বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে হাওর ও নদ-নদী ছিল পানিতে টইটম্বুর—এই দৃশ্য একসময় ছিল খুবই সাধারণ। কিন্তু গত কয়েক বছর এ চিত্র পাল্টে গেছে। সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় সুনামগঞ্জের হাওরে দেশী মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দেশী মাছের আধার হাওরাঞ্চলজুড়েই এখন মাছের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
এক যুগ আগেও সুনামগঞ্জজুড়ে মিলত অসংখ্য প্রজাতির দেশী মাছ। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত এসব সুস্বাদু মাছ শুধু স্থানীয়দের চাহিদাই মেটাত না, সরবরাহ হতো সিলেট, ঢাকা, ময়মনসিংহ, ভৈরব, এমনকি রফতানি হতো বিদেশেও। ফলে এসব মাছ দেশের অর্থনীতিতেও রাখত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন সেই দৃশ্য পাল্টে গেছে। প্রাকৃতিক দেশী মাছ এখন আর আগের মতো মিলছে না। অনেক প্রজাতি প্রায় বিলুপ্তির পথে। মৎস্য বিভাগ বলছে, বৃষ্টি ও পানির সংকটের কারণে এবার মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।
হাওরে বিলুপ্তপ্রায় দেশী মাছের তালিকায় রয়েছে রানী, গুতুম, দারকিনা, চাপিলা, চাটুয়া, চান্দা, বড় চান্দা, গোল চান্দা, আইড়, গুলশা, পাবদা, দেশী পুঁটি, সরপুঁটি, তিতপুঁটি, বাইলা, মেনি, ভেদা, শিং, কৈ, টাকি, শোল, কাংলা, মলা, ঢেলা, কানপোনা, রিটা, পিয়ালি, খৈলশা, ছোট টেংরা, বড় টেংরা, কাজলি, চ্যাং, ছোট চিংড়ি, বাতাশি, বড় বাইম, বাগাই, তারা বাইম ও কাইক্যা। এ মাছগুলোর জায়গা দখল করেছে হাইব্রিড পাঙাশ, তেলাপিয়া, সিলভার কার্প, কার্গো, মিরর কার্প, গ্রাস কার্প ও চাষের সরপুঁটি।
হাওর এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ, পোনা মাছ ধরা, জলাশয় সেচে মাছ নিধনসহ নানা কারণে গত কয়েক বছরে প্রায় ৩০-৩৫টি দেশী মাছের প্রজাতি বিপন্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ভারি বর্ষণ হলে সুনামগঞ্জে সাধারণত বন্যা দেখা দেয়। এবার সেখানে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় সুনামগঞ্জেও বন্যা বা পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়নি। ফলে হাওরে পানি না থাকায় মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়েছে, যা মাছ উৎপাদনের জন্য এক অশনিসংকেত।
স্থানীয় জেলে আলাউর মিয়া জানান, ‘আগে এ সময়ে অনেক মাছ ধরতাম। নতুন পানিতে মাছ জন্মাত বেশি। কিন্তু এবার পানিই নেই, মাছ কোথা থেকে হবে?’ জেলে রহিম মিয়া বলেন, ‘এ সময় হাওরে জাল ফেললে হাজার পাঁচশ টাকার মাছ পাওয়া যেত। এবার মাছ নেই, আয় নেই। চাষের মাছেই এখন সংসার চালাতে হচ্ছে।’
আড়তদার হাবিব মিয়া জানান, দেশী মাছ না থাকায় চাষের মাছের দামও বেড়েছে। রুই-কাতলা কেজিপ্রতি ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় কৈ বিক্রি হচ্ছে ২৮০-৩২০ টাকায়। অনেক সময় চাষের মাছও ঠিকঠাক মিলছে না। ফলে দাম দিয়ে কিনে সেই দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের হাওর নিয়ে কাজ করা সংগঠন হাওর এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটির (হাউস) নির্বাহী পরিচালক সালেহিন চৌধুরী শুভ বলেন, ‘এবার বন্যা তো দূরের কথা, বর্ষার প্রকৃত রূপও দেখা যায়নি। ফসল রক্ষা বাঁধে ফিশ পাস না থাকায় মাছের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব। ভবিষ্যতে দেশী মাছ বিলুপ্তির দিকে যাবে এবং আমরা সবাই চাষের মাছের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হব।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শামছুল করিম জানান, ‘এ বছর ভারি বর্ষণ না হওয়ায় দেশী মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। অবাধে পোনা ও মা-মাছ ধরার কারণেও দেশী মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। এর পেছনে বড় কারণ হাওরের অপ্রয়োজনীয় ফসল রক্ষা বাঁধ। মাছগুলো তাদের প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশে পৌঁছতে পারছে না।’ মৎস্য কর্মকর্তা জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সুনামগঞ্জে মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ হাজার টন, যা অর্জিত হয়েছে। চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রা ৩৯ হাজার টন হলেও সময়মতো পানি না আসায় তা অর্জন নিয়ে রয়েছে শঙ্কা, বিশেষ করে দেশী মাছের ক্ষেত্রে।
একসময় হাওরভিত্তিক জীবিকা নির্বাহকারী মানুষের আয়ের প্রধান উৎস ছিল দেশী মাছ। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে সেই স্বাদ ও চাহিদা মেটাতে বাজার পুরোপুরি চাষের মাছের ওপর নির্ভরশীল।