বর্ষায় উজানের ঢলে পদ্মার স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসছে বিষাক্ত রাসেলস ভাইপার, কিং কোবরা, কমনক্রেটসহ বিষধর সাপ। প্রমত্তা পদ্মার পানি রাজশাহী অঞ্চলের আশপাশের জেলা ও উপজেলাগুলোর খাল-বিল, নদী-নালা এবং শহরের বড় বড় ড্রেনগুলো দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে বিষধর সাপও ছড়িয়ে পড়ছে শহর ও গ্রামের খেত, বন-জঙ্গলে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে অদ্যাবধি রাজশাহীতে এসব সাপের কামড়ের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ২০৩ জন। এর মধ্যে ২৫৯ জন বিষধর সাপে কামড়ানো এবং ৯৪৪ জন অবিষধর সাপে কামড়ানো রোগী। এ পর্যন্ত সাপের কামড়ে ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু রাসেলস ভাইপারের কামড়েই মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের। বাকি ২৯ জন মারা গেছেন কোবরা ও কমনক্রেট সাপের কামড়ে।
২০০৯ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষে রাসেলস ভাইপার, কোবরাকে বাংলাদেশে মহাবিপন্ন এবং ও বিশ্বে বিপন্মুক্ত প্রাণীগোত্রভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত করা হলেও গত এক দশকের বেশি সময়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে আস্তানা গেড়েছে ভয়ংকর এ দুটি সাপ। গত সাত থেকে আট বছরের ব্যবধানে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেও বেড়েছে রাসেলস ভাইপার ও কোবরার উপদ্রব।
বাংলাদেশ ভেনম রিসার্চ সেন্টারের গবেষক বোরহান বিশ্বাস রোমন। রাজশাহী এয়ারপোর্টের অদূরেই রয়েছে তার স্নেক রেসকিউ অ্যান্ড কনজারভেশন সেন্টার। বিরল প্রজাতির সাপ কোরাল রেড কুকরি বা কমলাবতিকে উদ্ধার ও তার পরিচর্যা করেন এ গবেষক। রাসেলস ভাইপার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আশির দশকে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তর সাপটিকে বিলুপ্ত প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করে। তবে ২০০৯ সালে বাংলাদেশে সাপটির প্রথম দেখা মেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার কৃষিজমিতে। ২০১১ ও ২০১২ সালে শুধু রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়ার দেখা মিললেও ২০১৩ সালে নাটোরের লালপুরে, ২০১৪ সালে পাবনার রূপপুর এবং একই বছরের শেষদিকে ফরিদপুর ও রাজবাড়ী জেলায় এ সাপের সন্ধান মেলে। মূলত ২০১৬ সালের দিকে রাসেলস ভাইপারের কামড়ে মৃত্যুর খবর বেশি মিলতে থাকে। এরপর থেকে প্রায় প্রতি বছরই সংখ্যাটি বাড়তে থাকে; এখন তা আরো বেশি বেড়েছে। দুঃখজনকভাবে চলতি বছরে শুধু রামেক হাসপাতালেই ৪১ জন মারা গেছেন।’
রাজশাহী নগরের পাঠানপাড়া এলাকার শাহেদ আলম বেশির ভাগ সময় থাকেন নদীতে। তিনি জানান, বছর পাঁচেক আগেও সাপের ভয় লাগত না। কিন্তু এখন লাগে। বিশেষ করে রাতের বেলায়। কারণ গত কয়েক বছরে রাজশাহীর চর, নদীর আশপাশে সাপের আনাগোনা বেড়েছে। তাদের এলাকার অনেক মানুষকেই রাসেলস ভাইপার কামড়েছে। বহু সাপ পিটিয়েও মারা হয়েছে। তার পরও কর্ম যখন নদীতেই তাই সাবধানে চলাচল করতে হয়।
চারঘাট উপজেলার কৃষক আবুল কালাম। পদ্মার মধ্য চরে ছিল তাদের কিছু আবাদি জমি। নদীর পাশেও রয়েছে তাদের কয়েক বিঘা জমি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মধ্য চরে যে জমি ছিল সেখানে আবাদ করা খুব দুষ্কর। রাসেলস ভাইপার আর কোবরা সাপের আখড়া। জমিতে যাওয়া যায় না, সাপের উপদ্রব বেশি। একটা সাপ ৩০-৫০টি করে বাচ্চা দেয়। রাতে জমিতে যাওয়া যায় না। গামবুট পরে খুব সাবধানে জমিতে কাজ করতে হয়।’
সাপের কামড়ে আক্রান্তদের ব্যাপারে রামেকের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবু শাহীন মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এ বছর সাপের কামড়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। এ অঞ্চলে প্রতি বছরই তুলনামূলকভাবে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি আমরা পরিচালককে জানালে তিনি আলাদা ওয়ার্ড করে দেন।’
সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী অঞ্চলে সাপের কামড়ের ঘটনা বেড়েছে। রামেকে অ্যান্টিভেনমের সংকটও রয়েছে। এ ব্যাপারে রামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফএম শামীম আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের উন্নত চিকিৎসা দিতে হাসপাতালের একটি বিশেষ ওয়ার্ড চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের সম্প্রসারিত অংশকে আক্রান্তদের জন্য বিশেষ ১২ শয্যার ওয়ার্ডে রূপান্তর করা হচ্ছে। কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে। আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যেই এটি চালু করতে পারব।’
অ্যান্টিভেনম সংকটের বিষয়টি তিনি স্বীকার করে বলেন, ‘অ্যান্টিভেনমের পর্যাপ্ত মজুদ না থাকায় চিকিৎসা কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিন রামেকে ৬০-১০০ ভায়াল অ্যান্টিভেনম প্রয়োজন হয়। সাধারণত আমরা ৫০০ ভায়াল মজুদ রাখি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন করে সরবরাহের জন্য অর্ডার দেয়। কিন্তু ১৫ দিন ধরে সরবরাহ আসেনি। এখন যা মজুদ আছে, তা দুই একদিনেই শেষ হয়ে যাবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা এখন বিভিন্ন উপজেলা ও জেলা হাসপাতাল থেকে অ্যান্টিভেনম সংগ্রহ করছি।’
এ প্রসঙ্গে রাজশাহী সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম বলেন, ‘জেলার সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় অন্তত ৫০-১০০ ভায়াল করে অ্যান্টিভেনম দেয়া হয়েছে। সাপের কামড়ে আক্রান্ত কেউ এলেই দ্রুত চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।’