বছর দুই আগে অস্ট্রেলিয়ার একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান বাংলাদেশী তরুণ আকিব হোসেন (প্রকৃত নাম নয়)। ভিসার জন্য তাকে ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেটের মতো প্রয়োজনীয় নথিপত্রের জোগান দেয় গুলশানের একটি শিক্ষা ও ক্যারিয়ার কনসালট্যান্সি ফার্ম। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের এ তরুণের পক্ষে ব্যাংকে ৬০ লাখ টাকার আমানত স্থিতি দেখানো সম্ভব ছিল না। সেজন্য ওই ফার্মটির মধ্যস্থতায় দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের শরিয়াহভিত্তিক একটি ব্যাংকে ৩ লাখ টাকা জমা দেয়া হয়। বিনিময়ে ওই ব্যাংক থেকে দেয়া হয় ৬০ লাখ টাকার সলভেন্সি সার্টিফিকেট। এজন্য জমাকৃত টাকা থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা সার্ভিস ফি কেটে নেয় ব্যাংকটি।
আকিব হোসেনের মতো উচ্চ শিক্ষার জন্য গত বছর যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান রাফসান আহমেদ। স্নাতকোত্তর কোর্সে ভর্তি হতে খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় তাকে ব্যাংক স্টেটমেন্টও কম দেখাতে হয়। তার প্রয়োজন ছিল ১২ লাখ টাকার সলভেন্সি সার্টিফিকেট। তবে সেই সার্টিফিকেট সংগ্রহের জন্য রাফসান আহমেদকে কোনো ব্যাংকেই যেতে হয়নি। উত্তরার একটি স্টুডেন্ট ভিসা প্রসেসিং সেন্টার তাকে ওই স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করে দিয়েছিল। এজন্য তাকে পরিশোধ করতে হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার তরুণ প্রতি বছর উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যান। এ শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে ভুয়া কিংবা প্রতারণামূলক ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট দেখাচ্ছেন। ব্যাংকে ৪০ থেকে ৬০ লাখ টাকা আমানত আছে, এমন স্টেটমেন্ট দেখানোর জন্য দেশের অনেক ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২-৫ লাখ টাকা নিচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, এটি ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা ও কনসালট্যান্সি ফার্মের বড় ব্যবসা হয়ে উঠেছে। ভুয়া স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট দেয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন অনেক ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
প্রতারণামূলক এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দূতাবাস উদ্বেগ জানিয়েছে। নিজেরা বিবৃতি দেয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও এ বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছে অনেক দেশের দূতাবাস। আর এসব দেশে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীসহ ভ্রমণ ইচ্ছুক আবেদনকারীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। চলতি বছরের ৭ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক সাক্ষাৎ করেন। ভিসা আবেদনের সঙ্গে ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দেয়ার বিষয়টি সেই সাক্ষাতে তুলে ধরেন সারাহ কুক।
উদ্বেগজনক এমন প্রেক্ষাপটে গত ১২ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ভিসা আবেদনের জন্য ইস্যু করা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট ও ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটে কিউআর কোড সংযুক্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এর পরও ভুয়া কিংবা প্রতারণামূলক স্টেটমেন্ট দেয়ার কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি।
বরং অভিনব কৌশলে বিদেশগামী শিক্ষার্থী কিংবা তাদের অভিভাবকদের নামে ঋণ সৃষ্টি করে, পরবর্তী সময়ে সে অর্থই আমানত দেখিয়ে ব্যাংকগুলো সলভেন্সি সার্টিফিকেট দিচ্ছে। বেশকিছু ব্যাংক নানা মাধ্যমে এ ধরনের ঋণ দেয়ার বিষয়ে প্রচার-প্রচারণাও চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। উচ্চ শিক্ষাবিষয়ক কনসালট্যান্সি ফার্মসহ ফেসবুকে বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপ বিদেশ গমনেচ্ছুদের সলভেন্সি সার্টিফিকেট জোগাড় করে দেয়ার প্রচারণা চালাচ্ছে।
