পরিবেশ মেলা ও জাতীয় বৃক্ষমেলার উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী

ঢাকাকে বসবাসের যোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘ঢাকা এখন বিশ্বের বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছে, যা মোটেও সুখকর সংবাদ নয়।

এ অবস্থা থেকে বের হয়ে এসে বসবাসের যোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। এজন্য দেশের মানুষকে সচেতন করা এখন আমাদের বড় দায়িত্ব।’ রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিন ব্যক্তি ও তিন প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় পরিবেশ পদক দেয়া হয়। এছাড়া বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন সাতটি শ্রেণীতে মোট ২১ জন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় আয়োজিত জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘বৃক্ষ রোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। সপ্তাহব্যাপী বৃক্ষমেলার মিডিয়া পার্টনার বণিক বার্তা।

বাংলাদেশকে একটি ‘সবুজ বসতি’ হিসেবে গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণকে আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। সবাই মিলে কাজ করলেই আমরা সবুজ, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ বসতি গড়ে তুলতে পারব। এ পরিবেশ মেলা বা বৃক্ষমেলার আয়োজন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য একটি নিরাপদ বিনিয়োগ। এ আয়োজন কেবল একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত হবে না। আমি একটি কথাই বেশি গুরুত্ব দিয়ে বলতে চাই—দেশ হোক সকল প্রাণী ও প্রাণের নিরাপদ আবাসস্থল।’

সরকারপ্রধান নির্বাচনের আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘কোন পরিবেশে কী ধরনের গাছ লাগানো উচিত, সে বিষয়েও সবাইকে সচেতন হতে হবে। ইউক্যালিপটাসের মতো ক্ষতিকর গাছ লাগানো থেকে বিরত থাকতে হবে।’

সবাইকে একটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বৃক্ষরোপণ বা সবুজের গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি অবগত। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন ঢাকা শহরকে যতটা গ্রিন দেখতাম, এখন বোধহয় দেখি না। এজন্য আমাদের ভিন্ন কিছু করতে হবে। পরিবারে নতুন সন্তান জন্ম নিলে—তা আমাদের নিজেদের হোক বা আত্মীয়স্বজনের—আমরা যদি সে সন্তানকে স্মরণ করে একটি গাছ রোপণ করি, তাহলে ভালো হয়। আমরা যদি প্রতিটি প্রাণের জন্মকে উদযাপন করি ও স্মরণ রাখি, তাহলে নবজাতকের পাশাপাশি একটি গাছও বেড়ে উঠবে। এভাবেই সবুজায়নের সামাজিক আন্দোলন সফল হবে।’

সবুজায়নে সরকারের নেয়া উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবুজের সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারিভাবেও আমরা অনেক উদ্যোগ নিয়েছি। সরকার গঠনের পর প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে “গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম” চালুর পদক্ষেপ নিয়েছি। কিছুদিন আগে স্কুলগুলোয় একটি কর্মসূচির আওতায় একসঙ্গে প্রায় ৯০ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্লাইমেট ইয়ুথ ফেলোশিপ চালু এবং এনভায়রনমেন্ট স্টার্টআপ ফান্ডসহ বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছি। এগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে অবশ্যই আমরা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সবুজ বাংলাদেশ গঠনে সক্ষম হব।’

বৃক্ষরোপণের পর তার পরিচর্যার আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘গাছপালা, প্রাণী, মাটি, পানি ও বায়ু—পরিবেশের সবকিছু যেন স্বাভাবিকভাবে মিলেমিশে থাকতে পারে, বনায়নের মাধ্যমে এমন একটি ইকোসিস্টেম বজায় রাখার চেষ্টা করছি আমরা। বর্তমান সরকারের কাজের লক্ষ্য পুরো পরিবেশটাকে ঠিকঠাক রাখা। শুধু গাছ লাগানো বা প্লাস্টিক সরানোই যথেষ্ট নয়। আরো অনেক ইন্টিগ্রেটেড (সমন্বিত) বিষয় আছে, যেগুলোর দিকে আমরা খেয়াল রাখার চেষ্টা করছি। নতুন বৃক্ষরোপণ অবশ্যই জরুরি। তবে রোপণ করা গাছটি নিরাপদে বেড়ে উঠছে কিনা সেটি নিশ্চিত করাও খুব বেশি জরুরি।’

