বেশির ভাগ বিশ্লেষকের বিশ্বাস, দীর্ঘমেয়াদি একটি গন্তব্যে পথচলা শুরু করেছে দেশের শেয়ারবাজার। শেয়ারদরের ওঠানামা, সূচকের উত্থান আর স্টক এক্সচেঞ্জের দৈনিক লেনদেন বাড়তে দেখে সবাই আবার শেয়ারবাজারের দিকে তাকাতে শুরু করেছেন। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য তহবিল খুঁজছেন তাদের একটি বড় অংশ। ঝুঁকি গ্রহণে ইচ্ছুক এক দল বিনিয়োগকারী আবার মার্জিন ঋণ নিয়ে হলেও বাজার থেকে বড় মুনাফার পরিকল্পনা করছেন। সব ঠিকঠাক থাকলে এ লিভারেজ বিনিয়োগকারীর রিটার্ন বাড়াতে সক্ষম। আবার প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মার্জিন ঋণই হয়ে যায় গলার কাঁটা। ২০১০ সালের ধাক্কা এখনো সামলে উঠতে পারেননি মার্জিন ঋণ নেয়া ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ। ভোগান্তি যায়নি অনেক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানেরও। ঋণাত্মক বিও হিসাবগুলোকে স্বাভাবিক লেনদেনে ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম প্রায় এক দশক পরও অব্যাহত রয়েছে। তার পরও মার্জিন ঋণের আবেদন কমে যায় না। কারণ মার্জিন ঋণের সতর্ক ব্যবহার অনুকূল বাজারে একজন বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীকে ভালো মুনাফা এনে দিতে পারে—
বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস বলেছিলেন, আমাকে একটি যথেষ্ট লম্বা লিভার আর এটিকে বসানোর জন্য একটি শক্ত ফালক্রাম দাও। আমি পুরো বিশ্বটাকেই নাড়াতে পারব। স্কুলের পদার্থবিদ্যা বইয়ে আমরা পড়েছি অল্প বল প্রয়োগ করে লিভারের সাহায্যে আরো বেশি কাজ আদায় করে নেয়া যায়। ব্যবসা পরিচালনা বা বিনিয়োগে বাড়তি মুনাফা এনে দিতে ঋণও একই ভূমিকা পালন করে। ঋণের ব্যবহারকে তাই লিভারেজ বলা হয়। নিখাদ পদার্থবিদ্যা বলেই আর্কিমিডিসের আত্মবিশ্বাসের অসম্মান হয়নি। তবে ব্যবসা বা সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে লিভারের ব্যবহার নিয়ে এত আত্মবিশ্বাস দেখানোর সুযোগ নেই। কারণ, এখানে অনিশ্চয়তা নামের একটি বিষয় চিরকালই অত্যন্ত প্রভাবশালী।
লিভারেজ
ইনভেস্টোপিডিয়া বলছে, বিনিয়োগে লিভারেজ মানে ধার করা মূলধন বিনিয়োগ করা। আমেরিকায় ব্যবসা সম্প্রসারণে ঋণের অর্থ বিনিয়োগ করাকে লিভারেজ বলা হয়, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় যেটিকে গিয়ারিংও বলা হয়। অন্যদিকে সিকিউরিটিজ, ডেরিভেটিভস বা অপশন্সে পোর্টফোলিও বিনিয়োগের সময় নিজের মূলধনের পাশাপাশি ব্রোকারের কাছ থেকে নেয়া ঋণকে মার্জিন বলা হয়।
আমরাও বুঝি ব্যবসায় লাভ হলে ঋণ ভালো জিনিস আর লোকসান হলে ঋণ বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তবুও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সময় এক পর্যায়ে আমরা মার্জিন ব্যবহারে আগ্রাসী হয়ে উঠি। নিঃসন্দেহে মার্জিন ঋণের সুফলপ্রাপ্তির উদাহরণগুলোই এর মূল কারণ।