এ বিষয়ে বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থী, কনসালট্যান্সি ফার্ম, বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে বণিক বার্তা। অনেক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা নিরুপায় হয়ে অর্থের বিনিময়ে ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট গ্রহণ করেছেন। আর কনসালট্যান্সি ফার্ম ও ব্যাংকগুলোর বক্তব্য হলো, গত এক দশকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এ ধরনের স্টেটমেন্ট কিংবা সার্টিফিকেট ইস্যু করা অনেকটা ব্যবসা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। এক্ষেত্রে ভালো ব্যাংকগুলো কিছু নীতি মেনে চললেও করপোরেট সুশাসন উপেক্ষা করে চলা ব্যাংকগুলো এটিকে অনেকটা সার্টিফিকেট ব্যবসায় রূপান্তর করেছে। এ কারণে বেশকিছু দূতাবাস এখন নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকের স্টেটমেন্ট প্রত্যাখ্যান করছে। বণিক বার্তার অনুসন্ধানে এ ধরনের বেশকিছু ব্যাংকের নামও উঠে এসেছে।
চতুর্থ প্রজন্মের একটি ব্যাংকের একজন শাখা ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ একেবারেই স্থবির। এজন্য স্টুডেন্ট ফাইল খোলা বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট দেয়া “কাঁচা টাকা আয়ের” বড় উৎস হয়ে উঠেছে। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদনেই এটি হচ্ছে। এক্ষেত্রে দূতাবাসগুলো থেকে নথিপত্র যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হলে প্রধান কার্যালয় থেকে সত্যায়ন সার্টিফিকেট দেয়া হয়।’
ভুয়া কিংবা প্রতারণামূলক ব্যাংক স্টেটমেন্ট ইস্যুকে নৈতিকতা বিরুদ্ধ ও অপরাধ বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বেশকিছু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে। আমরা এরই মধ্যে ইস্যু করা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট ও ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটে কিউআর কোড সংযুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছি। তার পরও কেউ বিদেশী দূতাবাসগুলোকে বিভ্রান্ত করতে প্রতারণামূলক সার্টিফিকেট ইস্যু করলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
আরিফ হোসেন খান আরো বলেন, ‘ব্যাংক একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কোনো ব্যবসাই যেন অনৈতিক না হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। আইন দিয়ে অনেক সময় সব অপরাধ দমন করা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে নৈতিকতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি ব্যাংক নির্বাহীদের পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করা হবে।’
বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি এ খাতে ব্যয়ও গত কয়েক বছরে দ্বিগুণ থেকে ত্রিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, কেবল ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশগামী উচ্চ শিক্ষার্থীরা ব্যয় করেছেন ৮৯ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরলে এ ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা, যা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃক দেশের ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বরাদ্দের সমান।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কোর পরিসংখ্যান বলছে, কেবল ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫২ হাজার ৭৯৯ শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য ৫৫টি দেশে গিয়েছেন। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ১৫১।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভুয়া বা প্রতারণামূলক ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দেয়া এবং বিদেশে গিয়ে পড়ালেখা না করা শিক্ষার্থীদের হার বেড়ে যাওয়ার প্রভাব ভিসা ইস্যুর ওপর পড়েছে। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের অনেক দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।
বিদেশ গমনেচ্ছু শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও ভিসা প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করার নামে দেশে শতাধিক কনসালট্যান্সি ফার্ম গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে লাইসেন্সপ্রাপ্ত শিক্ষা ও ক্যারিয়ার কনসালট্যান্সি ফার্মগুলোর জাতীয় সংগঠন হলো ফরেন অ্যাডমিশন অ্যান্ড ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এফএসিডি-সিএবি)। সংগঠনটির সভাপতি মো. জুলফিকার আলী জুয়েল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভারত ও শ্রীলংকার শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈধ উপায়ে ঋণ নেয়া কিংবা ব্যাংক সলভেন্সি দেখানোর সরকারি ব্যবস্থা আছে। এমনকি নেপালের শিক্ষার্থীরাও এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সরকারি তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। এ কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা উচ্চ শিক্ষায় বিদেশযাত্রার জন্য অনৈতিক নানা উপায় অবলম্বনে বাধ্য হচ্ছেন।’
