বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর পড়ে, উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং অর্থনীতির প্রধান খাত (কৃষি, শিল্প ও সেবা) সবকিছুকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে এতদিন আমরা যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বলে এসেছি, সেই প্রবৃদ্ধির হিসাবের মধ্যে পরিবেশগত সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের প্রকৃত ব্যয় পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত হয় না। এই ব্যয়গুলো যদি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে আমাদের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি বা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ আরো কমতে পারে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘গ্রিন ডায়ালগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক আয়োজনে এসব কথা বলেন তিনি।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন ধরনের নীতিমালা ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়, এটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তীব্র তাপপ্রবাহ উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বলেন মনে করেন এ অর্থনীতিবীদ। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থার হিসেবে দেখা গেছে, প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের (হিটওয়েভ) কারণে মানুষের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা কমে যায়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বেড়ে যায়। এসব কারণে উৎপাদন কমে যায় এবং অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। সুতরাং, জলবায়ু পরিবর্তনকে আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হবে।
তিনি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের যে সংকটের মধ্যে আমরা রয়েছি, তার জন্য বাংলাদেশ প্রধানত দায়ী নয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে কার্বননির্ভর ও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক ছিল। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে যে বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়েছে, তার অভিঘাত এখন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে বহন করতে হচ্ছে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, আমরা দায়ী না হলেও আমাদেরও করণীয় রয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে যারা বেশি কার্বন নিঃসরণ করেছে এবং যারা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাদের মধ্যে একটি বড় বৈষম্য রয়েছে। এই বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশের জন্য অভিযোজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোজন বলতে বোঝায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া। প্রাকৃতিক দুর্যোগে জীবিকার সঙ্গে অভিযোজনের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছেন। কিন্তু এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যথেষ্ট অর্থের প্রয়োজন হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্ক এবং কপ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে কি ধরণের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে- সে বিষয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন বা কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজের (কপ) মতো বৈশ্বিক আলোচনায় উন্নত দেশগুলো বিভিন্ন ধরনের অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কতখানি হচ্ছে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এখানে আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের বড় অংশ প্রশমন বা মিটিগেশনের জন্য বরাদ্দ হয়। বিভিন্ন হিসাব ও আলোচনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ অর্থ প্রশমনের জন্য এবং ৩৫ শতাংশ অভিযোজনের জন্য বরাদ্দ হওয়ার চিত্র দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে অভিযোজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে যেকোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ফলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলা, মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষা এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অভিযোজনের জন্য অর্থায়ন বাড়ানো জরুরি।