এ প্রাণীকে এ ভূখণ্ডে এর আগে কেউই দেখেনি। সম্রাট প্রাণীটিকে দেখে এত বিস্মিত ও চমৎকৃত হন যে তার সভার সবচেয়ে গুণী শিল্পী মনসুরকে আদেশ দেন এ প্রাণীর একটি চিত্রকর্ম তৈরি করতে। মনসুর তার প্রতিভাবলে সেই বিরল প্রাণীটিকে (জেব্রা চিত্রকর্ম) রঙতুলির মাধ্যমে তার ক্যানভাসে উপস্থাপন করেন, যা আজও মোগল শাসনামলের চিত্রকর্মের উৎকর্ষকে প্রতিফলিত করে।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজসভার এ চিত্রশিল্পী মনসুরের প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে জানার তেমন কোনো উৎস পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয়, তিনি পারস্য বা মধ্য এশীয় বংশোদ্ভূত ছিলেন। তার প্রকৃত নাম মির্জা ওস্তাদ মনসুর নকশ-বাসি। নকশ-বাসি অর্থ প্রধান চিত্রকর। ১৫৯০ থেকে ১৬২৪ সাল পর্যন্ত তার কর্মজীবনের সক্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। সম্রাট আকবরের শাসনামলেই তিনি মোগল রাজকর্মচারী হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। সম্রাট আকবরের জীবনীভিত্তিক গ্রন্থ ‘আকবরনামা’য় যুদ্ধ ও শিকারের বর্ণনায় যেসব চিত্র ব্যবহৃত হয়েছে তার অধিকাংশই ওস্তাদ মনসুরের আঁকা। তবে সম্রাট আকবরের শাসনামলে তিনি সম্রাটের সুদৃষ্টি অর্জন করতে সক্ষম না হলেও সম্রাট জাহাঙ্গীরকে তিনি তার প্রতিভার দ্বারা বিমুগ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গকে রঙতুলিতে জীবন্ত করে তোলার অতুলনীয় দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ সম্রাট জাহাঙ্গীর তাকে ‘নাদির আল আসর’ অর্থাৎ ‘যুগের বিস্ময়’ উপাধিতে ভূষিত করে।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় শিল্প ও সংস্কৃতির উন্নতি হয়। তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন বহু শিল্পীকে। ফলে সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে মোগল চিত্রশিল্প এক অনন্য মাত্রায় পৌঁছে। শিল্প বিশেষজ্ঞ আনন্দ কুমারস্বামী জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালকে মোগল চিত্রকলার ইতিহাসে ‘সুবর্ণ যুগ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার সময়েই যুদ্ধ ও দরবারের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দৃশ্য অঙ্কনের প্রচলন দেখা যায়। তিনি বিরল প্রাণী, পাখি ও উদ্ভিদ সংগ্রহ করতেন এবং সেগুলোকে নিখুঁতভাবে অঙ্কনের জন্য মনসুরকে দায়িত্ব দিতেন।
মনসুর তার পৃষ্ঠপোষকের সরাসরি নির্দেশে প্রাকৃতিক জীবন নিয়ে বহু অধ্যয়ন করেছিলেন। মনসুরের শিল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। তিনি কেবল প্রাণীর বাহ্যিক রূপ আঁকতেন না; বরং তার পালকের বিন্যাস, চোখের দীপ্তি, ঠোঁটের গঠন, দেহের অনুপাত এবং স্বাভাবিক ভঙ্গিমা পর্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরতেন। ফলে তার চিত্রগুলোতে শিল্প ও বাস্তবতা একাকার হয়ে গেছে। অনেক গবেষকের মতে, আধুনিক বৈজ্ঞানিক অঙ্কনের আবির্ভাবের বহু আগেই মনসুর প্রকৃতিকে এমনভাবে লিপিবদ্ধ করেছিলেন, যা আজও বিস্ময় জাগায়।
ওস্তাদ মনসুরের সবচেয়ে প্রশংসিত চিত্রকর্মটি হলো লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারের রয়্যাল গ্যালারিতে সংরক্ষিত ‘গিরগিটি’র চিত্রকর্ম। ধারণা করা হয়, আনুমানিক ১৬১২ সালের দিকে এটি সম্পূর্ণ হয়। এ চিত্রে তিনি জলরঙ ও কালির সূক্ষ্ম ব্যবহারের মাধ্যমে গিরগিটির রঙ পরিবর্তনের ক্ষমতাকেও তুলে ধরেছেন।
