বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১১ কোটির বেশি হলেও গতি ও মানের দিক থেকে বৈশ্বিক তালিকায় অবস্থান নিম্নস্তরে। মোবাইল ইন্টারনেট গতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৩ দেশের মধ্যে ৮৬তম। অন্যদিকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে ১৫৪ দেশের মধ্যে ৯৯তম, যা প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। রাজধানী ও বড় শহরে তুলনামূলক ভালো গতি থাকলেও উপজেলা, ইউনিয়ন ও পার্বত্য অঞ্চলে নেটওয়ার্ক ধীরগতির হওয়ায় শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। টেলিযোগাযোগ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কম থাকার পেছনে রয়েছে পর্যাপ্ত স্পেকট্রামের ঘাটতি, নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, অতিরিক্ত গ্রাহকচাপ ও বিনিয়োগের অভাব।
মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওকলার ‘স্পিডটেস্ট গ্লোবাল ইনডেক্স’-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-নভেম্বর সময়ে মোবাইল ইন্টারনেট গতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৬তম, যেখানে ডাউনলোডের গতি মাত্র ৪১ দশমিক ৭২ এমবিপিএস। ২০২৪ সালের একই সময়ে অবস্থান ছিল ৮৮তম। ওই বছর সেপ্টেম্বর-নভেম্বরে ডাউনলোড গতি ছিল ২৮ দশমিক ২৬ এমবিপিএস। এক বছরের ব্যবধানে দেশে ডাউনলোডের গতি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৪৬ এমবিপিএস। বিপরীতে আপলোড গতি বেড়েছে মাত্র ৩ এমবিপিএস। ২০২৪ সালে আপলোড গতি ছিল ১০ দশমিক ৯৮ এমবিপিএস, চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৩৯ এমবিপিএসে।
এছাড়া ল্যাটেন্সি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-নভেম্বরের ২৩ মিলিসেকেন্ড থেকে বেড়ে চলতি বছরের একই সময়ে হয়েছে ২৫ মিলিসেকেন্ড। ল্যাটেন্সি বলতে ইন্টারনেটে কোনো ব্যবহারকারীর পাঠানো ডাটা গন্তব্য সার্ভারে পৌঁছতে ও সাড়া ফিরে আসতে যে সময় লাগে, সেই বিলম্বকেই বোঝায়। ল্যাটেন্সি বাড়ার অর্থ হলো ডাটা আদান-প্রদানে আগের তুলনায় বেশি সময় লাগছে।
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতিতে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-নভেম্বরে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৯তম। গত বছরও এ সময়ে একই অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। গত বছর ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে ডাউনলোড গতি ছিল ৪৮ দশমিক ৯১ এমবিপিএস, চলতি বছরে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩ দশমিক ৪৮ এমবিপিএসে। এছাড়া আপলোড গতি ছিল ৪৭ দশমিক ৮৪ এমবিপিএস, চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক শূন্য ৬ এমবিপিএসে। ল্যাটেন্সি দুই বছরেই ৫ মিলিসেকেন্ডে অপরিবর্তিত রয়েছে।
ওকলার স্পিডটেস্ট ইনডেক্স অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর-নভেম্বর প্রান্তিকে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মোবাইল ইন্টারনেট গতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের। দেশটিতে ডাউনলোড গতি ৬৭২ দশমিক ৬৮ এমবিপিএস, আর আপলোড গতি ৪১ দশমিক ৫০ এমবিপিএস। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গতিতে এক নম্বরে রয়েছে সিঙ্গাপুর, দেশটিতে ডাউনলোড গতি ৪০৭ এমবিপিএস এবং আপলোড গতি ৩২২ দশমিক ৪১ এমবিপিএস।
ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশ মোবাইল ইন্টারনেট গতিতে বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে রয়েছে। সেপ্টেম্বর-নভেম্বরে ভারতের অবস্থান ৩৪তম, যদিও এক বছর আগে দেশটি ছিল তালিকার ২৫ নম্বরে। বর্তমানে ভারতে মোবাইল ইন্টারনেটে ডাউনলোড গতি ১৩০ দশমিক ৮৯ এমবিপিএস, আর আপলোড গতি ১১ দশমিক ১৮ এমবিপিএস। তবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতিতে বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে ভারত; বাংলাদেশ যেখানে ৯৯ নম্বরে, সেখানে ভারতের অবস্থান ১০১।
এছাড়া মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও তাইওয়ানের মতো দেশগুলো মোবাইল ইন্টারনেট গতিতে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে। ভিয়েতনামের বর্তমান র্যাংকিং ১৭; দেশটিতে মোবাইল ইন্টারনেটে ডাউনলোড গতি ১৬০ দশমিক ৫০ এমবিপিএস, আর আপলোড গতি ৩২ দশমিক ৫৫ এমবিপিএস। থাইল্যান্ডের ডাউনলোড গতি ১৩৬ দশমিক ৯১ এবং আপলোড গতি ২৫ দশমিক ১৩ এমবিপিএস। মালয়েশিয়ার ডাউনলোড গতি ১৪১ দশমিক ১৮ এবং আপলোড গতি ২২ দশমিক ৫৩ এমবিপিএস। তবে বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে রয়েছে শ্রীলংকা ও পাকিস্তান; দুই দেশের ডাউনলোড গতি যথাক্রমে ৩৮ দশমিক ৫৫ ও ২৪ দশমিক ৭৯ এমবিপিএস।
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গতিতে ভিয়েতনামের অবস্থান ১১তম। দেশটিতে ব্রডব্যান্ডে ডাউনলোড গতি ২৭৩ দশমিক ৬৪ এমবিপিএস, আর আপলোড গতি ২৪৫ দশমিক ৬৬ এমবিপিএস। থাইল্যান্ডে ডাউনলোড গতি ২৭৫ দশমিক ২৬ এবং আপলোড গতি ২৩১ দশমিক ৯৮ এমবিপিএস। এছাড়া মালয়েশিয়ায় ব্রডব্যান্ডে ডাউনলোড গতি ১৬২ দশমিক ৩৯ এবং আপলোড গতি ৬৫ দশমিক ৪১ এমবিপিএস।
