সে সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের বড় অংশ এখনো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও দপ্তরপ্রধান হিসেবে কর্মরত। তবে আসন্ন ঈদুল ফিতরের পর চুক্তিভিত্তিক অনেক কর্মকর্তার নিয়োগ বাতিল হবে বলে জানা গেছে। এছাড়া চুক্তিভিত্তিক অনেক কর্মকর্তার মেয়াদ শেষের দিকে। অনেকে আবার নিজেই পদ থেকে সরে যাচ্ছেন। ১৪ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্বে থাকা শেখ আব্দুর রশিদের চুক্তি বাতিলের প্রজ্ঞাপন হয়। সে সময় শেখ আব্দুর রশিদ সংবাদমাধ্যমকে জানান, তিনি আগেই পদত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের কারণে তা গৃহীত হয়নি। একই দিন সাবেক প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন মিয়াকে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। একদিন পর তিনিও চাকরি থেকে পদত্যাগের আবেদন করেন। ওইদিনই মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ পান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি। শেখ আব্দুর রশিদ ও সিরাজ উদ্দিন মিয়া দুজনই অন্তর্বর্তী সরকারের দেয়া চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কর্মরত ছিলেন।
চুক্তিভিত্তিকের পাশাপাশি অনেককে সাময়িক নিয়োগও দিয়েছিল বিগত সরকার। গতকাল সকালে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান। তাকে সাময়িক নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। দেশের আরো তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে সাময়িক নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন নির্বাচিত বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতাহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মেধাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়া হবে। এরই অংশ হিসেবে জনপ্রশাসন ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের বড় অংশের নিয়োগ বাতিল করে তাদের জায়গায় নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হবে। তবে এ সিদ্ধান্ত এখনই বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আসন্ন ঈদুল ফিতরের পর এ বিষয়ে কার্যক্রম শুরু হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জনপ্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল হতে যাচ্ছে। রমজান মাসের কারণে একটু সময় নেয়া হচ্ছে। ঈদের পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের বড় অংশকেই বাদ দেয়া হতে পারে। পাশাপাশি মেধাবী কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে প্রশাসন সাজানোর নির্দেশনা এসেছে।’
সরকারি কর্মচারী বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদমর্যাদার অন্তত ১৮ কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বাদে বাকি সবার নিয়োগ হয় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। অন্তর্বর্তী আমলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়াদের মধ্যে রয়েছেন—মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি, পরিকল্পনা কমিশনের দুই সদস্য (সিনিয়র সচিব) মো. মোখলেস উর রহমান ও এমএ আকমল হোসেন আজাদ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক, নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) মকসুমুল হাকিম চৌধুরী, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. নেয়ামত উল্লাহ ভূইয়া, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ এবং জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক (সিনিয়র সচিব) সিদ্দিক জোবায়ের।
এছাড়া রয়েছেন ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) মোহাম্মদ ইউসুফ, পর্তুগালের লিসবনে বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত (সচিব) মো. মাহফুজুল হক, ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান এজেএম সালাউদ্দিন নাগরী, বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক শরিফা খান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান এবং বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সচিব) এসএম মঈন উদ্দিন আহমেদ। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ মূলত রাখা হয়েছে ব্যতিক্রমী যোগ্যতা বা বিশেষ দক্ষতার মানুষদের প্রয়োজনে কাজে লাগানোর জন্য। কিন্তু যখন এটি নিয়মের বদলে প্রচলিত চর্চায় পরিণত হয় বা পক্ষপাতমূলকভাবে ব্যবহার হয়, তখন সেটি সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই নীতিগতভাবে যদি সার্ভিসের ভেতরেই যোগ্য লোক থাকে, তাহলে তাদের মধ্য থেকেই বাছাই করে দায়িত্ব দেয়া উচিত। এতে তারা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার সুযোগ পান, নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারেন এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য বেশি অবদান রাখতে পারেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই শীর্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনে অস্বস্তির সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে এমন নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তার অনেকের নেতৃত্বাধীন দপ্তরের কার্যক্রম বিতর্কের মুখে পড়ে। নিয়মিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের দূরত্ব থাকায় এসব দপ্তরে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের এক অতিরিক্ত সচিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের অভিযোগ ছিল কর্মকর্তারা সরকারকে সহযোগিতা করেনি। মূলত কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগই ছিল না। কারণ লিডিং মন্ত্রণালয়গুলোর সচিব চুক্তিভিত্তিক হওয়ায় উনাদের সঙ্গে নিয়মিত কর্মকর্তাদের দূরত্ব ছিল। সব কিছু মিলিয়ে পুরো আমলাতন্ত্র সমন্বয়হীনভাবে পরিচালিত হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনায়।’
এ কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে সব কিছু সমন্বয়ের চেষ্টা করছে। রমজানজুড়েই এটা চলবে। ঈদের পরপরই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলসহ নিয়মিত কর্মকর্তাদের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়া হতে পারে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের বদলির ঘটনা নিয়মিত কর্মকর্তাদের অনেকের মধ্যে হতাশার জন্ম দেয়। সাধারণত নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে কোনো কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করা হয়। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সরকার প্রয়োজনে তা বন্ধ করে দেয় বা চুক্তি নবায়ন করে। এ ধরনের কর্মকর্তাদের সাধারণত বদলি করা হয় না।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যখন শীর্ষ প্রশাসনিক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়, তখন পদোন্নতি প্রত্যাশী কর্মকর্তাদের হতাশ হওয়া স্বাভাবিক। এর ফলে প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয়। কারণ পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তারা দায়িত্বের প্রতি মনোযোগ হারাতে পারেন।’
চব্বিশের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে দেশের পুলিশ প্রশাসন। এ সংকটের প্রভাব পড়ে দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে। সে সময় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয় বাহারুল আলমকে। বিভিন্ন সূত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে তিনিও যেকোনো সময় পদত্যাগ করতে পারেন।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ একেবারে অনিবার্য পরিস্থিতি ছাড়া দেয়া ঠিক নয় বলে মনে করেন সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘যদি কোনো খাতে এমন একজন অসাধারণ মেধাবী বা দক্ষ ব্যক্তি দরকার যিনি না থাকলে কাজের মান ঠিক রাখা কঠিন হবে, সেক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের যৌক্তিকতা থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রয়াত আকবর আলি খানের মানের কাউকে যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দরকার হয় এবং সেই মানের বিকল্প কাউকে না পাওয়া যায়, সেরকম পরিস্থিতিতে বিশেষ বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘অতিরিক্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রশাসনের ভেতরে হতাশা তৈরি করতে পারে। কারণ নিয়মিত সার্ভিসে থাকা কর্মকর্তারা মনে করতে পারেন যে তাদের পদোন্নতি বা দায়িত্ব পাওয়ার স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনের দক্ষতা ও ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী কোনো মন্তব্য করেননি। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (জনপ্রশাসন) মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে মুঠোফোনে কল ও মেসেজ করা হলেও গত রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।