দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদের পানির চাপ কমাতে খুলে দেয়া হয়েছে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই বাঁধ। মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) রাত ১২টা ১০ মিনিটের দিকে বাঁধের সবকটি স্পিলওয়ে খুলে দেয়া হয় বলে নিশ্চিত করেছে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মাহমুদ হাসান বণিক বার্তাকে জানান, কাপ্তাই হ্রদে পানির চাপ বাড়ায় বাঁধের ১৬টি স্পিলওয়ে ৬ ইঞ্চি করে খুলে দেয়া হয়েছে। এতে করে প্রতি সেকেন্ডে স্পিলওয়ে দিয়ে ৯ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে কর্ণফুলী নদীতে।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কন্ট্রোল রুমের (নিয়ন্ত্রণ কক্ষ) তথ্য মতে, বর্তমানে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৫টি ইউনিট দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে প্রায় ৩২ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে কর্ণফুলী নদীতে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও স্পিলওয়ে দিয়ে মোট ৪১ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে কর্ণফুলীতে। কর্ণফুলী অববাহিকায় হ্রদের পানির শেষ গন্তব্য বঙ্গোপসাগর।
এদিকে, গত কয়েকদিন ধরে কাপ্তাই বাঁধের পানি ছাড়ার আগাম খবরকে কেন্দ্র করে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে এ নিয়ে প্রতিনিয়ত লেখালেখি করছে। কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়ে খুলে দেয়ার ঘটনা অন্যান্য বছরের মতো স্বাভাবিক ঘটনা হলেও সম্প্রতি এটি নিয়ে বাড়তি উত্তেজনা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। এটি নিয়ে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন ও কাপ্তাই বাঁধ কর্তৃপক্ষও আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়েছে।
গতকাল সোমবার বিকালে এক বিশেষ ঘোষণায় কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জানানো হয়েছে, যেকোনো সময় স্পিলওয়ের গেট খুলে পানি ছেড়ে দেয়া হতে পারে। কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ করা হলো।
অন্যদিকে, রাতে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) এক বার্তায় জানান, জরুরি পরিস্থিতিতে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্পিলওয়ের গেট আজ (সোমবার) রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে খুলে পানি ছেড়ে দেয়া হবে। কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্কতা অবলম্বন করার অনুরোধ করা যাচ্ছে।
এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাঙ্গামাটির বাসিন্দা ও সংগঠক সৈকত রঞ্জন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, 'প্রায় প্রতি বছরই কাপ্তাই হ্রদের পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি গেলে বা ছুঁইছুঁই অবস্থায় থাকলে কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়েগুলো খুলে পানি নিষ্কাশন করা হয় কর্ণফুলী নদীতে। কর্ণফুলী নদী অববাহিকায় হ্রদের পানি যায় সাগরে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়ে খোলাকে কেন্দ্র করে এক ধরনের আতঙ্ক বা প্যানিক সৃষ্টি করা হচ্ছে। যদিও এটা স্বাভাবিক একটা বিষয়ই। আর স্পিলওয়ে খুললে পানির চাপের ওপর নির্ভর করে পরবর্তীতে ধাপে ধাপে নিষ্কাশনের পরিমাণ বাড়ানো হয়ে থাকে। ৬ ইঞ্চি জলকপাট খুলে দেয়ায় ৯ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশন হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে নিষ্কাশন হচ্ছে প্রায় আরো ৩২ হাজার কিউসেক। স্পিলওয়ের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি পানি নিষ্কাশন হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্য দিয়ে।‘
তিনি আরো বলেন, 'প্রতি বছরই কাপ্তাই হ্রদের পানি বাড়ে, এর ফল হিসেবে আমরা দেখি রাঙ্গামাটির পর্যটন ঝুলন্ত সেতুও ডুবে যায়। আবার পানি কমলে ভেসে উঠে। কাপ্তাই বাঁধের পানি বাড়ার কারণে যারা হ্রদ দখল করে নিচু এলাকায় অবৈধ বসতি গড়ে তুলেছে, তাদের চলাফেরা নানান সমস্যা দেখা যায়। যেটাকে কেউ কেউ বন্যা বা প্লাবন হিসেবে জোর দিয়ে বলতে চাইছে। বাস্তবতা হলে পানি মানুষের কাছে আসেনি, মানুষ পানির কাছে গিয়েছে। এগুলায় উদ্বেগ ছড়ানোর নেপথ্যের কারণ হতে পারে।'
প্রসঙ্গত, ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকার তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার কাপ্তাই উপজেলা অংশে প্রমত্তা কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দেয়ায় সৃষ্টি হয় ৭২৫ বর্গকিলোমিটারের কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ। নদীতে বাঁধ দিয়ে দেশের প্রথম ও একমাত্র জলবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা হলেও পানিতে তলিয়ে যায় বিশাল আবাস ও বনভূমি। বাস্তুহারা হন পাহাড়ের বহু মানুষ।
শুরুর দিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা ৮০ মেগাওয়াট থাকলেও ক্রমান্বয়ে ধাপে ধাপে সেটি ২৩০ মেগাওয়াটে উন্নীত করে বাংলাদেশ সরকার। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ৫টি ইউনিট দিয়ে পুরোদমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে প্রতি মেগাওয়াট খরচ পড়ে প্রায় ৪০ পয়সা। যা দেশের তাপ, কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সাশ্রয়ী। যে কারণে কাপ্তাই হ্রদে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি ধারণ করে বছরজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে নজর বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি)।