চেনা দৃশ্যকেই চিত্রে তুলে ধরতেন মেরি হাইলম্যান

হাইলম্যানের কম্পোজিশনে এগুলোকে আগের শিল্পীদের রেখে যাওয়া সহজলভ্য উদাহরণ হিসেবে সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছে।

‘জ্যামিতিক বিমূর্ততা, কালার ফিল্ড পেইন্টিং ও মিনিমালিজমের প্রচলিত রীতিগুলোকে তিনি ভাবাদর্শের দিক থেকে সম্মান করেছেন, কিন্তু আক্ষরিক অর্থে অনুসরণ করেননি। হাইলম্যানের কম্পোজিশনে এগুলোকে আগের শিল্পীদের রেখে যাওয়া সহজলভ্য উদাহরণ হিসেবে সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছে।’

মেরি হাইলম্যান সম্পর্কে এ কথা লিখেছিলেন শিল্প সমালোচক ডেভ হিকি। ২০০৮ সালে নিউইয়র্কে মেরির প্রথম একক রেট্রোস্পেক্টিভ প্রদর্শনী আয়োজিত হয়। সেই প্রদর্শনীর ক্যাটালগে মেরির চিত্রকলা নিয়ে এ মন্তব্য করেছিলেন তিনি। প্রদর্শনীটি এর আগে ক্যালিফোর্নিয়ার নিউপোর্ট বিচের অরেঞ্জ কাউন্টি মিউজিয়াম অব আর্ট ও কনটেম্পোরারি আর্ট মিউজিয়াম হিউস্টনে আয়োজিত হয়েছিল এবং ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল। এর আগে ১৯৯০ সালে বোস্টনের আইসিএতে তার শিল্পকর্ম নিয়ে একটি সার্ভে প্রদর্শনী হয়। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা সেসেশনে অনুষ্ঠিত ‘অল টুমরোজ পার্টিজ’ প্রদর্শনীতেও তার কাজ স্থান পেয়েছিল। এছাড়া ১৯৭২, ১৯৮৯ ও ২০০৮ সালের হুইটনি বিয়েনালেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।

অনেক আগে থেকেই বিমূর্ত চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃতে পরিণত হয়েছিলেন মেরি। তবে নিউ মিউজিয়ামের প্রদর্শনীটি তাকে ব্যাপক পরিচিতি ও প্রশংসা এনে দেয়। কয়েক প্রজন্মের চিত্রশিল্পীদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব বিস্তারকারী শিল্পী ছিলেন মেরি। ২০০৮ সালের প্রদর্শনী উপলক্ষে শিল্পী এলসওয়ার্থ কেলি তাকে ‘নতুন বিমূর্তবাদীদের মধ্যে সেরা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন হাউজার অ্যান্ড উইর্থ গ্যালারির শিল্পী ছিলেন।

মেরি অ্যান হাইলম্যান ১৯৪০ সালের ৩ জানুয়ারি সানফ্রান্সিসকোতে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা মেরি ফ্লোরেন্স ওয়েব ছিলেন নার্স ও বাবা জন শেরম্যান হাইলম্যান ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। শৈশবেই তিনি ফ্রি স্পিচ আন্দোলন, বিট জেনারেশন ও সার্ফ সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসেন। এসবই তরুণ হাইলম্যানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। শুরুতে তিনি সিরামিক শিল্পী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬২ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা বারবারা থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে সিরামিক শিল্পী পিটার ভলকোসের অধীনে পড়াশোনার জন্য ইউসি বার্কলেতে ভর্তি হন। ভলকোস সিরামিক শিল্পে অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজমের ধারণা প্রয়োগ করেছিলেন।

১৯৬৭ সালে বার্কলে থেকে এমএফএ সম্পন্ন করার পর হাইলম্যান নিউইয়র্কে চলে যান এবং চিত্রাঙ্কন শুরু করেন। উজ্জ্বল অ্যাক্রিলিক রঙ ও সমৃদ্ধ রঙের প্যালেট ছিল তার পছন্দ। নিজের কাজগুলোকে তিনি ‘ভাস্কর্যধর্মী উপাদান’ হিসেবে উল্লেখ করতেন। প্রায়ই তার শিল্পকর্ম ও প্রদর্শনীর স্থান—দুইয়ের মধ্যকার সীমানা তিনি অস্পষ্ট করে দিতেন।

১৯৭২ সালের হুইটনি অ্যানুয়াল প্রদর্শনীতে অংশ নেয়ার মাধ্যমে তিনি প্রথম উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি পান। পরবর্তী সময়ে প্রদর্শনীই হুইটনি বিয়েনালের পূর্বসূরি হিসেবে পরিচিত হয়।

হাইলম্যান তার কাজে স্বাতন্ত্র্য ছিলেন। তিনি একটি পরস্পরবিরোধী চিত্রাঙ্কন কৌশল অবলম্বন করতেন। এর প্রথম স্তরে থাকত প্রায়ই অঙ্গভঙ্গিনির্ভর একটি কম্পোজিশন, যার কিছু অংশ মাস্কিং টেপ দিয়ে ঢেকে তার ওপর দ্বিতীয় স্তর আঁকা হতো। দ্বিতীয় স্তরটি প্রায়ই হার্ড-এজ কম্পোজিশন হতো। এটি পরবর্তী সময়ে হাইলম্যানের সমগ্র শিল্পকর্মের বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।

সত্তর ও আশির দশকে তার শিল্প বিকশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাইলম্যান সংগীত, ঢেউ, ক্যালিফোর্নিয়ার মহাসড়কসহ ব্যক্তিগত নানা স্মৃতি ও প্রতীককে বৃত্ত, বর্গ ও ডোরাকাটার মতো সরল দৃশ্যরূপে রূপান্তর করতে শুরু করেন। চেনা দৃশ্যকেই চিত্রে তুলে ধরতেন মেরি। দর্শকদের সঙ্গে সংযোগ তৈরির উদ্দেশ্যে তার শিল্পকর্মের নাম প্রায়ই কোনো জনপ্রিয় গান বা অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া হতো।

চলতি বছরের ১৪ আগস্ট মৃত্যু হয় মেরি হাইলম্যানের। ৮৬ বছরের দীর্ঘ জীবনে তিনি বিমূর্ত চিত্রকলায় নিজের অবদানের পাশাপাশি রেখে গেছেন এক উত্তরাধিকার। তার পরবর্তীকালের শিল্পীরা হাইলম্যান দ্বারা প্রভাবিত হতে বাধ্য। অসংখ্য শিল্পকর্মের পাশাপাশি নিজের কথা তিনি রেখে গেছেন ‘দি অল নাইট মুভি’ নামের আত্মজীবনীতে।

আরও