ধরুন, আপনি নিজের ১ লাখ টাকা পুঁজি দিয়ে ১০০ টাকা দরে একটি কোম্পানির এক হাজার শেয়ার কিনলেন। এক বছর পর প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়ে হলো ১৪০ টাকা। আপনার মুনাফা ৪০ হাজার টাকা।
অন্যদিকে আপনার বন্ধু বিও অ্যাকাউন্ট খোলার সময় মার্জিন ঋণ নেয়ার জন্য ব্রোকারের সঙ্গে একটি চুক্তিপত্রে সই করেছিল। বাংলাদেশে রেগুলেটরি অনুমোদন অনুসারে তিনি নিজ মূলধনের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ মার্জিন ঋণ নিতে পারবেন। একই মূলধনের মালিক হয়েও তিনি আরো ৫০ শতাংশ বেশি শেয়ার কিনতে পারেন। অতিরিক্ত ৫০০টি শেয়ার কেনার জন্য ৫০ হাজার টাকা তিনি ব্রোকারের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে পেয়েছেন। একই কোম্পানির দেড় হাজার শেয়ারে তার মুনাফা হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। বছর শেষে ৫০ হাজার টাকা মার্জিন ঋণের বিপরীতে বার্ষিক ১২-১৪ শতাংশ হারে তিনি ব্রোকারকে ৬-৭ হাজার টাকা সুদ দিয়েছেন। তার পরও মার্জিন তাকে ১৩-১৪ হাজার টাকার অতিরিক্ত মুনাফা এনে দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সহজলভ্য এ ঋণ অন্যদের মতো আপনাকেও আকর্ষণ করবে। আপনিও বন্ধুর মতো মার্জিন অ্যাকাউন্ট খুললেন। ঋণ নিয়ে শেয়ার লেনদেন শুরু করলেন। মুনাফা হতে থাকল। আপনার আত্মবিশ্বাসও বাড়তে থাকল।
এতটুকু পর্যন্ত গল্পটি চমত্কার। কিন্তু বাস্তবতা এত মসৃণ নয়। বাস্তবে শেয়ারবাজারে মুনাফা যেমন হয়, লোকসানও হয়। সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও এক শেয়ারের দাম নিম্নমুখী থাকে, অন্য শেয়ারের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকে। আবার কিছু শেয়ারের দাম নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকে। এ সত্য সব মেয়াদি চিত্রপটেই প্রযোজ্য। আর বাজার নিম্নমুখী থাকলে বেশির ভাগ শেয়ারের দামই কমতে থাকে।
মার্জিন ঋণ তখনই কাজে আসে, যখন তা দিয়ে কেনা শেয়ারের দাম বাড়ে। দাম না বাড়লে সুদটুকু আপনার বাড়তি ব্যয়। আর দাম কমলে মুনাফার বদলে আপনি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি লোকসান করবেন।
উপরের উদাহরণে ১০০ টাকা দরে কেনা শেয়ারগুলোর দাম কমে ৮০ টাকায় নেমে এলে আপনার লোকসান হবে ২০ হাজার টাকা। আপনার মূলধন কমল ২০ শতাংশ। কিন্তু মার্জিন ঋণ নিয়ে আপনার বন্ধুর কেনা দেড় হাজার শেয়ারে লোকসান হবে ৩০ হাজার টাকা। ব্রোকার এ লোকসান বহন করবেন না। সুতরাং পুরো ৩০ হাজার টাকাই আাাপনার বন্ধুর লোকসান। তার মূলধন কমেছে ৩০ শতাংশ, যেখানে দরপতন হয়েছে ২০ শতাংশ। বছর শেষে আপনার বন্ধু ৬-৭ হাজার টাকা সুদ গুনবে। তার নিট লোকসান ৩৬ শতাংশ।
মার্জিন ঋণ কে নেবেন?
মার্জিন ঋণ তিনিই নেবেন, যিনি এর ব্যবহার থেকে লাভবান হওয়ার যোগ্য। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এ যোগ্যতার মানদণ্ড কী?
