পর্যটন জেলা সুনামগঞ্জের ছাতকে যেখানে-সেখানে কাঠভিত্তিক চুন কারখানা

নির্গত ধোঁয়া ও ছাইয়ে ঝুঁকির মুখে জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য

একটি কারখানার শ্রমিক লোকমান মিয়া জানান, একেকটি কারখানায় মাসে দুইবার চুন পোড়ানো হয়। একটি পাজু তৈরিতে ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিকের ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। এরপর ভেতরে ৭৫ টন চুনাপাথর সাজিয়ে মাটির প্রলেপ দেয়া হয়।

পর্যটন জেলা সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা শহর ও আশপাশ এলাকায় যেখানে-সেখানে গড়ে উঠেছে কাঠভিত্তিক চুন কারখানা। এর থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ছাই ক্ষতি করছে পরিবেশের। সনাতন পদ্ধতির কারখানার এসব চুল্লি থেকে যেন বিষ ছড়ানো হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, উপজেলায় দুই শতাধিক কারখানা গড়ে উঠেছে। এর একেকটি চুল্লিতে প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার ৪০০ টন কাঠ পোড়ানো হয়। তবে তাদের নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ধরনের ছাড়পত্র। শুধু শহর কিংবা মূল সড়কের পাশে নয়, গ্রামীণ বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি গড়ে তোলা হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। এতে হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য।

সরজমিনে দেখা গেছে, ছাতক পৌর এলাকাসহ উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকায় এবং ছাতক-সিলেট ও ছাতক-দোয়ারাবাজার সড়কের পাশে অবৈধ চুনের কারখানার অবস্থান। স্থানীয় ভাষায় এ কারখানা পাজু নামে পরিচিত। কিন্তু এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী চুন শিল্প এখন স্থানীয় জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতায় দিন দিন এসব অবৈধ পাজুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে যত কারখানা রয়েছে, এর অর্ধেকই গত এক বছরে গড়ে উঠেছে।

একটি কারখানার শ্রমিক লোকমান মিয়া জানান, একেকটি কারখানায় মাসে দুইবার চুন পোড়ানো হয়। একটি পাজু তৈরিতে ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিকের ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। এরপর ভেতরে ৭৫ টন চুনাপাথর সাজিয়ে মাটির প্রলেপ দেয়া হয়। এ পাথর পোড়াতে প্রয়োজন হয় প্রায় ১ হাজার ৫০০ মণ কাঠ। এসব কাঠ আগে আশপাশের এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হতো, এখন সিলেটের বিভিন্ন এলাকা থেকে নিয়ে আসা হয়।

ছাতক পৌর শহরের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘গোবিন্দগঞ্জ থেকে ছাতক যাওয়ার পথে আগে কোনো চুন কারখানা ছিল না। কিন্তু গত এক বছরের মধ্যে হাসনাবাদ থেকে ছাতক শহরের নতুন সেতুর আগে অন্তত এক ডজন পাজু গড়ে তোলা হয়েছে। এটা আমাদের জন্য অশনি সংকেত।’ তিনি আরো বলেন, ‘চুন পোড়ানো শুরু হলে পুরো এলাকা ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। এসব কারখানা যে পরিবেশের দূষণ করছে, তা জানতে গবেষণা লাগবে না। একবার সরজমিনে দেখে গেলেই চলবে।’

হাসনাবাদ এলাকার বাসিন্দা জিয়াউর রহমান বলেন, ‘চুনাপাথর আমদানির সঙ্গে এ এলাকার একটি প্রভাবশালী চক্র জড়িত। তারাই এ পাজু বা কারখানার বিস্তার ঘটানোর নেপথ্যে রয়েছে। আবার কেউ কেউ সরাসরি জড়িত রয়েছেন। ফলে ভয়ে কেউ কোনো কথা বলেন না।’

মাহবুব আলম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে একটু তল্লাশি দিলেই যেখা যাবে কতটি কাঠ বোঝাই ট্রাক ছাতক শহরে প্রবেশ করছে। এসব কাঠ সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে আসছে। বন বিভাগ একটু আন্তরিক হলেই এদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর একেবারেই উদাসীন।’

সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন মো. জসিম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চুন উৎপাদনে যে অননুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে, তাতে বাতাসে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসৃত হচ্ছে। এছাড়া কারখানার পানি ও অন্যান্য বর্জ্যের সঙ্গে অতিমাত্রায় ক্ষারীয় উপাদান নিঃসৃত হচ্ছে, যা ক্ষয় রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটাচ্ছে। কার্বনের বিষে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্টসহ দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসজনিত রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে কারখানা থেকে নির্গত গ্যাস ও ছাই মানবদেহে শ্বাসকষ্ট, চোখের সমস্যা এবং ত্বকের জটিল ব্যাধি সৃষ্টি করতে পারে।’

ছাতক বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা কেবিএম ফেরদৌস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এসব কারখানায় কাঠ পোড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ পাচ্ছি। তবে আমাদের পর্যাপ্ত জনবল নেই। আমরা সহায়তা চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। এ নিয়ে মিটিংও হয়েছে। কাঠ পোড়ানো থেকে বিরত থাকতে মালিকদের নিষেধ করা হয়েছে।’

চুন কারখানা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সালেক মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ ব্যবসা আমাদের ঐতিহ্যবাহী। আমরা স্বীকার করছি এতে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু এর সঙ্গে বহু মানুষের রুটি-রুজিও জড়িত। তবে আমরা বৈধভাবেই ব্যবসা করতে চাই। এর জন্য পরিবেশের ছাড়পত্র পেতে আবেদন করেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা মনে করি, কারখানাগুলোকে পরিবেশের ছাড়পত্র দিলে সরকার রাজস্ব পাবে, পাশাপাশি শিল্পটাও বাঁচবে।’

ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহি উদ্দিন জানান, সম্প্রতি কারখানা মালিক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদদের নিয়ে এ-সংক্রান্ত একটি সভা হয়েছে। সেখানে কঠোরভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু করা যাবে না। তাদের সতর্ক করা হয়েছে, প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ছাতকে গড়ে ওঠা চুন কারখানা নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ পাচ্ছি। আমরা কোনো ছাড়পত্র দিইনি। এসব কারখানায় কাঠ যাতে সরবরাহ বন্ধ করা যায় সে বিষয়ে বন বিভাগকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এছাড়া কারখানাগুলোকেও চিঠি দেয়া হয়েছে। এরপরও বন্ধ না করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

আরও