শিক্ষার্থীদের জন্য ভুয়া বা প্রতারণামূলক ব্যাংক স্টেটমেন্টের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে এফএসিডি-সিএবির সদস্যভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান যুক্ত কিনা জানতে চাইলে জুলফিকার আলী জুয়েল বলেন, ‘কনসালট্যান্সি ফার্মের পক্ষে তো ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট ইস্যু করে দেয়া সম্ভব নয়। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তারাই যুক্ত। অনেক ব্যাংক ও ব্যাংকার ফেসবুকে এ ধরনের স্টেটমেন্ট জোগাড় করে দেয়ার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। নিজেদের মোবাইল নাম্বার বা ভিজিটিং কার্ড ফেসবুকে দিয়ে ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেয়ার প্রচারণা চালাচ্ছেন। এক্ষেত্রে অনিয়ম ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এগিয়ে আসতে হবে।’
বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় গমনেচ্ছুদের ‘ফান্ড সাপোর্ট’ বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট জোগাড় করে দেয়ার বিজ্ঞাপন দিয়ে ফেসবুকে বিভিন্ন ধরনের প্রচার-প্রচারণা চলছে। এ ধরনেরই একটি পেজের নাম ‘হলিডে হ্যাভেন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস’। পেজটিতে বিজ্ঞাপন দিয়ে বলা হয়েছে, ‘বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য ফান্ড সাপোর্ট নিয়ে চিন্তিত? ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন করবেন, কিন্তু ২০-৪০ লাখ টাকার ফান্ড নেই? তাহলে পরামর্শ পেতে এ নম্বরে যোগাযোগ করুন।’ ওই বিজ্ঞাপনে তহবিল জোগানো বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেয়ার ক্ষেত্রে দেশের ছয়টি ব্যাংকের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
একই ধরনের সহযোগিতার কথা বলে বিজ্ঞাপন দেয়া বেশকিছু পেজ ও আইডি খুঁজে পাওয়া যায় ফেসবুকে। এর মধ্যে রয়েছে টিম এডুকেশন, ব্যাংক সাপোর্ট ফর বাংলাদেশী স্টুডেন্ট, বিডি ব্যাংক স্পন্সর সাপোর্ট, ফাইন্যান্স এইড বিডি, ব্যাংক সাপোর্ট, স্টাডি সাপোর্ট বিডি, ইনস্ট্যান্ট ব্যাংক সাপোর্ট বিডি, ব্যাংক সাপোর্ট অ্যান্ড স্পন্সর বিডি প্রভৃতি।
বিডি ব্যাংক স্পন্সর সাপোর্ট নামে ফেসবুক পেজে উল্লেখ করা মোবাইল নম্বরে গতকাল ফোন করা হয়। এ সময় সুমন নামের এক ব্যক্তি ফোন ধরেন। ৫০ লাখ টাকার ব্যাংক স্টেটমেন্ট দরকার—এমন সহযোগিতা চাইলে ওই ব্যক্তি বলেন, তারা যেকোনো অংকের ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট জোগাড় করে দিতে পারবেন। এক্ষেত্রে তিনি ১২টি ব্যাংকের নাম উল্লেখ করে কোন ব্যাংকের সার্টিফিকেট পেতে কত টাকা লাগবে, সে তথ্যও জানান। একই সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য তিনি একজন ব্যাংক কর্মকর্তার ভিজিটিং কার্ডও এ প্রতিবেদককে পাঠিয়েছেন। একইভাবে অন্য কয়েকটি ফেসবুক পেজে উল্লেখ করা নম্বরে যোগাযোগ করলে তারাও বিভিন্ন অংকের অর্থের বিনিময়ে ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট জোগাড় করে দেয়ার আশ্বাস দেন।
কিছু ব্যাংক প্রতারণামূলক স্টেটমেন্ট ইস্যু করলেও এক্ষেত্রে কেউ কেউ অভিনব কৌশল বের করেছেন। এ বিষয়ে কথা হয় দেশের অন্তত ছয়টি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তারা জানান, প্রক্রিয়াটি এমন—কোনো শিক্ষার্থী ৫ লাখ টাকা ব্যাংকে আমানত হিসাবে জমা রাখেন। ব্যাংক ওই টাকা জামানত দেখিয়ে, তার বিপরীতে আরো ৫ লাখ টাকা ঋণ দেয়। এতে আমানতের অর্থের পরিমাণ বেড়ে ১০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। আর এ টাকা আবারো জামানত দেখিয়ে নতুন করে ১০ লাখ টাকার ঋণ দেয়। এতে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২০ লাখে। এভাবে একই অর্থ কয়েক দফায় জামানত দেখিয়ে টাকার স্থিতি ৫০-৬০ লাখে উন্নীত করা হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ওই ব্যাংক হিসাবের নিয়ন্ত্রণ পান না। বরং পুরো হিসাবটি পরিচালনা করেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এভাবে অনেকটা বৈধ উপায়ে ব্যাংকের সিভিএস থেকে শিক্ষার্থীর নামে সলভেন্সি ও স্টেটমেন্ট ইস্যু করা হয়। পরে শিক্ষার্থী বিদেশে যাওয়ার পর প্রথমে জমাকৃত ৫ লাখ টাকা থেকে সুদ ও সার্ভিস চার্জ কেটে রেখে পুরো ঋণটি সমন্বয় বা আদায় দেখানো হয়।