উত্তর হলো, পরম কোনো মানদণ্ড নেই। শেয়ারবাজারের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি নিশ্চয়তা দিতে পারেননি, তিনি লোকসান করবেন না। তবে কতটা ঝুঁকি নিলে, কতটুকু লোকসান বহন করলে তিনি টিকে থাকতে পারবেন, পরবর্তী সুযোগের অপেক্ষা করতে পারবেন, তা জানা মানুষগুলোই লাভবান হওয়ার যোগ্য। মোটা দাগে যোগ্যতার মানদণ্ডগুলো এমন—
ভ্যালু বোঝা: পরিসংখ্যান বলে, চাঙ্গা বাজারে কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ শেয়ারের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকে। বাজারের ট্রেন্ড বহু শেয়ারের দাম এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যা কোম্পানির মৌলভিত্তি সমর্থিত নয়। আজ হোক, কাল হোক সেগুলোর দর সংশোধন হবেই। সেটি এক দশক পরও হতে পারে, এক মাস পরও হতে পারে। তবে একজন বিচক্ষণ বিনিয়োগকারী জানেন, তার পোর্টফোলিওতে থাকা শেয়ারটির ভ্যালু কত। আমাদের অন্তত মোটা দাগে এটি কী মাত্রায় অতিমূল্যায়িত বা অবমূল্যায়িত এ ধারণাটুকু রাখতেই হবে।
বাজারের গতিবিধি বোঝা: মার্জিন ঋণ নিয়ে আমরা শেয়ার কিনি বাড়তি মূলধনি মুনাফার জন্য। অবমূল্যায়িত শেয়ারের দামও যদি বছরের পর বছর নিম্নমুখী থাকে, তাহলে মার্জিন ঋণ আপনার লোকসানের বোঝা বড় করতে থাকে। এমনও হতে পারে, দরপতনের মাত্রা চরমে ঠেকলে মার্জিন ঋণের টাকা ফেরত পেতে ব্রোকার আপনার সব শেয়ার বিক্রি করে দিতে পারে। নিজের তহবিলের নিরাপত্তায় এটি করার অধিকার আছে তার।
২০০৮ সালে মার্জিন অ্যাকাউন্টে কেনা ব্যাংকিং খাতের শেয়ারগুলোর দর কমে যাওয়ায় ২০০৯ সালের প্রথমার্ধের সংশোধনে ফোর্সড সেলের শিকার হওয়া বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারীকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি, যারা আর এক বছর টিকে থাকলে অন্তত দ্বিগুণ মুনাফার মুখ দেখতেন। অবশ্য ২০১০ সালের ডিসেম্বরেও তারা পজিশন ক্লোজ করতেন, এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
ভালো কোম্পানির শেয়ারও নিছক প্রতিকূল বাজার পরিস্থিতির কারণে মার্জিন ঋণ গ্রাহককে বড় শাস্তি দিতে পারে। আবার অতিমূল্যায়িত শেয়ারও নিছক ট্রেন্ডের জোরে আরো অতিমূল্যায়িত হতে পারে। মার্জিন ঋণ নিয়ে কেনা শেয়ারগুলো তার আগে ছেড়ে দিলে আপনি বড় মুনাফা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এজন্য ভ্যালুর পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতিও বুঝতে হয়।
বিশ্বের শেয়ারবাজারগুলোয় মার্জিন ঋণের সফল ব্যবহার পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, মূল ট্রেন্ডের সমান্তরালে নেয়া পজিশনগুলোতেই মার্জিন ঋণ ব্যবহার করেন বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীরা। শনাক্ত করা যায় এমন ট্রেন্ডে মার্জিন ঋণ তাদের কিছু বাড়তি পজিশন যোগ করতে সাহায্য করে। দরবৃদ্ধি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে তারা অন্তত মার্জিনে কেনা শেয়ারগুলো ছেড়ে দেন।
