ছাপচিত্রে সৃষ্টির নতুন দিগন্ত এনেছিলেন কালিদাস কর্মকার

শিল্পীর কল্পনা যখন কাগজের বুকে ছাপ ফেলে, তখন সেখানে কেবল একটি ছবি তৈরি হয় না; জন্ম নেয় রঙ, রেখা, বুনন ও অনুভূতির এক স্বতন্ত্র ভাষা।

এক বছর আগের কথা। ২০২৫ সালের অক্টোবরে লন্ডনের সদবি’জ নিলামঘরের মাধ্যমে বিক্রি হয় পাঁচ বাংলাদেশী শিল্পীর চিত্রকর্ম। এর মধ্যে কালিদাস কর্মকারের ‘হোলি ওয়ার’ বিক্রি হয়েছিল ৬ হাজার ৩৫০ পাউন্ডে। এর মাধ্যমে কালিদাসের কাজ আবারো আলোচনায় আসে। তবে অর্থের মানদণ্ডের বাইরেও তিনি অনেক আগেই চিত্রকলার অন্যতম সেরা শিল্পীতে পরিণত হয়েছিলেন। বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি। তবে প্রচলিত শিল্পমাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে ছাপচিত্রকে নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন কালিদাস কর্মকার। দেশজ সংস্কৃতি, প্রকৃতি, পুরাণ ও সমকালীন সমাজের নানা অনুষঙ্গ তার কাজে পেয়েছে স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গি।

শিল্পীর কল্পনা যখন কাগজের বুকে ছাপ ফেলে, তখন সেখানে কেবল একটি ছবি তৈরি হয় না; জন্ম নেয় রঙ, রেখা, বুনন ও অনুভূতির এক স্বতন্ত্র ভাষা। এ ভাষাকে নিজের মতো করে নির্মাণ করেছিলেন কালিদাস কর্মকার। চিত্রকলা, স্থাপনা ও পারফরম্যান্স আর্টে কাজ করলেও ছাপচিত্রে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা তাকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছিল। প্রচলিত কৌশলের বাইরে গিয়ে তিনি ছাপচিত্রের সম্ভাবনাকে যেমন প্রসারিত করেছেন, তেমনি বাংলাদেশে এ শিল্পমাধ্যমের চর্চা ও বিকাশেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

১৯৪৬ সালের ১০ জানুয়ারি ফরিদপুরে জন্ম কালিদাস কর্মকারের। তার বাবা ছিলেন স্বর্ণকার। শৈশব থেকেই কারুশিল্প ও উপকরণের সঙ্গে পরিচয় তার শিল্পীসত্তা গঠনে ভূমিকা রেখেছিল। ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটে পড়াশোনার পর ১৯৬৯ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস থেকে স্নাতক হন তিনি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশে শিল্পশিক্ষা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা তার শিল্পচর্চাকে সমৃদ্ধ করে।

ছাপচিত্রের নানা কৌশল আয়ত্ত করেছেন তিনি। এসব শিখেছিলেন পোল্যান্ড, ফ্রান্স ও জাপানে। সত্তরের দশকে পোল্যান্ডে গ্রাফিক আর্ট নিয়ে পড়াশোনা করেন। পরে প্যারিসে বিখ্যাত শিল্পী স্ট্যানলি উইলিয়াম হেইটারের অধীনে বহুরঙা এচিং নিয়ে গবেষণার সুযোগ পান। হেইটারের প্রতিষ্ঠিত ‘আতেলিয়ে সেভেনটিন’ ছিল পরীক্ষামূলক ছাপচিত্রচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে তিনি ভিসকসিটি প্রিন্টিং বা কালির ঘনত্বনির্ভর মুদ্রণকৌশল সম্পর্কে গভীরভাবে কাজ করেন। এ পদ্ধতিতে একই প্লেট থেকে একাধিক রঙ ছাপানো সম্ভব, যা ছবিতে তৈরি করে জটিল বুনট ও রঙের স্বতন্ত্র বিন্যাস।

কাঠখোদাই ছাপচিত্র নিয়ে জাপানে অধ্যয়ন করেন কালিদাস। এসব অভিজ্ঞতা তাকে ছাপচিত্রের প্রচলিত কাঠামো ভেঙে নতুন আঙ্গিক নির্মাণে উৎসাহিত করে। নিজের কাজের ক্ষেত্রে এচিং ও অ্যাকোয়াটিন্টের মতো কৌশলে তিনি রেখা, আলোছায়া ও টেক্সচারের বৈচিত্র্য তৈরি করেছেন। বিমূর্ততা, পুরাণ, তন্ত্রসাধনা ও প্রতীকী অনুষঙ্গের উপস্থিতি লক্ষ করা যায় তার চিত্রে। এসব উপাদানের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের অন্তর্জগৎ, অস্তিত্বের রহস্য ও সমকালীন সমাজের অস্থিরতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

বাংলাদেশের নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতির সঙ্গেও কালিদাসের শিল্পভাবনার গভীর সম্পর্ক আছে। তাকে অনেকে ‘অ্যালুভিয়াল আর্টিস্ট’ বা পলিমাটির শিল্পী হিসেবে অভিহিত করেছেন। নদী, পলি ও ভূখণ্ডে ক্রমাগত পরিবর্তন হয়। একই বৈশিষ্ট্য তার শিল্পেও দেখা যায়। কালিদাসের চিত্রকর্মে আছে রূপ ও বুনটের নানা স্তর। প্রকৃতি ও মানুষের অভিজ্ঞতা তার কাজে কখনো সরাসরি, কখনো প্রতীকীভাবে উপস্থিত হয়েছে। তবে তার শিল্পভাবনা কোনো একটি বিষয় বা মাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

ছাপচিত্রচর্চার অবকাঠামোও গড়ে তুলেছেন কালিদাস। ১৯৮৬ সালে ঢাকায় ‘গ্রাফিক আতেলিয়ে’ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ‘গ্যালারি কসমস’ ও ‘কসমস আতেলিয়ে-৭১’-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে ছাপচিত্রের জন্য বিশেষায়িত কর্মপরিসর তৈরিতেও ভূমিকা রাখেন। শিল্পী হিসেবে কালিদাস কর্মকারের এটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তার উপলব্ধি ছিল, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও কারিগরি সুযোগ ছাড়া এ শিল্পমাধ্যমের বিকাশ সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ছাপচিত্র তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় আরো বেশি মানুষের কাছে শিল্পকর্ম পৌঁছে দেয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

কালিদাস কর্মকারের গুরুত্ব কেবল তার সৃষ্ট শিল্পকর্মে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও দেশজ শিল্পবোধের সমন্বয়ে তিনি ছাপচিত্রকে দিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গি। একই সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য তৈরি করেছেন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ। কাগজের ওপর তার রেখে যাওয়া রেখা ও রঙের ছাপ তাই শুধু শিল্পীর সৃজনশীলতার স্মারক নয়, বাংলাদেশের আধুনিক ছাপচিত্রের ইতিহাসেও তা এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আরও