহকের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ এবং রিটার্ন ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ; সেখানে প্রচলিত ডাক ব্যবস্থার কাঠামো এখনো অনেকটাই পুরনো মডেলে আটকে আছে।

বেসরকারি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ‘অথবা ডটকম’-এর নির্বাহী পরিচালক খন্দকার তাসফিন আলম বলেন, ‘ই-কমার্সের প্রতিটি ডেলিভারিম্যানের স্মার্টফোন ব্যবহার, গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ, ওটিপি যাচাই, ট্র্যাকিং ও রিটার্ন ব্যবস্থাপনার মতো প্রক্রিয়ায় কাজ করতে হয়। কিন্তু ডাকের ক্ষেত্রে এখানে কিছু ঘাটতি আছে। তারা এখনো পুরনো মডেলে কাজ করে। ফলে ডাকঘর পর্যন্ত পণ্য পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে সেবা থাকলেও গ্রাহকের বাসায় পণ্য পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে বেসরকারি তৃতীয় পক্ষের সাহায্য নিতে হয়। ফলে ই-কমার্স খাতে তাদের সেভাবে অবদান বাড়েনি। বর্তমান ই-কমার্সে ডাক বিভাগের অংশ সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ হতে পারে।’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডাক ব্যবস্থা চিঠি সরবরাহের গণ্ডি পেরিয়ে ই-কমার্স ও লজিস্টিকস অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। জাপান পোস্ট, ডয়চে পোস্ট, সিঙ্গাপুর পোস্ট, লা পোস্ট ও কোরেওসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো পোস্ট অফিসকে পার্সেল সংগ্রহ ও বিতরণ, স্বয়ংক্রিয় সর্টিং, পার্সেল লকার, রিটার্ন ব্যবস্থাপনা এবং ই-কমার্স লজিস্টিকসের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে এসব দেশে ডাকঘর এখন কেবল চিঠি পাঠানোর জায়গা নয়; বরং স্থানীয় পর্যায়ের সংগ্রহ কেন্দ্র, পার্সেল হাব ও লাস্ট মাইল ডেলিভারি ব্যবস্থার অংশ। বাংলাদেশেও একই মডেল গ্রহণের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

দেশের ই-কমার্স বাজারের বড় অংশই এখন ফেসবুকভিত্তিক। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে প্রায় ৬০ শতাংশ ই-কমার্স কার্যক্রম সামাজিক যোগাযোগের এ মাধ্যমকেন্দ্রিক। পাশাপাশি দারাজ, পিকাবু, রকমারি ও প্রিয় শপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানও অনলাইন বাণিজ্যের বাজার সম্প্রসারণ করছে।

এ বাজারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো লাস্ট মাইল ডেলিভারি। রাজধানী বা বড় শহরের বাইরে পণ্য পৌঁছে দিতে যেখানে বেসরকারি কুরিয়ারগুলোকে বাড়তি পরিবহন ব্যয় ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়, সেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ডাক বিভাগের উপস্থিতি বড় সুবিধা দিতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, প্রায় ১০ হাজার ডাকঘরকে স্থানীয় সংগ্রহ ও সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা গেলে বিশেষভাবে উপকৃত হতে পারেন গ্রামীণ উদ্যোক্তা, ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসায়ী, কৃষক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। তাদের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পাঠানোর খরচ কমতে পারে।

ডাকঘরগুলোকে স্থানীয় হাব হিসেবে ব্যবহার করে অনলাইন উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, সরবরাহ এবং ফেরত পণ্য গ্রহণের ব্যবস্থা করা গেলে একই অবকাঠামো থেকে একাধিক সেবা দেয়া সম্ভব। ভবিষ্যতে ডিজিটাল আর্থিক সেবা, সরকারি নথি বিতরণ, বীমা, সঞ্চয়, রেমিট্যান্স, পরিচয় ও ডিজিটাল ঠিকানা ব্যবস্থাপনার মতো সেবার সঙ্গেও এ নেটওয়ার্ককে যুক্ত করা যেতে পারে বলে মনে করেন তারা।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমি অবশ্য জানান, ই-কমার্স ও পার্সেল সেবার বাজার ধরতে ডাক বিভাগকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘লাস্ট মাইল ডেলিভারি নিয়ে যে ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে, তা উত্তরণে কাজ করছি। ডাক বিভাগের কর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন। নতুন করে ফ্র্যাঞ্চাইজি চালুর পাশাপাশি সেবার সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে ডাক বিভাগের সেবার মান আরো বাড়ানো হবে। তবে সরকারি কর্মীদের নির্দিষ্ট সময় থাকে। কিন্তু সেবাটা আরো বাড়াতে হলে, বিশেষ করে বর্তমানের মার্কেট ধরতে হলে আমাদের সময় বাড়াতে হবে।’

আরও