এক কথায় বলে দেয়া যায়, বাজারের গতিবিধির খুঁটিনাটি না বুঝে মার্জিন ঋণের ব্যবহার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এজন্য টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিসে দক্ষতা অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে অন্তত ঠিক উল্টো সময়ে শেয়ার কেনা বা বেচার ভুলটি করার সময় আমরা মার্জিন ঋণ নেয়ার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেব না।
পরিমিতিবোধ: ওয়াল স্ট্রিটের ইতিহাসে অনেক দক্ষ ফান্ড ম্যানেজার দেখা গেছে, যারা ভ্যালু, বাজারের গতিবিধি, নেপথ্যে ঘটতে থাকা বড় ঘটনা সব কিছুই ভালো জানতেন। পরিমিতিবোধ নিয়ে ভালোই মুনাফা হচ্ছিল। তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ছিল। এক পর্যায়ে অতি আত্মবিশ্বাস তাদের মার্জিন ব্যবহারে আগ্রাসী করে তোলে। মুনাফা বহু গুণীতকে বাড়াতে গিয়ে এক পর্যায়ে বড় বিপর্যয়ের শিকার হন তাদের অনেকে।
২০১০ সালে বার্কশায়ারের শেয়ারহোল্ডারস লেটারে ওয়ারেন বাফেট লিখেছিলেন, ‘কাজে লাগাতে পারলে লিভারেজ আপনার গেইন অনেক বাড়িয়ে দেয়। স্ত্রী/স্বামী বিশ্বাস করে, আপনি খুব বুদ্ধিমান। প্রতিবেশীরা আপনাকে ঈর্ষা করতে শুরু করে।’ কিন্তু সমস্যা হলো ‘লিভারেজ একটি আসক্তি। এর আশ্চর্য শক্তিতে একবার লাভবান হলে খুব কম মানুষই রক্ষণশীল চর্চায় ফিরে আসতে পারে।’
ইতিহাসের সবচেয়ে সফল বিনিয়োগকারী বাফেট এ পরিমিতিবোধটির কথাই বলতে চেয়েছেন।
শৃঙ্খলা: পুঁজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মুনাফা করার জন্য কোনো শেয়ারে পজিশন নেয়া, সেটি হোল্ড করা, পজিশন ক্লোজ করতে বিক্রি করে দেয়া— প্রতিটির জন্যই নির্দিষ্ট নিয়মকানুন রয়েছে। বিনিয়োগ কিংবা ট্রেডিং উভয় ক্ষেত্রেই সফলদের এন্ট্রি, হোল্ডিং আর এক্সিটের নিজস্ব সেট অব রুলস থাকে। কোন মুহূর্তে কোন শেয়ারে মূলধনের কতটা বিনিয়োগ করা উচিত, কখন কতটা তুলে নেয়া উচিত এগুলো তাদের মানি ম্যানেজমেন্টের বিদ্যা। এর মধ্য দিয়ে তারা মুনাফা বঞ্চনা ও লোকসান দুটোর ঝুঁকিই নিয়ন্ত্রণ করেন।
বিভিন্ন স্টাডিতে প্রমাণিত, একই রুলস, একই তথ্যভাণ্ডার নিয়ে ১০ জন ব্যক্তি কোনো বাজারে নামার পর নিছক মানি ম্যানেজমেন্টের কারণে বছর শেষে তাদের রিটার্ন পারফরম্যান্সে বড় বড় ব্যবধান দেখা যায়। আবার সেট অব রুলস থেকে বিচ্যুত হয়ে শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে বড় লোকসান নিয়েও বাড়ি ফিরেছেন কেউ কেউ।
বিনিয়োগ ও ট্রেডিং শিক্ষার ওয়েবসাইটগুলোয় নিয়মিত ঢুঁ মারলেও এসবের মৌলিক দিকগুলো সহজেই শেখা যায়। এর সঙ্গে ধীরে ধীরে ওয়াল স্ট্রিটে সুপরিচিত বিষয়ভিত্তিক বইগুলোও পড়ার অভ্যেস করতে হবে। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পজিশনের আকার নির্ধারণের কৌশল সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যাবে সংকেতের পূর্ববর্তী কোনো সংখ্যায় প্রকাশিত ‘শেয়ারবাজারে পিরামিড ট্রেডিং’ নিবন্ধে।