কাগজের ওপর অস্বচ্ছ জলরঙ দিয়ে আঁকা মনসুরের আরেকটি চিত্রকর্ম হলো ‘টার্কি মোরগ’। ১৬১২ সালে গোয়া থেকে সম্রাটের জন্য আনা হয়েছিল এ মোরগটিকে। মনসুর মোরগটিকে এমন একটি কোণ থেকে এঁকেছিলেন যাতে মোরগটির তিন-চতুর্থাংশই চিত্রায়িত হয়েছে প্রতীয়মান হয়। রঙের সূক্ষ্ম প্রলেপের মাধ্যমে মোরগটির পালকের রামধনুর রঙের আভা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া মোরগের গলার ঝুলন্ত মাংসপিণ্ড এবং ছড়িয়ে থাকা পালকের নিখুঁত নকশা সবই স্পষ্ট চিত্রায়িত করা হয়েছে।
সম্রাট কোথাও ভ্রমণে গেলে সঙ্গী হিসেবে ওস্তাদ মনসুরকেও নিয়ে যেতেন যেন ভ্রমণকালে অনিন্দ্য কোনো কিছু লক্ষ করলেই তা মনসুরকে দিয়ে আঁকিয়ে নিতে পারেন। সম্রাট তার কাশ্মীর ভ্রমণেও মনসুরকে সঙ্গী করে নিয়ে যান। সেই ভ্রমণে মনসুর প্রায় ১০০টিরও বেশি স্থানীয় কাশ্মীরী ফুল চিত্রায়িত করেন। কাশ্মীর উপত্যকার বিভিন্ন ফুলের জাত যেমন গোলাপ, জুঁই ইত্যাদি। তন্মধ্যে একটি চিত্রে টিউলিপ ফুলকে চিত্রায়িত করা হয়েছে যেখানে একটি ডাঁটা ও পাতাসহ একটি মাত্র লাল টিউলিপ। টিউলিপের পাপড়ির স্বচ্ছতা ও শরীরবিন্যাসকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যাতে এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।
মনসুরের অঙ্কন করা এক অনবদ্য সৃষ্টি হলো তার জেব্রা চিত্রকর্মটি, যা প্রায় ১৮ দশমিক ৩ সেন্টিমিটার বাই ২৪ সেন্টিমিটার পরিমাপের কাগজে আঁকা একটি স্বাক্ষরিত অস্বচ্ছ জলরঙ ও সোনার কাজ করা চিত্রকর্ম। ইথিওপিয়া থেকে সম্রাটের জন্য উপহার হিসেবে আনা হয়েছিল এ জেব্রা। চিত্রকর্মে দাঁড়িয়ে থাকা জেব্রাটির একটি পাশ থেকে তার শারীরবৃত্তীয় নির্ভুলতা বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন পুরুত্ব ও ব্যবধানে সাদা-কালো ডোরাকাটা দাগ অত্যন্ত যত্ন সহকারে আঁকা হয়েছে। এ চিত্রটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ভারতীয় শিল্পে এটিই ছিল জেব্রার প্রথম চিত্রায়ণ।
পারস্যের শাহ আব্বাস মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরকে একটি বাজপাখি উপহার দিয়েছিলেন। সম্রাট এ উপহারকেও নথিবদ্ধ করেন মনসুরের ক্যানভাসে। মনসুর বাজপাখিটির স্থির ভঙ্গি ও পালকের বিস্তারিত বিবরণ ফুটিয়ে তোলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টে রক্ষিত আছে আরেকটি মোগল চিত্রকর্ম, যার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ওস্তাদ মনসুরের কাজ বলেই ধরে নেয়া হয়। চিত্রটিতে এক জোড়া ময়ূরকে গতিশীল অবস্থায় দেখানো হয়েছে। ময়ূরের পেখমের গাঢ় নীল ও উজ্জ্বল সবুজ রঙের ব্যবহার এবং পেখমে থাকা চোখ আকৃতির নকশার নান্দনিকতা একে আরো অনন্য করে তোলে।
কালের গহ্বরে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ডোডো পাখির চিত্রও অঙ্কন করেছেন ওস্তাদ মনসুর। আনুমানিক ১৬২০ সালের দিকে এটি চিত্রিত হয়। এছাড়া সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতিকৃতি, সংগীতশিল্পী নৌবত খানের প্রতিকৃতি, সাইবেরিয়ান সারস, উটপাখি, নীলগাই, হিমালয়ের চিতাবাঘ, নীলকণ্ঠ পাখিও মনসুরের তুলিতে প্রাণ পেয়েছিল। ওস্তাদ মনসুরের আঁকা উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের বাস্তব চিত্রণ পরবর্তী প্রজন্মের মোগল শিল্পীদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
মনসুরের শিল্পকর্মগুলো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংগ্রহশালায় আজও সংরক্ষিত রয়েছে। লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, যুক্তরাষ্ট্রের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট, ডাবলিনের চেস্টার বিটি মিউজিয়ামের সংগ্রহশালায় মোগল যুগের বিস্ময় ওস্তাদ মনসুরের শিল্পকর্ম বর্তমান রয়েছে। তার এ শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য উপস্থাপনে মনসুরের অবদান নতুন করে মনোযোগ আকর্ষণ করে আধুনিক গবেষকদের।