ইকোসিস্টেম রক্ষার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যুগ যুগ ধরে স্থানীয় ইকোসিস্টেমের অংশ হয়ে থাকা গাছ, যেগুলোকে আমরা “মাদার ট্রি” বলি, সেগুলো যেন রক্ষা পায়, কেটে ফেলা না হয়, এ বিষয়ে আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। এখানে বন বিভাগের বড় কর্মকর্তারা আছেন, আমি আশা করব তারা বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করবেন। পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে বন উজাড়, পাহাড় কাটা, ম্যানগ্রোভ ধ্বংস ও বন্যপ্রাণী নিধনের বিরুদ্ধেও যতটা সম্ভব কঠোর অবস্থান নিতে আমরা চেষ্টা করছি। বহুদিনের অভ্যাসের মাইন্ডসেট পরিবর্তন করা খুবই কষ্টসাধ্য একটি কাজ, এটি মানুষকে বুঝিয়ে করাতে হবে। তাই আমি বলেছিলাম, বিষয়টি সমাধান করতে প্রত্যেক মানুষকে যার যতটুকু সম্ভব, যে পরিবেশে সম্ভব, সেভাবেই পশু-পাখি রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে।’

দেশের নদী বাঁচাতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা যদি নদীগুলো বাঁচাতে না পারি, তাহলে আগামীতে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে। নদী বাঁচাতে না পারলে কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও পানিনিরাপত্তা কোনোটিই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তাই ইকোসিস্টেম রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। উন্নয়ন ও পরিবেশকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে, প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতি রেখে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি গড়ে উঠুক; এটাই বর্তমান সরকারের প্রত্যাশা। ছাদবাগান, নগর বনায়ন, জিআইএস-ভিত্তিক বৃক্ষরোপণ, নদীতীর ও খালের দুই পাশে সবুজায়ন এবং ইকোট্যুরিজমকে অর্থনীতির নতুন ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার।’

তারেক রহমান বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা আমাদের কৃষি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সর্বোপরি জনজীবনকে প্রতিদিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এ বাস্তবতায় বর্তমান সরকার পরিবেশকে আলাদা কোনো খাত নয়; বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। সরকারের লক্ষ্য একটা সবুজ, পরিচ্ছন্ন, জলবায়ু সহনশীল ও টেকসই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা।’

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনা জরুরি বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘রাজধানীসহ দেশের সব নগর, বন্দর ও শহরতলির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনার কোনো বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে পরিবেশ নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের অসম্ভব সহযোগিতা আমার প্রয়োজন, সরকারের প্রয়োজন। প্লাস্টিক বর্জ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সরকার কাজ শুরু করেছে বা করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে জৈব সার উৎপাদন, পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং “রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেল” বা “থ্রি আর” নীতি জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য আরো দেন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম প্রমুখ।

জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৫: ব্যক্তিগত পর্যায়ে পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছেন আলহাজ ফরহাদ আলী মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. হাসমত আলী। পরিবেশবিষয়ক শিক্ষা ও প্রচার ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছেন মো. মনির হোসেন। পরিবেশবিষয়ক গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম।

প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছে ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রডাক্টস বিডি লিমিটেড। পরিবেশবিষয়ক শিক্ষা ও প্রচার ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস। এছাড়া পরিবেশবিষয়ক গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিজয়ীদের হাতে পদক তুলে দেন।

মেলা উদ্বোধন শেষে সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণেই বৃক্ষরোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর তিনি মেলায় অংশ নেয়া পরিবেশবাদী সংগঠনের স্টল ও নানা রকম ফুল-ফল আর ঔষধি গাছ দিয়ে সাজানো নার্সারিগুলো ঘুরে দেখেন। স্টলে স্টলে ঘোরার সময় প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি উদ্যোগের খোঁজখবর নেন এবং তরুণদের পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন।

আরও