ঢাকাকে দুই সিটিতে ভাগ করার পর ২০০৯ সালে প্রায় ৫৫ একর কৃষিজমি ভরাট করে সেখানে গড়ে তোলা হয় আমিনবাজার ল্যান্ডফিল। শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ সামাল দিতেই এ উদ্যোগ। শুরুতে এটি ছিল অস্থায়ী সমাধান। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বাড়তে থাকে বর্জ্যের স্তূপ, ছড়িয়ে পড়ে দুর্গন্ধ, বদলে যেতে থাকে আশপাশের পরিবেশ।
২০১৭ সালেই শেষ হয়ে যায় ল্যান্ডফিলটির ধারণক্ষমতা। তবুও থেমে থাকেনি বর্জ্য ফেলা। কোনো আধুনিকায়ন ছাড়াই প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন হাজার টন কঠিন বর্জ্য ফেলছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। মাটির সমতল থেকে এখন প্রায় ৯০ ফুট উঁচুতে উঠেছে আবর্জনার স্তূপ, যেন এক কৃত্রিম পাহাড়।
বর্জ্যের সেই ‘পাহাড়’ ছোট করার এক অদ্ভুত পদ্ধতি গড়ে উঠেছে এখানে, নিয়মিতই আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। শুকনো মৌসুমে প্রায় প্রতিদিনই জ্বলতে থাকে ময়লা। আগুনের লেলিহান শিখা না দেখা গেলেও ধোঁয়ার কুণ্ডলী জানান দেয় ভেতরে কী চলছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ধোঁয়ার মাত্রা ও গন্ধই বলে দেয়, এখানে বর্জ্য পোড়ানো একটি চলমান প্রক্রিয়া। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়ার ঘনত্বও বাড়ে।
সরজমিনে ১৯ ফেব্রুয়ারি সকালে দেখা যায়, ল্যান্ডফিলের বিভিন্ন অংশে আগুন জ্বলছে। বর্জ্য পোড়া ছাই ও বিষাক্ত ধোঁয়া শুধু ল্যান্ডফিলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। তা ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের কৃষিজমি, গাছপালা ও বসতবাড়ির দিকে। সবুজ ঘাস বিবর্ণ হয়ে পড়েছে, মাটির রঙ হয়েছে কালচে। বাতাসে মিশে থাকা পোড়া প্লাস্টিকের গন্ধে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা দায়।
ল্যান্ডফিলের ভেতরে ঢুকতে চাইলে বাধা দেন দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা। উত্তর সিটি করপোরেশনের অনুমতি ছাড়া ঢোকা যাবে না বলে জানান তারা। ময়লা পোড়ানের বিষয়ে জানতে চাইলে তাদের দাবি, ভাগাড়ে মিথেন গ্যাসের কারণে আগুন জ্বলে ওঠে। কেউ ইচ্ছা করে ময়লায় আগুন দেয় না। আর এ আগুন নেভাতেও তাদের অনেক বেগ পেতে হয় বলে জানান। তবে বাইরে থেকেই দেখা যায়, ময়লার স্তূপের বিভিন্ন জায়গা থেকে আগুনের ফুলকি ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠছে। এর মধ্যেই কাজ করছেন কর্মীরা।
ল্যান্ডফিলের বাইরে থেকে দেখা যায়, ময়লার স্তূপের বিভিন্ন জায়গা থেকে আগুনের ফুলকি বের হচ্ছে, যা পুরো ভাগাড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখান থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উড়ে যাচ্ছে। এর মাঝেই কাজ করছেন কর্মীরা। তবে ময়লা পোড়ার তীব্র গন্ধে সেখানে বেশিক্ষণ থাকা কোনো জনসাধারণের পক্ষেই সম্ভব নয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুকনো মৌসুমে প্রায় প্রতিদিনই ময়লা পোড়ানো হয়, রাতে এর মাত্রা বাড়ে। ধোঁয়ার কারণে আশপাশের বাসাবাড়িতে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। আর পথচারী ও যাত্রীদের ধোঁয়ার কবল থেকে বাঁচতে নাক-মুখ ঢেকে চলতে হয়।
বলিয়ারপুরের বাসিন্দা সাইদুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় বণিক বার্তার। চোখে সমস্যা নিয়ে তিনি চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছিলেন। ওই বৃদ্ধ জানান, বর্ষায় আগে মাছ ধরতেন। আর শুকনো মৌসুমে করতেন কৃষিকাজ। কিন্তু ল্যান্ডফিলের কারণে এখন সব বন্ধ। সেখানকার পরিবেশের অবস্থা এখন ভয়াবহ। ধোঁয়ার কারণে তার চোখে সমস্যা হয়েছে জানিয়ে সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘এই দ্যাখেন আমার চোখের কী অবস্থা, লাল হইয়া গেছে। এই ধোঁয়ায় এমন হইছে। আমি ডাক্তারের কাছে যাইতাছি। আর গন্ধের কথা কী কমু। আমাগো বাড়িতে ভাড়াটিয়া থাকে না এই গন্ধে। যাইয়া দেখেন, কোনো বাড়িতেই ভাড়াটিয়া নাই এলাকার।’
এসব নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো সরকারের তোপের মুখে পড়তে হয় বলেও জানান সাইদুল ইসলাম। বলেন, ‘এইডা সরকারি সম্পত্তি। প্রতিবাদ করলে উল্টা আমাগো ধাওয়াইয়া আসে।’