টেলিযোগাযোগ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কম থাকার পেছনে পর্যাপ্ত স্পেকট্রামের ঘাটতি, নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, অতিরিক্ত গ্রাহকচাপ এবং বিনিয়োগের ঘাটতি রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না; অপারেটরগুলোও অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তী সরকারের নীতির অপেক্ষায় আছে। প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, দেশের অধিকাংশ এলাকায় ফোরজি ও ফাইভজি ইন্টারনেট সেবা এখনো পুরোপুরি পৌঁছায়নি। যেহেতু থ্রিজি সেবা চালু আছে, অনেক ব্যবহারকারী এখনো সেই নেটওয়ার্কেই ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। কিন্তু জুম মিটিং, ভিডিও কল, সফটওয়্যারভিত্তিক কাজ এবং বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য উচ্চগতির ইন্টারনেট অপরিহার্য—এখানে সরকারকেই উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মোবাইল ইন্টারনেট গতি বাংলাদেশের চেয়ে ভালো হলেও সেখানে ইন্টারনেট–ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। রাজধানী ঢাকায় ইন্টারনেটের গতি তুলনামূলকভাবে ভালো থাকলেও উপজেলা শহর, ইউনিয়ন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ইন্টারনেটের গতি এখনো খুবই নিম্নস্তরের। দেশের প্রায় সব অঞ্চলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে অপারেটর কোম্পানিগুলো ইন্টারনেট টাওয়ার স্থাপন করলেও ফোরজি ও ফাইভজি ইন্টারনেট সরবরাহে তারা এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। গতি কম থাকলেও ইন্টারনেট দাম বাড়িয়ে চলছে অপারেটররা। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সূত্র মতে, গত দেড় বছরে দেশের গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও টেলিটক এই চার মোবাইল অপারেটর বিভিন্ন মেয়াদে ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছে।
ব্রডব্যান্ড নিয়ে অনেকদিন ধরে কাজ করছেন বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের (বিআইজিএফ) চেয়ারপারসন ও আম্বার আইটি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষ মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড উভয় ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিধায় দুটো নীতিমালার প্রয়োজন আছে। ব্রডব্যান্ডের ক্ষেত্রে সরকার এখনো অপারেটরগুলোকে ৫ বা ১০ এমবিপিএসের প্যাকেজ রাখতে বলে কিন্তু সেটাকে ২০ এমবিপিএসে নিয়ে যেতে হবে। ব্রডব্যান্ড নীতিতেও সেটা বলা হয়েছে। সরকার যখন ক্যাপাসিটি নির্ধারণ করবে তখন অপারেটররা সেটি অনুসরণ করবে। মোবাইল ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে অপারেটরদের সারা দেশে সর্বনিম্ন ফোরজি চালু করা এবং বিভাগীয় ও জেলা শহরে ফাইভজি সেবা নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশনা দিতে পারে সরকার।’
এ বিষয়ে জানতে অপারেটর কোম্পানি বাংলালিংক ও গ্রামীণফোনের সঙ্গে চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে রবি আজিয়াটা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
তবে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করছে বলে মনে করেন মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) মহাসচিব লে কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন,"‘বাংলাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটররা উচ্চমূল্যে স্পেকট্রাম, নিয়ন্ত্রিত টাওয়ার ব্যবস্থা এবং অত্যন্ত উচ্চ করনীতির কারণে নিম্নমুখী আয় বা মুনাফা সত্ত্বেও গড়ে প্রায় ৪২ এমবিপিএস গতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সেবা প্রদান করে আসছে—এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসিত হওয়ার যোগ্য। আমরা ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করে যাচ্ছি, ওকলার বৈশ্বিক সূচকে অগ্রসর হয়েছি। এ অগ্রগতি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশাবাদী। তবে সরকার যদি এ খাতের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত কর প্রত্যাহার করে তা যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসে, তাহলে অপারেটররা বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে সেবার মান উন্নত করতে উৎসাহিত হবে।’
দেশে ইন্টারনেটের গতি বৃদ্ধি করতে সরকারি পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আজম পারভেজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা নতুন নেটওয়ার্ক পলিসি ও ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ কমিয়ে আনতে মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করছি। দেশে এখন থ্রিজি, ফোরজি, ফাইভজি ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক চালু আছে। অপারেটররা যে প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে এটি ইতিবাচক। তবে অভিযোগ আসলে আমরা সেটি তদারকি করি। এছাড়া আমরা মোবাইল অপারেটরদের জন্য উচ্চগতির ইন্টারনেট ও উন্নত সেবা দিতে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম তরঙ্গ নিয়ে আসছি।’