বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক মাত্রা স্থান, ঋতু ও আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে দেশে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ধরা হয় ২ হাজার ৩০০ মিলিমিটার। ছয় ঋতুর দেশে আষাঢ় ও শ্রাবণ বর্ষাকাল হলেও কার্তিক মাস পর্যন্ত কম-বেশি বৃষ্টি হয়। বছরের বাকি সময়ে তেমন একটা বৃষ্টি হয় না। এখন শ্রাবণ মাস। প্রাকৃতিক নিয়মেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। কোথাও কোথাও বন্যাও দেখা দিয়েছে। তবে ভিন্ন চিত্র উত্তরের তিন জেলায়। ভরা বর্ষাতেই প্রত্যাশিত বৃষ্টির দেখা মিলছে না ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও পঞ্চগড়ে। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণও কমছে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোয়, যার প্রভাব পড়ছে কৃষিতে এবং অনেকটা শঙ্কিত করে তুলেছে কৃষকদের। বৃষ্টির অভাবে এসব অঞ্চলে আমন ধানের চারা রোপণ করতে পারছেন না কৃষক। বৃষ্টিনির্ভর আউশ ধান নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।৷বিপাকে পড়েছেন পাটচাষীরাও।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্থানভেদে ভিন্ন হয়। কিছু অঞ্চলে বছরে দুই হাজার মিলিমিটারের কম, আবার কিছু অঞ্চলে প্রায় চার হাজার মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। সিলেট অঞ্চলে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়। সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত হয় নাটোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও বগুড়া অঞ্চলে। এসব অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ মিলিমিটার। দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে এবং সবচেয়ে কম বৃষ্টি হয় নাটোরের লালপুরে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাষ্পীভবনও বাড়ছে, ফলে বৃষ্টিপাতের তারতম্য দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টিপাতের ধরন ও সময় এলাকাভেদে পাল্টে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে ওইসব এলাকার কৃষি খাতেও।
তেঁতুলিয়া প্রথম শ্রেণী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য বলছে, ২০২০ সালের জুনে ৮২৯ দশমিক ৩ মিলিমিটার রেকর্ড করা হয়। এছাড়া ২০২১, ২২, ২৩, ২৪ সালের জুনে যথাক্রমে ৪২৩, ১০৭২, ৯৫৬ দশমিক ৭, ১ হাজার ১৫১ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সবশেষ চলতি বছরের জুনে ৪৪৯ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ওই বছরগুলোর জুলাইয়ে যথাক্রমে ১ হাজার ১২৮ দশমিক ৫, ৭৮৯, ৪৯১, ৮৩৬ দশমিক ৩, ৭৭৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। চলতি বছরের ১৫ জুলাই পর্যন্ত ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় একেবারেই কম।
কৃষকরা বলছেন, রোপা আমন চাষের ভরা মৌসুম বর্ষাকাল। তবে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার বৃষ্টিপাত কম হয়েছে পঞ্চগড়ে। এজন্য মেশিনে সেচ দিয়ে ধানের বীজতলা তৈরি করতে হচ্ছে। বর্ষায় যেখানে জমি ভিজে থাকার কথা, সেখানে ঘণ্টায় ৩০০ টাকা দিয়ে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে ধান চাষে লাভ তো দূরের কথা, মূলধন ফেরত পাওয়াই কঠিন হয়ে যাবে। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় ফসল উৎপাদন হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাষা ইউনিয়নের হালুয়াপাড়া গ্রামের আমনচাষী কামরুজ্জামান মিলন সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতি বছর আষাঢ় মাসে টানা কয়েকদিন বৃষ্টিপাত হলেও এবার প্রয়োজন অনুযায়ী বৃষ্টি হয়নি। বৃষ্টি কম হওয়ায় বীজতলা শুকিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে বীজতলা নষ্ট হতে পারে।’
তবে পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল মতিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। জুনে টানা কয়েকদিন বৃষ্টি হয়েছে। তবে যখন বৃষ্টির প্রয়োজন ছিল তখন হয়নি। এখন রোপা আমন চাষের সময় বৃষ্টিপাতও তুলনামূলক কম। এ কারণে চাষাবাদ সেচনির্ভর হয়ে পড়ায় খরচও বেড়েছে।’
একই অবস্থা দেখা গেছে দিনাজপুরও। বৃষ্টির অভাবে আগাম জাতের আমন রোপণ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। আগামী এক সপ্তাহে ধান রোপণ করতে না পারলে ওসব জমিতে রবিশস্য উৎপাদন ভালো হবে না। বাধ্য হয়ে ব্যয় বেশি হলেও সেচযন্ত্র দিয়ে আমন রোপণ করছেন তারা।
দিনাজপুর আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা মো. তোফাজ্জল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জুলাইয়ের প্রথমার্ধে দিনাজপুর অঞ্চলে ৪২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা এ সময়ে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। বাকি সময় স্বাভাবিক বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া চলতি বছরে প্রাক-বর্ষায় বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়েছে। জুনে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৩৭৮ মিলিমিটার। জেলার বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৪০০-১৫৫০ মিলিমিটার।’
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আনিসুজ্জামান জানান, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলা কৃষিনির্ভর। আমন ফসল মূলত বৃষ্টিনির্ভর। চলতি মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ৬০ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে আমন রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের ধান চাষ হবে। অন্যান্য সময়ের তুলনায় এ বছর জেলায় বৃষ্টিপাত অনেক কম হয়েছে। যদিও বর্ষার আগে আগাম বৃষ্টি কিছুটা হয়েছে। কিন্তু সেই বৃষ্টি আমন আবাদে কোনো কাজে আসেনি।’
গত বছর জুলাইয়ের শুরুতে কম বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে ঠাকুরগাঁওয়ে। তবে এবার তেমন হয়নি, যার প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদনে। বৃষ্টির অভাবে আমনের চারা রোপণ করতে পারছেন না কৃষক। কেউ কেউ সেচ দিয়ে চারা রোপণ করলেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি খরচ। বৃষ্টিনির্ভর আউশ ধান নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।৷বিপাকে পড়েছেন পাটচাষীরাও। বৃষ্টির অভাবে পাট জাগ দিতে পারছেন না।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কালমেঘ গ্রামের স্কুল শিক্ষক রায়হান দুলু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনাবৃষ্টির কারণে কৃষি খাতে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির অভাবে পাট জাগ দেয়া যাচ্ছে না। পাট শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আমন, আউশ নিয়েও বিপাকে পড়েছি। আগাম ফসলের এবার কি হবে সেই দুশ্চিন্তাও রয়েছে।’
এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁও কৃষি অফিসের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গেল বছরের চেয়ে এবার বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেক কম। যার প্রভাব কৃষিতে পড়ছে। তবে কৃষকরা বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে সেচ দিয়ে আমন আবাদ করছেন। রোপণে দেরি হলে পরে আগাম ফসল ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য বলছে, জেলায় বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৪০০-১৫৫০ মিলিমিটার। গত বছর জুন-জুলাইয়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৩৪৪ মিলিমিটার। এবারে বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৪৪ মিলিমিটার, যা তুলনামূলক অনেক কম। তবে মাসের শেষাংশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময়ে প্রায় ২০০-২৫০ মিলিমিটারের মতো বৃষ্টি হতে পারে।
দিনাজপুর আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘চলতি বছর প্রাক-বর্ষায় বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি ছিল। তবে জুলাইয়ের শুরুতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেক কম। এসব নির্ভর করে সাগরের লঘুচাপের ওপর। তবে মাসের শেষে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত পাওয়া যাবে।’