বিগ পিকচার: ইতিহাসের সবচেয়ে সফল বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি টার্নিং পয়েন্টগুলোয় কম-বেশি মাত্রায় সঠিক অবস্থানে ছিলেন। কেউ প্রো-অ্যাকটিভ, কেউ রি-অ্যাকটিভ।
ধরুন, তিন বছরের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় আপনি মার্জিন ঋণ নিয়ে আপনার মূলধন দ্বিগুণ করে ফেলেছেন। এরপর বাজার একটি তীব্র সংশোধন পর্বে প্রবেশ করল, যেটি এক পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমুখিতায় পরিণত হলো। এদিকে আগের তিন বছরের অভিজ্ঞতায় আপনি আশা করছেন, সাময়িক সংশোধন শেষে আবার বাজার ঘুরে দাঁড়াবে। পুরো পজিশন নিয়ে আপনি পুনরুত্থানের অপেক্ষায় রইলেন, সেসঙ্গে মার্জিন ঋণের বোঝাও। এমনও তো হতে পারে— ব্রোকার আপনার কাছ থেকে মার্জিন ঋণটুকু ফেরত নেয়ার জন্য ফোর্সড সেল দিয়ে দিল।
এজন্যই বাজারে নিত্যদিনের লাভ-লোকসান, হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয়গুলো পর্যালোচনা করতে আমরা যতটুকু সময় ব্যয় করি, এর চেয়ে ১ মিনিট হলেও বেশি ব্যয় করতে হবে বিগ পিকচার অনুসন্ধানে। এটুকু হলেই আমরা বুঝে যাব, কখন মার্জিন ঋণ নেয়ার সুযোগ আছে আর কখন পোর্টফোলিওতে একটি শেয়ারও রাখা যাবে না।
সামষ্টিক অর্থনীতি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ইন্ডাস্ট্রি রিপোর্ট, ইন্ডাস্ট্রি লিডারদের ব্যবসা পর্যালোচনা, বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মুভমেন্ট— সবই বিগ পিকচার পর্যালোচনার অংশ। বর্তমান ঘটনাগুলোর সঠিক ব্যাখ্যার জন্য শিখতে হবে ইতিহাস থেকে। বিহেভিয়ারাল ফিন্যান্সের শিক্ষা সর্বজনীন বলেই বিশ্বাস করেন বিজ্ঞজনরা।
মার্জিন ঋণের সামষ্টিক আউটপুট
২০১০ সালের শেয়ারহোল্ডারস লেটারে বাফেট বলেছিলেন, ‘স্কুলে শেখা সত্যগুলো অনেকে ২০০৮ সালে এসে আবার শিখেছে। লিভারেজ মানে ধনাত্মক সংখ্যার আকর্ষণীয় সব সিরিজ। তবে একটি মাত্র শূন্য দিয়ে গুণ করলেই সব উবে যায়।’ শেয়ারবাজারে আমরা ধরে নিতে পারি, এ শূন্যটি হলো অনিয়ন্ত্রিত লোকসান।
‘ইতিহাস আমাদের বলে লিভারেজ প্রায়ই শেষ পর্যন্ত শূন্যেরই জন্ম দেয়, তা যত স্মার্ট লোকজন কর্তৃকই প্রযুক্ত হোক না কেন’। সামষ্টিক পরিসরে তার কথাটি কত প্রাসঙ্গিক, তা বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে সৃষ্ট বাবল আর সমসাময়িক লিভারেজের মাত্রা পর্যালোচনা করলেই দেখা যায়।
ওয়ারেন বাফেট তার শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে লিভারেজকে সঠিকভাবেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তার পরও তার এ দৃষ্টিভঙ্গিকে ওয়াল স্ট্রিটের অনেক ফান্ড ম্যানেজার রক্ষণাত্মক বলে সমালোচনা করেছেন। তারা যুক্তি দেখান, মার্জিন ঋণ বাজারে লিকুইডিটি বাড়াতে সহায়ক, ঝুঁকি গ্রহণে সক্ষম ও আগ্রহীদের জন্য সম্পদ সৃষ্টির সুযোগ ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এ ঋণ ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক স্তরে কতটা ভয়ানক হতে পারে, তার মাত্রা সম্পর্কে দ্বিমত করেন