বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ

প্রতি ছয় লাখে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ একজন, সেবার সিংহভাগ ঢাকাকেন্দ্রিক

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছে।

রাজধানীর শ্যামলীতে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের টিকিট কাউন্টারের সামনে গতকাল সকাল থেকেই দীর্ঘ লাইন। অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে আসা রাহেলা বেগম (ছদ্মনাম)। সঙ্গে ১৪ বছরের কিশোরী মেয়ে। দীর্ঘদিন ধরে তার অস্বাভাবিক আচরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন মা। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করিয়েও সুফল পাননি। পরে কুমিল্লার একটি হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামর্শে মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন। ভোরে বাড়ি থেকে রওনা দিয়ে এখন অপেক্ষা করছেন বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়ার আশায়।

রাহেলা বেগমের মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে ঢাকায় আসছেন বহু মানুষ। কারণ মানসিক রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়েনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সেবা কাঠামো। দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশ এখনো রাজধানীকেন্দ্রিক। ফলে ঢাকার বাইরে চিকিৎসা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা এবং বিশেষজ্ঞের সংকটে ভুগতে হচ্ছে রোগীদের।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর বিপরীতে দেশে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ বা সাইকিয়াট্রিস্টের সংখ্যা মাত্র ৩৫০ জন। অর্থাৎ প্রতি ছয় লাখ মানুষের জন্য দেশে রয়েছেন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। শুধু চিকিৎসকই নন; মনোবিজ্ঞানী, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রশিক্ষিত নার্স ও অন্যান্য পেশাজীবীরও রয়েছে ঘাটতি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার অসম বণ্টনও দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম বড় সংকট। ঢাকায় বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ তুলনামূলক বেশি হলেও দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে সেই সুযোগ সীমিত। ফলে রোগ শনাক্ত হওয়ার পরও অনেকে চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক নেতিবাচক ধারণা, চিকিৎসা সম্পর্কে অসচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা।

রাহেলা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়ে গত দেড় বছর ধরে অস্বাভাবিক আচরণ করছে। প্রথমে গ্রামের এক হুজুরের কাছে নিয়েছিলাম। কিন্তু তাতে অবস্থার আরো অবনতি হয়। পরে কুমিল্লার একটি হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানেও আশানুরূপ ফল পাইনি। সেখানকার এক চিকিৎসক ঢাকায় নিয়ে আসতে বলেন। তাই নিয়ে এসেছি।’

আজ ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘জীবনের গল্প শুনি; বাস্তবিক পরিবর্তন আনি’। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিপাদ্যের তাৎপর্য বাস্তবায়নে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার পরিধি সম্প্রসারণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং ঢাকার বাইরে সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিনির্ধারণ করা গেলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরো সহজলভ্য ও কার্যকর করা সম্ভব হবে। যদিও দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় জনবলের ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।

এসব তথ্য অনুযায়ী, দেশে মনোবিজ্ঞানীর সংখ্যা ছিল ৫৬৫ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষায়িত নার্স ছিলেন ৭০০ জন। প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মনোবিজ্ঞানীর সংখ্যা দশমিক ৩৪ এবং বিশেষায়িত নার্সের সংখ্যা দশমিক চারজন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত সমাজকর্মীর সংখ্যা ছিল মাত্র তিনজন। এসব পেশাজীবীর অধিকাংশই বড় শহরগুলোয় কর্মরত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়নেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে জনবলের ঘাটতি ও ভৌগোলিক বৈষম্যকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য শয্যার ঘনত্ব দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি। ফলে রাজধানীর বাইরে বসবাসকারী রোগীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা পাওয়া তুলনামূলক কঠিন।

দেশে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার দুটি প্রধান বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হলো ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং পাবনা মানসিক হাসপাতাল। উভয় প্রতিষ্ঠানেরই শয্যা সংখ্যা ৫০০ করে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পদের বিপরীতে জনবল সংকট রয়েছে। ফলে রোগীর চাহিদা অনুযায়ী সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

এছাড়া দেশের ৫৬টি সরকারি হাসপাতালে মানসিক রোগের বহির্বিভাগীয় চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে। তবে এসব কেন্দ্রে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত জনবল ও ওষুধের প্রাপ্যতা নিয়েও ঘাটতির কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন মূল্যায়নে। বিশেষায়িত সেবা ও পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় অনেক রোগীকে নিজ জেলা ছেড়ে বড় শহরে যেতে হয়। এতে চিকিৎসার ব্যয় বাড়ে, সময় নষ্ট হয় এবং নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট উম্মে সাঈমা সিদ্দিকা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের বিভাগে আগে প্রতি বছর ১১-১৪ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হলেও এখন তা বাড়িয়ে ৩০ জন করা হচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে। মানসিক স্বাস্থ্য অ্যাম্বাসেডর তৈরির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে মানসিক সমস্যার লক্ষণ শনাক্ত করা, আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় সেবা নেয়ার সঠিক জায়গা সম্পর্কে জানানো হচ্ছে। এতে সীমিত জনবল নিয়েও আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রাথমিক সহায়তা দেয়া সম্ভব।’

মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয়ার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। কারণ যারা নিজেরা এ সমস্যার মধ্য দিয়ে যাননি, তারা অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তির কষ্ট ও সমস্যার গভীরতা বুঝতে পারেন না।’

দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ব্যাপকতা থাকলেও চিকিৎসা নিচ্ছেন অল্পসংখ্যক মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক মানসিক রোগীদের মাত্র ৭ দশমিক ৭ শতাংশ চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। অর্থাৎ ৯২ দশমিক ৩ শতাংশই থাকছেন চিকিৎসার বাইরে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে এখনো অনেক ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে নেতিবাচক চোখে দেখা হয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যরা সমস্যা প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করেন। কেউ কেউ চিকিৎসার পরিবর্তে প্রচলিত সামাজিক বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করেন। আবার চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হলেও কাছাকাছি বিশেষজ্ঞ না থাকা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেককে নিরুৎসাহিত করে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সরদার আতিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। বর্তমানে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজে এ বিষয়ে কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বাড়ানো হচ্ছে শিক্ষার্থী সংখ্যাও। পাশাপাশি ফেলোশিপ ও এফসিপিএস প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি হচ্ছেন।’

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি রোগীদের অভিজ্ঞতা ও চাহিদাকে গুরুত্ব দেয়াও জরুরি বলে মনে করেন তিনি। ডা. সরদার আতিক বলেন, ‘এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্যের মূল কথাও রোগীদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয়া। রোগীরা তাদের অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন। কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন এবং কোন ধরনের সেবা তাদের উপকারে আসে, তা শুনে নীতিনির্ধারকরা সেবার পরিকল্পনা ও উন্নয়ন করবেন। অর্থাৎ শুধু বিশেষজ্ঞদের চিন্তাভাবনার ওপর নির্ভর না করে রোগীদের অভিজ্ঞতা ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলতে হবে।’

আরও