এ বিষয়ে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর এ ধরনের অনৈতিক কাজে যুক্ত হওয়াকে অত্যন্ত গুরুতর অনিয়ম হিসেবে দেখি। যদি কোনো ব্যাংক প্রকৃত আমানত না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীর নামে ৫০-৬০ লাখ টাকার ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট ইত্যাদি তৈরি করে দেয় এবং এর বিনিময়ে অর্থ নেয়, তাহলে সেটা শুধু অনৈতিক ব্যবসা নয়, সেটা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার অপব্যবহার। তবে কোনো শিক্ষার্থীর পরিবার বৈধভাবে অর্থ ব্যাংকে জমা দিলে তার ভিত্তিতে স্টেটমেন্ট বা সলভেন্সি সার্টিফিকেট ইস্যু করলে তাতে সমস্য নেই।’
সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে থাকা মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘কেবল কিউআর কোড ব্যবহার করে এ ধরনের সমস্যার সমধান হবে না। এর সঙ্গে কার্যকর ভেরিফিকেশন আর্কিটেকচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেটের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে যাচাইযোগ্য ডিজিটাল স্ট্যান্ডার্ড প্রয়োজন। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে কমন ভেরিফিকেশন গেটওয়ে চালু করা যেতে পারে।’
কয়েক বছর ধরেই ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ জাল নথি ব্যবহার করে ভিসা আবেদনের অভিযোগ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকায় অবস্থানরত ১৩টি পশ্চিমা দেশের মিশন গত বছর যৌথভাবে বাংলাদেশী আবেদনকারীদের ভুয়া নথি ব্যবহার না করার আহ্বান জানায়। ওই সময় বলা হয়, জাল নথি ব্যবহার করলে শুধু ভিসা বাতিল নয়, ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা, আইনি জটিলতা ও সীমান্তে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিও তৈরি হবে।
চলতি বছরের ৭ মে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় সারাহ কুকের পক্ষ থেকে ভিসা আবেদনের সঙ্গে ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দেয়াসহ জাল নথিপত্রের বেশকিছু ঘটনা তুলে ধরা হয়। এসব প্রতারণা প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কামনা করেন ব্রিটিশ দূত। এক্ষেত্রে ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ নথিপত্র যাচাইয়ে কিউআর কোডভিত্তিক পদ্ধতি চালুর বিষয়ে প্রস্তাব আসে। ওইদিনের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ১২ মে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে জারীকৃত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ভিসা আবেদনের জন্য ইস্যু করা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট, ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটসহ সংশ্লিষ্ট নথিতে অনলাইন যাচাইযোগ্য কিউআর কোড থাকতে হবে। ওই কোড স্ক্যান করে ন্যূনতম পাঁচটি তথ্য যাচাই করা যাবে। এগুলো হলো অ্যাকাউন্ট নাম্বার, হিসাবধারীর নাম, স্টেটমেন্ট শুরুর স্থিতি (ওপেনিং ব্যালান্স), স্টেটমেন্টের শেষ স্থিতি (ক্লোজিং ব্যালান্স) ও স্টেটমেন্ট তৈরির তারিখ। এসব তথ্য কমপক্ষে ছয় মাস সংরক্ষণ ও যাচাইযোগ্য রাখার নির্দেশও দেয়া হয়। প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা কার্যকরে ব্যাংকগুলোকে ৯০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালুর নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। যদিও এখনো নির্দেশনা অনুযায়ী কিউআর কোড চালু করা যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের জন্য দুই ধরনের ঋণ চালু করেছি। শিক্ষার্থীরা রীতিনীতি মেনেই এসব ঋণসেবা নিয়ে বিদেশে যেতে পারছেন। সারা বিশ্বেই শিক্ষার্থীদের জন্য ঋণ নেয়ার সুযোগ আছে। সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রে কিছু শিক্ষার্থী বিদেশে যাওয়ার পর লেখাপড়া চালিয়ে যান না। আর ব্যাংকের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখেন না। এ কারণে বিদেশীদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।’
প্রসঙ্গত, জাল নথিপত্রের ব্যবহার ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশী পাসপোর্টের মানেও অবনমন হচ্ছে। গ্রহণযোগ্যতার বিচারে শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৯৭তম। বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে একই অবস্থানে আছে উত্তর কোরিয়া।