পূর্বাচল ৩০০ ফিট

উদ্বোধনের দুই বছরেই দূষণে সৌন্দর্য হারিয়েছে ১০ হাজার ৩২৯ কোটি টাকার লেক

পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ের (৩০০ ফিট সড়ক) দুই পাশের দৃষ্টিনন্দন লেকসহ ১৫টি বড় প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয় ২০২৩ সালের নভেম্বরে। দুই বছর না যেতেই বন্ধ হয়ে গেছে বিপুল ব্যয়ে নির্মিত লেকের প্রবাহ।

পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ের (৩০০ ফিট সড়ক) দুই পাশের দৃষ্টিনন্দন লেকসহ ১৫টি বড় প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয় ২০২৩ সালের নভেম্বরে। দুই বছর না যেতেই বন্ধ হয়ে গেছে বিপুল ব্যয়ে নির্মিত লেকের প্রবাহ। অস্বচ্ছ ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে ভাসমান আবর্জনা, পলিথিন ও প্লাস্টিকের স্তূপ। অযত্ন আর অবহেলায় সৌন্দর্য হারাতে বসেছে রাজধানীবাসীর স্বস্তির জলাধারটি।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) সূত্রে জানা গেছে, একটি প্রকল্পের মাধ্যমে কুড়িল থেকে বালু নদী পর্যন্ত পূর্বাচল লিংক রোডের উভয় পাশে ১০০ ফুট চওড়া লেক বা খাল খনন ও উন্নয়নের কাজ করা হয়। এতে ব্যয় হয় ১০ হাজার ৩২৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। খালের ওপর ১৩টি ব্রিজ, ৩৬ দশমিক ৮ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে, ১২ দশমিক ৫ কিলোমিটার সীমানা প্রাচীর, দুটি স্লুইসগেট ও ১১টি সাবস্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও বিনোদনের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি আশপাশের এলাকাগুলোর বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ছিল এ প্রকল্পের লক্ষ্য। তবে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালগুলো এখন নোংরা পানির আধারে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, কুড়িল থেকে আইসিসিবি (ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা) পর্যন্ত সড়কের পাশের লেকের পানিতে ভাসছে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতলসহ বিভিন্ন নোংরা-আবর্জনা। বিশেষ করে রূপগঞ্জে যাওয়ার পথে ডানপাশের লেকটির কুড়িল থেকে আইসিসিবি অংশের পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। ময়লা-আবর্জনার পাশাপাশি পানির ওপর জমেছে নোংরা বর্জ্যের আস্তরণ, যেখান থেকে আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এছাড়া লেকপাড়ে একাধিক জায়গায় আগুন দিয়ে পলিথিন ও বর্জ্য পোড়ানোর দৃশ্য দেখা গেছে।

স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে নিয়ে লেকপাড়ে ঘুরতে এসেছিলেন মোহামেদ সাদি নামে এক ব্যক্তি। কথার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘৩০০ ফুট এক্সপ্রেসওয়ে ও দুইপাড়ের লেকের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে আসেন। কোলাহল কিছুটা কম থাকায় এবং সড়কটির সৌন্দর্যের কারণে সময় পেলে আমিও এখানে ঘুরতে আসি। তবে দিন দিন এখানকার পরিবেশও অবসর সময় কাটানোর অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সড়কে ধুলাবালি বেড়েছে। দুই পাশের সুন্দর লেকও নোংরা হয়ে গেছে। এভাবে চললে কয়েক মাসের মধ্যে লেক দুটি সৌন্দর্য হারিয়ে হাতিরঝিলের মতো অবস্থা হবে।’

উদ্বোধনের পর পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়েটি রাজধানীর একটি অন্যতম পর্যটন স্পটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসেন। তাদেরই একজন সামিরা নুসরাত, যিনি স্বজনদের সঙ্গে ঘুরতে এসেছিলেন। জানাতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখানকার রাতের পরিবেশ সত্যিই মনোমুগ্ধকর। তবে মানুষের অসচেতনতার কারণে লেকগুলো দূষিত হয়ে পড়েছে। প্লাস্টিক-পলিথিন ভেসে বেড়াচ্ছে। তাই মানুষের নির্মল বিনোদন ও অবসর সময় কাটানোর এ জায়গাটিতে সরকারকে মনোযোগ দেয়া জরুরি। অন্যথায় হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে বানানো এসব প্রকল্প নগরবাসীর কোনো উপকারে তো আসবেই না উল্টো ডেঙ্গুর কারখানায় পরিণত হবে।’

পরিকল্পনাবিদরা অবশ্য বলছেন, পূর্বাচল এলাকার প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংস করে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কৃত্রিম খাল নির্মাণ করা হয়েছে। সেগুলো আবার অব্যবস্থাপনায় নষ্ট হওয়া জনগণের অর্থ অপচয়ের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

পূর্বাচল এবং আশপাশের প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলো নষ্ট করে কার স্বার্থে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কৃত্রিম লেক নির্মাণ করা হলো—সে প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘একদিকে ‌আমাদের প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আমরা হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে কৃত্রিম জলধারা তৈরি করছি। এখানে ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প কার স্বার্থে নেয়া হয়েছে সেটি খুঁজতে হবে।’

পূর্বাচলের লেক দুটির প্রবাহ বন্ধ হয়ে পড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রবহমান না হলে আলাদা করে পরিচর্যা করতে হয়। এসব না মানলে লেক মরে যাবে। এক্সপ্রেসওয়ে যখন তৈরি হয় এবং চলমান কাজের কারণে যে দূষণ হচ্ছে সেগুলোও লেকে গিয়ে পড়ছে। আর পানির প্রবাহ না থাকা অবস্থায় দূষণ তৈরি হলে সেটি আর দূর হবে না। এটিকে সার্বক্ষণিক রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। কোনো কাজের আগেই পরিকল্পনা থাকতে হবে, কী করলে কেমন হবে, আর না করলে কী সমস্যা হবে। অন্যথায় ঢাকার মতো নগরীতে অবশ্যম্ভাবী পরিণতি ভোগ করতেই হবে। লেক দুটি বাঁচাতে পানির প্রবাহ তৈরির ব্যবস্থা করা যায় কিনা সেটি নিয়ে কাজ করতে হবে। এছাড়া এটি কীভাবে দূষণ হচ্ছে, দূষণের উৎস কী সেসব চিহ্নিত করে বন্ধ করা গেলে লেকগুলো বাঁচানো সম্ভব হবে।’

লেকগুলো এখনো প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার কাছেই রয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম। তবে চলতি মাসের মধ্যেই সেটি রাজউককে বুঝিয়ে দেয়া হবে জানিয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তখন তারা পরিষ্কার করেই আমাদেরকে বুঝিয়ে দেবে।’

প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘লেকের সংযোগ খাল নেই কিন্তু স্লুইস গেট আছে। বালু নদের পানি আরো খারাপ। তাই সেখানকার পানি যেন লেকে না ঢোকে তার জন্য স্লুইস গেট রাখা হয়েছে। নদের পানি ভালো হলে তখন লেকে পানি ঢুকতে দেব। আমাদের কাছে লেকগুলো বুঝিয়ে দিলে আমরা ট্রিটমেন্ট করে পানি নদীতে ছাড়ব।’

আরও