ইউএইচসি ফোরাম ও পিপিআরসির সংলাপে বক্তারা

সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার

বাংলাদেশে সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার প্রয়োজন বলে মনে করেন রাজনৈতিক দল, একাডেমিয়া, সরকার, সুশীল সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।

বাংলাদেশে সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার প্রয়োজন বলে মনে করেন রাজনৈতিক দল, একাডেমিয়া, সরকার, সুশীল সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।

গতকাল পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ইউএইচসি ফোরামের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘প্রায়োরিটি হেলথ রিফর্ম অ্যাকশন এজেন্ডা: বাংলাদেশ রোড টু ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ’ শীর্ষক এক নীতিনির্ধারণী সংলাপে বক্তারা এ কথা বলে।

বক্তারা বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখনো বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা মৌলিক অধিকার হলেও বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশ এখনো ৫০-এর ঘরে। থাইল্যান্ডের মতো সমসাময়িক রাষ্ট্র স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক উন্নতি সাধন করলেও বাংলাদেশ সেটি পারছে না। এমনকি শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার মতো অনেক দেশও অনেক এগিয়ে। এ দেশে প্রতি বছর মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট বের হয়ে এলেও বাড়ছে না সেবার মান। এছাড়া রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় লোকবলের সংকট রয়ে যাচ্ছে। এ পর্যায় থেকে দেশের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার ও সবার জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রয়োজন একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এ খাতের কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য দলমত নির্বিশেষে সহযোগিতা ও আইনি সংস্কারের গুরুত্ব দিতে হবে।’

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও ইউএইচসি ফোরামের আহ্বায়ক হোসাইন জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউএইচসি ফোরামের সদস্য সচিব ডা. মো. আমিনুল হাসান। উপস্থাপনায় বাংলাদেশের ইউএইচসি অগ্রযাত্রাকে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা হয় এবং আর্থিক দুরবস্থার ঝুঁকি কমাতে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার উদাহরণ হিসেবে থাইল্যান্ডের ইউনিভার্সাল কাভারেজ স্কিমের কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে ধারাবাহিক রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ফলে ব্যক্তিগত পকেট থেকে স্বাস্থ্য ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।

উপস্থাপনায় দেশের সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায় আঞ্চলিক জোট আসিয়ান ও সার্কভুক্ত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনো নিম্নস্তরের। বিশ্ব স্বাস্থ্যের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশের ৪২ শতাংশ মানুষ এখনো সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার বাইরে, যা ২০৩০ সালে ১৮-২২ শতাংশ নামিয়ে আসা সম্ভব বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ডব্লিউএইচও। সার্কভুক্ত দেশেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। দেশটির প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় এসেছে। এছাড়া পাকিস্তানের ৫১, নেপালের ৫৯, মালদ্বীপ ও ভুটানের ৬৫ শতাংশ মানুষ এ সেবা পাচ্ছে। তবে পিছিয়ে রয়েছে আফগানিস্তান। দেশটির মাত্র ৪৫ শতাংশ মানুষ এ সেবার আওতায় রয়েছে। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ সিঙ্গাপুরের ৮৬ শতাংশ মানুষ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সেবা পায়। এছাড়া থাইল্যান্ড ৮৩, ভিয়েতনাম ৭৩, ইন্দোনেশিয়া ৭১, মালয়েশিয়া ৭৭ এবং মিয়ানমারের ৬৪ শতাংশ মানুষ এ সেবার আওতায় এসেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এসব দেশের মানুষ ৭৫-৯৫ শতাংশ পর্যন্ত সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

দেশের সব মানুষের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে ভবিষ্যৎ সরকারকে যথাযথ উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন বক্তারা। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. জাহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, ‘আমরা বারবার বলি স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছবে, কিন্তু বাস্তবে অনেক মানুষ এখনো উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়েও সেবা পাচ্ছেন না। স্পষ্ট সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন বাস্তবায়িত হয়নি।’

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. একেএম ওয়ালিউল্লাহ স্বাস্থ্য খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য দলমত নির্বিশেষে সহযোগিতা ও আইনি সংস্কারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মিয়ানমারের চেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে। এটা কোনোভাবে মানা যায় না। দেশের স্বাস্থ্য খাতকে পরিবর্তন করতে হলে প্রয়োজন একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, যোগ্য নেতৃত্ব, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সরকারি-বেসরকারি পার্টনারশিপ পাশাপাশি এনজিওগুলোর ভূমিকা। আমাদের এখানে সফল হতে হলে আগামীতে যারাই আসবে তাদের স্বাস্থ্য খাতের প্রায়োরিটি নিয়ে জানাতে হবে। এখানে আমরা একে অপরের প্রতিপক্ষ নই। যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন, পেশাজীবী হিসেবে আমাদের সবার একে অন্যকে সহায়তা ও গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাত সংস্কারে এগিয়ে আসতে হবে।’

বিএনপির পরিবার কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মহসিন জিল্লুর করিম বলেন, ‘আমরা মূল সমস্যায় আঘাত করতে চাই। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সর্বজনীন ও গ্রহণযোগ্য করাই আমাদের লক্ষ্য। বিগত সরকার মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে ধ্বংসের ধারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল, তারা এখানে বাণিজ্যিকীকরণ করেছিল। আমরা সেখান থেকে বের করে আনতে কাজ করব। সত্যিকার অর্থে এখানে আমূল পরিবর্তন আনতে চাই। সেজন্য জনস্বাস্থ্য সেবায় আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে। চিকিৎসা প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো সংস্কার প্রয়োজন।’

সভাপতির বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘প্রতি বছর স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপ অনেক মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলে। করোনা মহামারীর সময়ে করা বিভিন্ন গবেষণাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব উঠে এসেছে। স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিলে একটি সুস্থ কর্মশক্তি গড়ে ওঠে, যা শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি।’

তিনি রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন, যা কেবল চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধ ও সামগ্রিক সুস্থতাকেও গুরুত্ব দেবে—বিশেষত নতুন সরকারের প্রেক্ষাপটে। হোসেন জিল্লুর রহমান উল্লেখ করেন, স্বাস্থ্য ফলাফল কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয়, বরং অর্থ, পরিকল্পনা ও প্রশাসনসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভরশীল।

এ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক এমএ ফয়েজ, বাংলাদেশ পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. সৈয়দ উমর খৈয়াম, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ উপস্থিত ছিলেন।

আরও