আগাম তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের দুর্বলতা এখনো কাটেনি

গত ২৫ আগস্ট ময়মনসিংহে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগে একটি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জসহ ২৭ কর্মকর্তা ও সদস্যকে বদলি করা হয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ডিভিশন নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ রয়েছে। এ বিভাগ মূলত রাজধানীর বিভিন্ন অপরাধ কার্যক্রমের আগাম তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সদর দপ্তরের গোপনীয় শাখায় পাঠায়। পাশাপাশি পুলিশের বিশেষ শাখাও (এসবি) একই কাজ করে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট থানা ও ইউনিটকে আগাম সতর্কতা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু প্রচলিত এ গোয়েন্দা প্রক্রিয়া এড়িয়ে রাজধানীর অভিজাত ও কূটনৈতিক এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীরা মিছিল করেছেন। শুধু এ ঘটনাই নয়, গত ছয় মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন অন্তত ৩০টি ঝটিকা মিছিল হয়েছে। একই সময়ে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইএসের আদলে কালিমা লেখা সাদা-কালো পতাকাও দেখা গেছে। এসব ঘটনা পুলিশের আগাম তথ্য সংগ্রহ ও তা কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গুলশানের মিছিল ছাড়াও গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করেছেন। এর মধ্যে জুনে তাদের তৎপরতা ছিল সবচেয়ে বেশি। ওই মাসে সিলেট, রাজবাড়ী, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, ঝিনাইদহ, নেত্রকোনা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় মিছিলের ঘটনা ঘটে।

জুনের মাঝামাঝি সিলেট নগরীর নবাব রোড এলাকায় পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করেন। পরে অভিযান চালিয়ে চারজনকে আটক করা হয়। এর আগে ১২ জুন গাজীপুরের শ্রীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একই মাসে যশোরে এক সপ্তাহের মধ্যে অন্তত তিনটি ঝটিকা মিছিল হয়। রাজধানীর মোহাম্মদপুরেও ১৭ মে আসাদগেট ও ২১ জুন কলেজগেট এলাকায় পৃথক মিছিলের ঘটনা ঘটে।

একের পর এক এমন ঘটনা ঘটলেও পুলিশ বলছে, আগাম তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়মিতভাবেই চালু রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিয়মিতভাবে বিভিন্ন উৎস থেকে আগাম তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও যাচাই করে। নিষিদ্ধ বা কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা, ঝটিকা মিছিল ও উগ্রপন্থীদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়। কোনো এলাকায় এ ধরনের তৎপরতার তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী নজরদারি বাড়ানো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য যাচাই এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যও পর্যবেক্ষণ করা হয়। আগাম তথ্যের ভিত্তিতে যাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া যায়, সেজন্য গোয়েন্দা ইউনিট ও মাঠপর্যায়ের পুলিশের মধ্যে সমন্বয় আরো জোরদার করা হচ্ছে।’

গত ২৫ আগস্ট ময়মনসিংহে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগে একটি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জসহ ২৭ কর্মকর্তা ও সদস্যকে বদলি করা হয়। শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচিই নয়, একই সময়ে জননিরাপত্তার জন্য স্পর্শকাতর আরেকটি ঘটনায়ও পুলিশের আগাম তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জুনের শেষ সপ্তাহে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ কালিমা লেখা সাদা-কালো পতাকা টাঙানো শুরু হয়। এসব পতাকা হাতে মিছিল ও মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার ঘটনাও ঘটে। নারায়ণগঞ্জ থেকে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা এবং ঢাকা, ফেনী, কক্সবাজার, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব পতাকা দেখা যায়। ২৭ জুন কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত এলাকায় সড়ক ও জেটি ঘাটে সারি সারি কালিমা লেখা সাদা পতাকা দেখা যায়।

আইন-শৃঙ্খলাসংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়ার চেয়ে আগে থেকে সম্ভাব্য তৎপরতার তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়াই পুলিশের মূল দায়িত্ব। কিন্তু কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন একের পর এক ঝটিকা মিছিলের ঘটনা দেখাচ্ছে। মাঠপর্যায়ের আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, তথ্য বিশ্লেষণ ও সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের জায়গায় এখনো দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষ করে একই এলাকায় বারবার মিছিল হওয়ার পরও পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে আগাম তথ্য না পাওয়া কিংবা মিছিল শুরু হওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছার ঘটনা পুলিশের গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। কোথাও আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মসূচির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হয়েছে।

আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করেন সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও যথাসময়ে তা সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেয়ার বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমানে এক্ষেত্রে কিছুটা ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অতীতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে দক্ষ অনেক কর্মকর্তা আর সে দায়িত্বে নেই। ফলে বর্তমানে যারা দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের একটি অংশ হয়তো আগের মতো কার্যকরভাবে আগাম তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ করতে পারছেন না। এ অবস্থায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে দক্ষ কর্মকর্তাদের যথাযথ দায়িত্বে পদায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্বলতা আরো প্রকট হতে পারে। বিশেষ করে উগ্রপন্থীদের তৎপরতার বিষয়ে আমাদের জাতীয়ভাবে সতর্ক অবস্থান রয়েছে। তাদের উত্থান কখনই দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়।’

অপরাধ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা শুধু অভিযান পরিচালনার ওপর নির্ভর করে না। সম্ভাব্য কর্মসূচির আগাম তথ্য সংগ্রহ, স্থানীয় পর্যায়ে সোর্স নেটওয়ার্ক সক্রিয় রাখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ এবং পাওয়া তথ্য দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলে ছোট পরিসরের ঝটিকা কর্মসূচি দ্রুত বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিটের কাছে সরবরাহের সক্ষমতা কার্যকর আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার অন্যতম ভিত্তি। এক্ষেত্রে সামান্য ঘাটতিও বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ ও তথ্যনির্ভর করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে আগাম তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পাওয়া তথ্য যথাসময়ে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায়।’

কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতাসহ অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে আগাম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না—বিষয়টি এমন নয় বলে দাবি করেছেন পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগাম গোয়েন্দা তথ্য না থাকলে এ ধরনের ঘটনা আরো অনেক বেশি ঘটত। আমাদের কৌশল হলো কোনো ঘটনা ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা। এর পরও অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা ঘটলে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। জনবহুল দেশে শুক্রবারের মতো দিনে মুসল্লিরা নামাজ শেষে একসঙ্গে বের হয়ে কোনো ধরনের মুভমেন্ট করলে তাৎক্ষণিকভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। আবার নামাজের আগে তল্লাশি বা অতিরিক্ত কড়াকড়ি করলেও জনগণের মধ্যে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হতে পারে, সেটিও আমাদের কাম্য নয়।’ সব মিলিয়ে নিষিদ্ধ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতাসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

ফ্যাসিস্টদের অনুসারীরা এখনো মাঝে মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তাদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে জনগণের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদেরও এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। সবকিছুর জন্য শুধু পুলিশকে দায়ী করলে হবে না। জনগণ সচেতন ও সম্পৃক্ত না হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এককভাবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পুলিশকে একসময় ফ্যাসিস্ট সরকার নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। আমরা চাই না, এখনো পুলিশকে সেভাবে ব্যবহার করা হোক। আমরা একটি গণতান্ত্রিক সরকার। জনগণকে সম্পৃক্ত করেই আমরা সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাই।’

আরও