চমেকের মনোরোগবিদ্যা বিভাগে ভর্তি রোগীদের ৪৩% বাইপোলার ও সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত

নেই ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, জনবল সংকটে সেবাবঞ্চিত রোগীরা

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রোগীরা নিজের আচরণকে অস্বাভাবিক মনে না করায় চিকিৎসা নিতে দেরি করেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগে ভর্তি রোগীদের বড় অংশই বাইপোলার ও সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। ২০২৫ সালে বিভাগটিতে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেয়া ১ হাজার ৬৮ রোগীর মধ্যে ৪৫৭ জন বা ৪২ দশমিক ৭৯ শতাংশই এ দুই রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রোগীরা নিজের আচরণকে অস্বাভাবিক মনে না করায় চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। চিকিৎসা শুরুতে দেরি হওয়ায় সুস্থ হতেও বেশি সময় লাগে রোগীদের। ফলে গুরুতর মানসিক রোগগুলোর চিকিৎসায় ওষুধের পাশাপাশি থেরাপির প্রয়োজন হয়। তবে বিভাগটিতে কোনো ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট নেই। এছাড়া রয়েছে জনবল সংকট। এতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি থেরাপি ও কাউন্সেলিং থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা।

চিকিৎসা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের মানসিক রোগের চিকিৎসার একমাত্র জায়গা চমেকের এ বিভাগ। তবে রোগীর চাপের বিপরীতে বিভাগটিতে চিকিৎসক-নার্সসহ জনবলের ব্যাপক সংকট রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য নেই আনসার সদস্য। সংকট মোকাবেলায় বিভাগটির আধুনিকায়ন জরুরি।

চমেক হাসপাতালের পুরনো ভবনের দ্বিতীয় তলার ১০ নং ওয়ার্ডের মনোরোগবিদ্যা বিভাগে সরজমিনে দেখা যায়, বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে অপেক্ষা করছেন রোগীরা। আন্তঃবিভাগেও ভর্তি হওয়ার জন্য রোগীরা অপেক্ষমাণ ছিলেন। ভেতরে বেশ কয়েকটি শয্যা খালি ছিল। ওয়ার্ডের ভেতরে আইসোলেশন রুমে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের বিছানার সঙ্গে হাত-পা বেঁধে চিকিৎসা দিতে দেখা যায়। ওয়ার্ডে কয়েকজন মানসিক রোগীকে হাঁটাহাঁটি করতে দেখা গেছে। তবে নার্স ও রোগীর পরিবারের সদস্যদের রোগী সামলানোর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো।

চমেক হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ২০২৫ সালে মানসিক রোগে আক্রান্ত ১ হাজার ৬৮ জন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৩৮ জন বাইপোলার-১ এবং ২১৯ জন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। ২০২৪ সালেও মোট আক্রান্ত রোগীর প্রায় ৪৫ শতাংশই বাইপোলার-১ ও সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ছিল।

চমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মনোরোগবিদ্যা বিভাগের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ১০০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এদের বেশির ভাগই প্রাথমিক পর্যায়ের বাইপোলার কিংবা সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। এছাড়া ইনডোরে গড়ে প্রায় ৪০-৪৫ জন রোগী ভর্তি থাকেন। ২০২০ মনোরোগবিদ্যা বিভাগের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১০ হাজার ৮১৫ এবং আন্তঃবিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩২৬ জন। সেখানে ২০২৫ সালে চূড়ান্ত সংখ্যা বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ২০ হাজারের বেশি এবং আন্তঃবিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ হাজার ৬৮ জন রোগী। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে বহির্বিভাগে রোগী বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে তিন গুণের বেশি।

ওয়ার্ডের বহির্বিভাগের চিকিৎসক মো. শাহীদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, বহির্বিভাগে রোগীদের সমস্যাগুলো আগে শোনা হয়। পরে প্রাথমিকভাবে কিছু ওষুধ দিয়ে ১০-১৪ দিন পর পরিবারের সদস্যসহ আবার আসতে বলা হয়। এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রোগীর ভর্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এদিকে জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। জানা গেছে, ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিভাগে ২০২৩ সালে অধ্যাপক পদ সৃজন করা হলেও এখন পর্যন্ত ওই পদে কেউ দায়িত্ব পালন করেননি। বর্তমানে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন সহযোগী অধ্যাপক পদমর্যাদার একজন চিকিৎসক। মেডিকেল অফিসারের ছয়টি পদের মধ্যে তিনটি খালি। রোগীদের মানসিক সাপোর্ট ও কাউন্সেলিংয়ের জন্য ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট পদ নেই। জানা গেছে, বিভাগটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অন্তত ছয়-সাতজন সাইকোলজিস্ট প্রয়োজন। বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থীরা ইন্টার্নশিপের সময় কাউন্সেলিং ও মানসিক সাপোর্টের কাজ করেন।

বিভাগটিতে ১২ জন নার্স আছেন, যা রোগীর ধরন বিবেচনায় কম। মাত্র তিনজন ওয়ার্ড বয় দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। আয়া ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীর সংকটও আছে। অন্যদিকে মানসিক রোগের চিকিৎসা হলেও নিরাপত্তার জন্য কোনো আনসার সদস্য নেই বিভাগটিতে। নিরাপত্তা না থাকায় অনেক সময় রোগীরা বাইরে বেরিয়ে গেলে নার্স বা চিকিৎসকদের গিয়ে তাদের খুঁজে আনতে হয়।

চমেক হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. পঞ্চানন আচার্য বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চমেকে অন্যান্য বিভাগের তুলনায় এ বিভাগে জনবল সংকট বেশি। মাত্র তিনজন ওয়ার্ড বয় দিয়ে বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগ চালাতে হচ্ছে। বিশেষায়িত নার্সের সংকট তো আছেই। এছাড়া আনসার সদস্য না থাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল। এ বিভাগ চালাতে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক ও মনোরোগ সেবায় অভিজ্ঞ নার্স নিয়োগ দেয়া দরকার। তবে বিভাগে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট পদে নিয়োগ দেয়া অতিজরুরি।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মানসিক রোগ মূলত নিউরোলজির বিষয়, যা ব্রেনকে প্রভাবিত করে। গুরুতর মানসিক রোগে সাইকোলজিক্যাল থেরাপি সবসময় কার্যকর হয় না, অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের প্রয়োজন হয়। এছাড়া কনভার্সন ডিজঅর্ডার, ওসিডি ও জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারের মতো রোগ থেরাপির মাধ্যমে ভালোভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। সেজন্য রোগীকে নিয়মিত চেকআপের মধ্যে থাকতে হয়। তাদের সেবা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন।’

সার্বিক প্রসঙ্গে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মনোরোগবিদ্যা বিভাগে বিভিন্ন সংকট রয়েছে। রোগীর চাপের তুলনায় জনবল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি আছে। যেহেতু বিভাগটি বিশেষায়িত, তাই সংকটের বিষয়গুলো আমরা অবগত আছি। সেগুলো সমাধানে কাজ করছি। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে আনসার সদস্য নিয়োগের বিষয়েও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হবে।’

আরও