ল্যান্ডফিলের বিস্তৃতি ও দূষণের প্রভাবে অনেকেই পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ হয়েছেন দিনমজুর, কেউ ছোটখাটো পরিবহন চালক, কেউবা অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন। আমিনবাজার থেকে বলিয়ারপুর পর্যন্ত অটোরিকশা চালান আয়নাল। ধোঁয়ার কারণে তিনি নাক-মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখেন। পথিমধ্যে কথা হলে তিনি বলেন, ‘ধোঁয়ার জন্য কষ্ট বেশি হয়। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। অনেক বিষাক্ত ধোঁয়া।’
মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিল নিয়ে একটি বিস্তর গবেষণা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা। তারা ল্যান্ডফিলের পোড়ানো বর্জ্য থেকে বের হওয়া ধোঁয়ায় ব্যাপক মাত্রায় মিথেন গ্যাসের উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছেন। পাশাপাশি ময়লা থেকে বের হওয়া বিষাক্ত তরল ও ভারী ধাতু পার্শ্ববর্তী কৃষিজমি, ভূগর্ভস্থ পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে বলে দেখতে পান। এসব ফসল থেকে উৎপন্ন খাবার মানবদেহে ক্যান্সারসহ প্রাণঘাতী নানা ব্যাধির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলেও মনে করছেন গবেষকরা।
ওই গবেষণা দলে ছিলেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দুটি ল্যান্ডফিল থেকে প্রতি বছর ৫০ হাজার টন মিথেন গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মিথেন ছাড়াও এখান থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মাইক্রো প্লাস্টিক বের হচ্ছে। আর এর লিচেটও (বর্জ্যনিঃসৃত বিষাক্ত তরল) পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
বছরের পর বছর ধরে বর্জ্যের স্তূপ থেকে বের হওয়া লিচেট (বিষাক্ত তরল) মাটির গভীরে মিশে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। এতে কৃষিজমি ও ভূগর্ভস্থ পানির গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সেই সঙ্গে ফসল ও ফলের মাধ্যমে মানবদেহে ক্যান্সারসহ নানা প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি তৈরি করছে বলেও আশঙ্কা গবেষকদের।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘লিচেট যেখানে জমা হবে তার তলদেশ ছিদ্রমুক্ত থাকতে হবে। ওই জায়গা এমনভাবে ঢালাই দিতে হবে, যাতে কোনোভাবেই বিষাক্ত তরল মাটির সঙ্গে না মেশে। কিন্তু আমিনবাজারে লিচেট মাটির সঙ্গে মিশে তা কৃষিজমি ও ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত করে ফেলেছে। ফলে ওইসব ফল ও ফসল খেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে।’
বিশ্বের অনেক দেশেই উন্মুক্ত ল্যান্ডফিল পদ্ধতি এখন পরিত্যক্ত। সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি—পাইরোলাইসিস, গ্যাসিফিকেশন, স্যানিটারি ল্যান্ডফিলসহ নানা পদ্ধতি। অথচ উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় থাকা রাজধানীর প্রান্তে এখনো খোলা আকাশের নিচে উঁচু হয়ে উঠছে ‘ময়লার পাহাড়’।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের ময়লার যে ধরন, সে অনুযায়ী চলমান টেকনোলজি যেগুলো আছে, তা দিয়ে একবারে ব্যবস্থাপনা করা কঠিন। উদাহরণ হিসেবে বললে পাইরোলাইসিস গ্যাসিফিকেশন একটা টেকনোলজি আছে, যা ক্ষতি ছাড়াই অনেক বর্জ্য পুড়িয়ে দিতে পারে। এমন টেকনোলজি নিয়ে সরকার চিন্তা করতে পারে। নতুন করে যাতে ময়লা পোড়ানো না হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে।’
ঢাকা শহর বড় হচ্ছে, বর্জ্যও বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে—এ বৃদ্ধি কি পরিকল্পিত? পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি কি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে? বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০২২ অনুযায়ী, খোলা স্থানে বর্জ্য সংরক্ষণ বা পোড়ানো নিষিদ্ধ। সড়ক বা মহাসড়কের পাশে বর্জ্য পোড়ালে দুই বছরের কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আমজাদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিষাক্ত গ্যাস শ্বসনতন্ত্রের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে কার্বন মনোক্সাইড রক্তে মিশে অক্সিজেন পরিবহনে বাধা দেয়। এতে কিডনি ও লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফুসফুসে ক্ষতিকর কণিকা জমে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে।’