অব্যবস্থাপনা ও যন্ত্রপাতির অভাব

যশোরে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সমন্বিত বর্জ্য প্লান্টে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সুফল

বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের স্বপ্ন নিয়ে যশোরে চালু হয়েছিল দেশের প্রথম সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট।

তবে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে যশোর পৌরবাসীর সেই স্বপ্ন এখন বিষাদে পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে ঝুমঝুমপুরে ১৩ দশমিক ২৫ একর জায়গার ওপরে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ প্লান্টটিতে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সুফল। সঠিকভাবে পরিচালনার অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে প্লান্টটি। ফলে শহরের অলি-গলিতে জমছে বাসাবাড়ির বর্জ্যের স্তূপ, যা এখন নাগরিকদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্গন্ধ আর নোংরা পানির কারণে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন প্লান্ট এলাকার বাসিন্দারা। প্রকল্পের সুফল না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ পৌরবাসী।

জানা গেছে, ২০১৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যশোর পৌরসভার এ আধুনিক প্লান্টটি উদ্বোধন করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পুরো শহরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ও সংগৃহীত বর্জ্য থেকে নিয়মিত জৈব সার, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। পরিকল্পনা ছিল শুধু যশোর পৌরসভা নয়, বরং পাশের ঝিকরগাছা পৌরসভা ও নিকটবর্তী এলাকা থেকেও বর্জ্য এনে এখানে প্রক্রিয়াজাত করা। এমনকি সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য দিয়ে তৈরি বায়োগ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে বাসাবাড়িতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সরবরাহেরও একটি পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু চালুর এক বছরের মধ্যেই থমকে যায় এর মূল কার্যক্রম। বহু আশার আলো দেখানো এ প্রকল্পে এখন সময়ের সঙ্গে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বর্তমানে সীমিত পরিসরে কেবল জৈব সার তৈরি হলেও সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন। ফলে পুরো যশোর শহরের অলি-গলিতে ময়লার স্তূপ জমে থাকছে ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর পাশে নতুন নতুন ভাগাড় তৈরি হয়েছে।

প্লান্টের কাঁচা আবর্জনা ঠিকমতো প্রক্রিয়াজাত ও বাছাই না করায় প্লান্টের ভেতরের অংশ নিজেই এক বিশালাকার ভাগাড়ে রূপ নিয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ও চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন স্থানীয়রা।

ঝুমঝুমপুর বর্জ্য প্লান্ট এলাকার বাসিন্দা হুমায়ন কবির বলেন, ‘ময়লার সঠিক ব্যবহার না হওয়াতে প্লান্টের ভেতরে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বৃষ্টি হলে সেই পানি পাশের এলাকাতে ঢুকে যাচ্ছে। বিষাক্ত ও ময়লা পানি এলাকা দূষিত করছে। ছড়াচ্ছে নানা রোগও। এছাড়া দুর্গন্ধ তো রয়েছেই। এলাকায় বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে গড়ে তোলা এ প্রকল্প থেকে যশোর পৌরসভার এ পর্যন্ত মোট আয় হয়েছে ১৫ লাখ টাকা। ধারাবাহিক লোকসান ও পরিচালনা সংকট কাটাতে গত কয়েক বছর প্লান্টটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেয়া হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২২ সালে ‘দ্য স্কেট লিমিটেড’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ২০ বছরের জন্য প্লান্টটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু তাতেও বদলায়নি এ প্লান্টের ব্যবস্থাপনা।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, প্রতিদিন প্রায় ৮০ টন বর্জ্য প্লান্টে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু আধুনিক সেগ্রিগেশন যন্ত্রপাতির অভাব ও বর্জ্য আলাদাকরণ জটিলতার কারণে তারা প্রতিদিন সংগৃহীত বর্জ্যের মাত্র ১৫ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করতে পারছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্টের ইনচার্জ মো. সোহেল রেজা বলেন, ‘আমাদের প্লান্টে প্রতিদিন ৪০ টন ময়লা বাছাই করার সক্ষমতা আছে। কিন্তু আধুনিক সেগ্রিগেশন মেশিন না থাকায় আমরা প্রতিদিন মাত্র ১০-১৫ শতাংশ ময়লা বাছাই করতে পারছি। ফলে কাঁচা ময়লার এক বিশাল স্তূপ জমছে। এখন মাসে গড়ে মাত্র ১২ দিন উৎপাদন করা সম্ভব হয়। তবে প্রয়োজনীয় সেগ্রিগেশন মেশিন পেলে ৩০ দিনই মেশিন চালিয়ে এ প্লান্টকে পুরো দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় রোল মডেল হিসেবে দাঁড় করানো সম্ভব।’

সম্প্রতি প্লান্টটি পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। পরিদর্শনকালে প্লান্টটির বেহাল দশা দেখে তিনি যশোর পৌর কর্তৃপক্ষের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি এটিকে শিগগিরই পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর আশ্বাস দেন।

পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শরীফ হাসান বলেন, ‘আপাতত আমাদের এ প্রকল্পটি কোনো রকম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। সমস্যা সমাধানে বিষয়টি এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। কয়েকটি মিটিংও করেছি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও এটির গতি ফেরাতে নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। দ্রুতই প্লান্টটির সব সমস্যা দূর করে পূর্ণ শক্তিতে ফিরবে এ প্রতিষ্ঠানটি।’

আরও