রোডম্যাপ ঘোষণা প্রধান উপদেষ্টার

এপ্রিলের প্রথমার্ধে সংসদ নির্বাচন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় ঘোষণা করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

আগামী বছরের এপ্রিলের প্রথমার্ধের যেকোনো দিন ভোট হতে পারে বলে তিনি গতকাল জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে জানিয়েছেন। ভাষণটি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বিটিভিতে প্রচার করা হয়।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমি দেশবাসীর কাছে ঘোষণা করছি যে আগামী জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধের যেকোনো একটি দিনে অনুষ্ঠিত হবে। এ ঘোষণার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন উপযুক্ত সময়ে আপনাদের কাছে নির্বাচনের বিস্তারিত রোডম্যাপ প্রদান করবে।’

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। সরকারের গঠিত সংস্কার কমিশনগুলো যেসব সুপারিশ দিয়েছে, তার ভিত্তিতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য এখন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করছে ঐকমত্য কমিশন। প্রধান উপদেষ্টা বরাবরই বলে আসছিলেন, নির্বাচন কবে হবে তা নির্ভর করবে সংস্কার কতটা করা হবে তার ওপর। গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার সেরে ডিসেম্বরেই নির্বাচন সম্ভব। আর আরো কিছু সংস্কার করলে আগামী বছরের জুনের মধ্যে ভোট করা যাবে। তবে নির্বাচন জুনের পরে যাবে না, সেটাও তিনি বলেছেন।

বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল অবশ্য ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। তা না হলে এরপর সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে বলে তাদের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি রয়েছে। রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন পক্ষের চাপের মধ্যে আগের ঘোষণা থেকে তাই কিছুটা এগিয়ে এনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য নতুন সময় ঘোষণা করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, ‘আগামী জাতীয় নির্বাচন কখন হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানার জন্য রাজনৈতিক দল ও জনগণের মধ্যে বিপুল আগ্রহ রয়েছে। আমি বারবার বলেছি এ নির্বাচন ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। এ সময়ের মধ্যে দেশে নির্বাচন উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির জন্য যা যা করা দরকার, সরকার তাই করছে।’

বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে যতবার গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে তার সবগুলোরই প্রধান কারণ ছিল ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন—এমনটা মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বারবার ক্ষমতা কুক্ষিগত করার মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক দল বর্বর ফ্যাসিস্টে পরিণত হয়েছিল। এ ধরনের নির্বাচন যারা আয়োজন করে তারা জাতির কাছে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়। এমন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে দল ক্ষমতায় আসে তারাও জনগণের কাছে ঘৃণিত হয়ে থাকে।’

ড. ইউনূস আরো বলেন, ‘এ সরকারের একটি বড় দায়িত্ব হলো পরিচ্ছন্ন, উৎসবমুখর, শান্তিপূর্ণ, বিপুলভাবে অংশগ্রহণের পরিবেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এমন একটি নির্বাচন আয়োজন করা যাতে করে দেশ ভবিষ্যতে নতুন সংকটে না পড়ে। এজন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। যে প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত সেগুলোয় যদি সুশাসন নিশ্চিত করা না যায় তাহলে ছাত্র-জনতার সব আত্মত্যাগ বিফলে যাবে।’

সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন—এ তিনটি ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আগামী রোজার ঈদের মধ্যে সংস্কার ও বিচারের বিষয়ে আমরা একটি গ্রহণযোগ্য জায়গায় পৌঁছতে পারব বলে বিশ্বাস করি। বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, যা কিনা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি আমাদের সম্মিলিত দায়—সে বিষয়ে আমরা দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পারব। আমরা এমন নির্বাচন চাই যা দেখে অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মা তৃপ্তি পাবে, তাদের আত্মা শান্তি পাবে। আমরা চাই আগামী নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোটার, সবচেয়ে বেশি প্রার্থী ও দল অংশ নিক। এটা সবচেয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হিসেবে জাতির কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকুক।’

দেড় যুগ পর দেশে সত্যিকারের একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংসদ গঠিত হবে জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ‘বিপুল তরুণগোষ্ঠী এবার জীবনে প্রথম ভোট দেয়ার সুযোগ পাবে। এসব লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আমরা জাতির কাছে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আমি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাই, আপনারা সব রাজনৈতিক দল এবং আপনাদের এলাকার প্রার্থীদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার আদায় করে নেবেন, আগামী সংসদের প্রথম অধিবেশনেই যেসব সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্য অর্জিত হয়েছে তা কোনো ধরনের কাটাছেঁড়া ছাড়াই যেন তারা অনুমোদন করেন।’

আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যকে ভোটের সময়ের ব্যাপারে একটা ধারণা বা ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে বিএনপিসহ বিভিন্ন দল। তাদের দাবি, প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যে নির্বাচনের তারিখের ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো রোডম্যাপ নেই। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নির্বাচনের সময়ের প্রশ্নে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ চায় তারা।

এ প্রসঙ্গে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ চেয়ে আসছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করাটা ইতিবাচক। তবে

সে দিনক্ষণ আমরা ডিসেম্বরে চেয়েছিলাম, সেটি পিছিয়ে জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে হতে পারত। এ সময়সীমা নিয়ে আলাপ-আলোচনাও হতে পারে।’

আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন হলে কোনো ঝুঁকি থাকত না বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা ডেফিনেট ডেটটা পাইনি। আমাদের কাছে মনে হয়েছিল যে নির্বাচন ডিসেম্বরেই হতে পারে। ডিসেম্বরে হলে কোনো দিকেই রিস্ক থাকে না। জামায়াতে ইসলামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন করার কথা বলেছিল। ওটাও আমাদের কাছে ভালো মনে হয়েছিল, ওটাও করেনি। এখন যেটা করলেন এপ্রিলে। মে মাসে বৃষ্টি, এপ্রিলে তীব্র গরম—এ সময়ে ইলেকশন করলে ভালো করা যাবে কিনা বুঝি না। ওয়েদারের কারণে বলছি এটা ভালো হবে কিনা, এ একটা সংশয় রয়েছে।’

নির্বাচনের এ ঘোষণা জাতীয় ক্ষেত্রে রাজনীতির অবিশ্বাস অনেক কমিয়ে দেবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যে অবিশ্বাস, অনাস্থার ব্যাপার তৈরি হয়েছিল সেটা হয়তো এ রকম থাকবে না। বিশ্বাস করা যাবে যে নির্বাচন দিচ্ছে। তারপরও ডেট নিয়ে আমরা কথা বলতে পারি। সেটা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গেও হতে পারে।’

প্রধান উপদেষ্টার ঘোষিত নির্বাচনী রোডম্যাপকে স্বাগত জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তবে ভোটের আগে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো সম্পন্ন করারও দাবি জানিয়েছে তারা। তরুণদের নিয়ে গঠিত এ দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনী রোডম্যাপকে স্বাগত জানাই। তবে মৌলিক সংস্কারগুলো অবশ্যই করতে হবে। তাছাড়া নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সক্রিয় করা; কারচুপি রোধে ভোট কেন্দ্রগুলো মেরামতের মতো সমস্যাগুলোর সমাধানও করতে হবে। এসব সমস্যা সমাধান না করে নির্বাচন দেয়া হলে তা ফলপ্রসূ হবে না। নির্বাচন কমিশনকেও নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে হবে, যেন নির্বাচন নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারে।’

নির্বাচনের সময়কে যথার্থ বলে মনে করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাড. মতিউর রহমান আকন্দ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর আমির এর আগেই বলেছেন, বর্ষাকালে নির্বাচন মানুষের জন্য একটি অস্বস্তিদায়ক পরিবেশ, এ ক্ষেত্রে এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচন হলে ভালো হয়। তাই আমরা মনে করি নির্বাচনের জন্য যে সময়টা বলা হয়েছে, তা একটি সুইটেবল টাইম (উপযুক্ত সময়)। আশা করব, এর আগেই প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করা হবে; গণহত্যার বিচারের একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হবে। নির্বাচনের পর অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন হবে।’

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনের যে ঘোষণা দিয়েছেন তা আমাদের পূর্ববর্তী প্রস্তাব ও এ-সংক্রান্ত পর্যালোচনার সঙ্গে না মিললেও আমরা তার ওপর আস্থা রাখতে চাই। তবে আবহাওয়াজনিত কারণে এপ্রিলে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কিছু সমস্য তৈরি হতে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা।’

প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে জাতির প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে দেয়া দীর্ঘ ভাষণে অনেক কিছু বলেছেন। সরকারের কৃতিত্ব, কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যতে কী করতে চান ইত্যাদি। এর ফাঁকে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময় ঘোষণা দিয়েছেন।’

নির্বাচনের ঘোষিত সময় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পঞ্চাশের বেশি দল ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছিল। আমরা যৌক্তিকভাবে ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আমাদের বক্তব্য সবসময় যুক্তি সহকারে উপস্থাপন করেছি। সে বিষয়টি আমলে না নিয়ে এমন সময়ে নির্বাচনের সময় ঘোষণা করেছেন, যে সময়ে পাবলিক পরীক্ষা থাকে, আবহাওয়া ঠিক থাকে না। এছাড়া আমাদের জানামতে ফেব্রুয়ারির ১৬, ১৭ বা ১৮ তারিখের দিকে রমজান মাস শুরু হবে।’ এ বিষয়ে তার দলের উচ্চপর্যায়ে আলোচনার পর বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে বলেও জানান তিনি।

জুলাই মাসেই ‘জুলাই সনদ’ ঘোষণা

আগামী জুলাই মাসেই ‘জুলাই সনদ’ ঘোষণা করা হবে বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব ও অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা একটি “জুলাই ঘোষণাপত্র” দেয়ার কথা জানিয়েছিল। তারা আমাকেও সেখানে আমন্ত্রণ জানায়। আমি বলেছিলাম, দেশের সব রাজনৈতিক ব্যক্তি, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ অন্যদের সঙ্গে নিয়ে সবাই মিলে এ ঘোষণাপত্র দেয়া ভালো হবে। এর পাশাপাশি আগামী জুলাই মাসেই সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি “জুলাই সনদ” প্রস্তুত করে আমরা জাতির সামনে উপস্থাপন করতে পারব বলে আশা করছি।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এ জুলাই সনদ হলো একটি প্রতিশ্রুতি। একটা জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য সংস্কার কমিশন যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছে সেগুলোর মধ্য থেকে রাজনৈতিক দলগুলো যে কয়টিতে একমত হয়েছে তার তালিকা থাকবে এ সনদে। জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে তারা জাতির কাছে সেগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘জুলাই সনদ অনুযায়ী আশু করণীয় সংস্কার কাজগুলো আমরা বাস্তবায়ন করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বাকি অংশের বেশকিছু কাজও আমরা শুরু করে যেতে চাই। আশা করি, অবশিষ্ট অংশ পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে।’

আরও