না কেউই। কারণ মন্দা চলাকালে প্রকাশিত উপাত্তগুলো তো আর কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের জন্য প্রকাশ হয় না। দেশের শেয়ারবাজারে ২০১০ সালের ধসের প্রায় এক দশক হয়ে গেল। এখনো সুদ মওকুফ করে, গ্রেস দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিও হিসাবগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে যেতে হচ্ছে নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রকদের।
তার পরও ফিন্যান্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রির অনেক প্রশিক্ষক তাদের অনুসারীদের বলে থাকেন, সঠিক সময়ে মার্জিন ঋণ ব্যবহার করে মুনাফা করুন। প্রতিকূল পরিস্থিতি আঁচ করতে পারলেই তা থেকে সরে আসুন। অনুকূল অবস্থা নিয়ে সুনিশ্চিত থাকতে না পারলেও মার্জিনে কেনা শেয়ারগুলো ছেড়ে দিয়ে ঝুঁকিমুক্ত থাকুন।
বাস্তবতা হলো, প্রশিক্ষকরা হাঁ বলুক আর না বলুক, বাজারে একদল মানুষের কাছে মার্জিন ঋণের আবেদন অনেক, বিশেষ করে যখন বাজার থেকে মুনাফা আসতে থাকে। তাদের মধ্যে হাতে গোনা মানুষ ঝুঁকি ও সম্ভাবনার অংক কষে সময়ে আগ্রাসী হন, আর অসময়ে রক্ষণাত্মক হন। সাধারণ মানুষের মধ্যে এ পরিমিতিবোধ বিরল, যেমনটি বাফেট বলেছিলেন।
রেড সিগনাল
অজ্ঞতা আর মার্জিন ঋণ: বিনিয়োগের খুঁটিনাটি আর বাজারের গন্তব্য— কোনো কিছুই না বুঝে মার্জিন ঋণ নেয়াকে বুলেটের সামনে বুক পেতে দেয়ার সঙ্গে তুলনা করলেও ভুল হবে না।
প্রারম্ভিক মূলধনের নিরাপত্তা: সবচেয়ে সফল বিনিয়োগকারীরা বলে থাকেন, শেয়ারবাজারে প্রারম্ভিক মূলধনের নিরাপত্তাই এক নম্বর কাজ, মুনাফা করা নয়। মার্জিন ঋণ নিয়ে সেসব পজিশনই নেয়ার সুযোগ আছে, যেগুলোয় ব্যর্থ হলে আপনার অর্জিত মুনাফা থেকে কিছুটা চলে যাবে, মূলধন নয়।
প্রযুক্ত আর সংরক্ষিত ক্রয়ক্ষমতা: ক্রয়ক্ষমতার প্রয়োগ করে ফেললেন, বাজার অনুকূল পথে হাঁটতে থাকল, আপনি লাভবান হলেন। অন্যদিকে ক্রয়ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রয়োগের পর পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে গেলে তখন বোঝা যায়, কিছু ক্রয়ক্ষমতা রিজার্ভে তুলে রাখা কত ভালো কাজ।
দেশের শেয়ারবাজারে ব্যক্তিশ্রেণীর মার্জিন ঋণ গ্রাহকদের মধ্যে জরিপ চালালে দেখা যাবে, তাদের সিংহভাগই মার্জিন ঋণের সর্বোচ্চটুকু ব্যবহারের তাড়না অনুভব করেন। এক কথায় বলে দেয়া যায়, এর মূল কারণ, তিনি শুধু মুনাফারই হিসাব-নিকাশ করছেন। ঝুঁকি বলে কিছু তার চিন্তাজগতেই নেই। আবার বর্তমান বিনিয়োগের চেয়ে ভালো কোনো সুযোগ সামনে চলে আসতে পারে— এটিও তার ভাবনায় নেই।
ট্রেডিংয়ে সফলদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা জানব, মার্জিন ঋণ সারা বছরের জন্য নয়। সব মৌসুমের জন্য নয়। বরং বাজারে বড় প্রাইস মুভমেন্ট সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী হলেই কেবল এ ঋণ ব্যবহার করা উচিত। এ আত্মবিশ্বাসও আবার জ্ঞান, দক্ষতা, সাফল্যের ট্র্যাক রেকর্ড আর বিচক্ষণতা সমর্থিত হতে হবে।