এআই আর্ট

সৃজনশীলতার বিনাশ নাকি নতুন ধারার শুরু?

প্রযুক্তির উৎকর্ষে বর্তমান সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই)। এআই ব্যবহার করে ঠিক কী করা হচ্ছে না বরং সে প্রশ্নই জুতসই।

প্রযুক্তির উৎকর্ষে বর্তমান সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই)। এআই ব্যবহার করে ঠিক কী করা হচ্ছে না বরং সে প্রশ্নই জুতসই। সৃজনশীল কাজেও ব্যবহার হচ্ছে এ প্রযুক্তি। জেনারেটিভ এআইয়ের সাহায্যে তৈরি করা যায় ছবি, ভিডিওসহ নানা কনটেন্ট। শুধু তা-ই নয়, পেইন্টিং ও ভাস্কর্য তৈরির মতো শৈল্পিক কাজেও দক্ষতার ছাপ রাখছে এআই। সেগুলো বিক্রিও হচ্ছে হাজারো ডলারে। এ পরিস্থিতিতে দুটি প্রশ্ন বেশ আলোচনায় আসছে। এক. শিল্পীদের জায়গা কি এআই নেবে? দুই. শিল্পের সংজ্ঞা কি পাল্টে যাচ্ছে? এ দুটো প্রশ্নকে ছাপিয়ে আরেকটি প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তা হলো এআই কি তাহলে নতুন ধারা তৈরি করছে?

বিশ্বের প্রথম হিউম্যানয়েড রোবট শিল্পী আই-ডা ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডশায়ারে অবস্থিত। আই-ডা নিজের অ্যাবস্ট্রাক্ট পোর্ট্রেটসহ নানা চিত্রকর্ম আঁকতে পারে। নারীর আদলে তৈরি রোবটটির চোখে ক্যামেরা রয়েছে। ক্যামেরার মাধ্যমে দৃশ্যপট পর্যবেক্ষণ করে রোবোটিক বাহুর সাহায্যে চিত্রকর্ম তৈরি করে আই-ডা। শৈল্পিক গুণাগুণ ও অনন্য বৈশিষ্ট্যসহ পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এরপর শিল্পীরা ভাবতে শুরু করেন এআই ও রোবট কি তাহলে মানুষের সৃজনশীলতার জায়গা নেবে নাকি মানুষের সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করবে।

কোনটি শিল্প হবে আর কোনটি হবে না তা নির্ভর করবে শিল্পীর ওপর। শিল্পী যদি তার কর্মকে শিল্প বলে তাহলে সেটি তা-ই হবে—এ ধারণা উপস্থাপন করেন বিশ শতকের গোড়ার দিকে ফরাসি শিল্পী মার্সেল ডুচ্যাম্প। তিনি চীনামাটির তৈরি প্রস্রাবের একটি পাত্রকে তার শিল্প হিসেবে উপস্থাপন করেন, যার নাম ‘ফাউনটেইন’। ঘটনাটি নিয়ে সে সময় বেশ আলোচনা হয়। বিশেষ করে সৌন্দর্য ও দক্ষতার গুণাগুণ বিচারে শিল্পের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া হয় ডুচ্যাম্পের শিল্পবোধের মাধ্যমে। একইভাবে শিল্পজগতে নতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে এআই। দার্শনিক অ্যালিস হেলিওয়েল বলেন, ‘ডুচ্যাম্পের ফাউনটেইন যদি শিল্প হতে পারে তাহলে এআইয়ের তৈরি কর্ম শিল্প হওয়ার যুক্তি উড়িয়ে দেয়া যায় না।’ ইতিহাসে শিল্প ও সংস্কৃতির বড় বড় যে আন্দোলন হয়েছে সেগুলোয় তখনকার সময়ের ছাপ পাওয়া গেছে। এআই ও রোবট নিয়ে যে এখন আলোচনা হচ্ছে সেখানেও বর্তমান সময়ের ছাপ থাকবে। বরং অনেকে মনে করেন এআই মানুষের সৃজনশীলতার সক্ষমতা আরো বাড়িয়ে তুলবে। গণিতবিদ মার্কাস ডু সাউটয় বলেন, ‘কঠোর পরিশ্রম থেকে মুক্তি দিতে ও সৃজনশীলতায় আরো বেশি করে অনুপ্রাণিত হতে সহায়তা করবে এআই।’ ১৮০০-এর দশকে যখন ফটোগ্রাফি ধারণার জন্ম হয় তখন অনেকেই চিত্রকলার সঙ্গে বিষয়টিকে সাংঘর্ষিক হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, ফটোগ্রাফি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধারা তৈরি করেছে।

ডাল-ই ও মিডজার্নির মতো জনপ্রিয় অনেক জেনারেটিভ এআই টুল রয়েছে যেগুলোয় নির্দেশনার মাধ্যমে দুর্দান্ত চিত্র পাওয়া যায়। তবে এর সঙ্গে আই-ডার পার্থক্য রয়েছে। রোবট শিল্পীটি নিজে দেখে চিত্র অঙ্কন করে। এমনকি সে সংগীত উৎসব থেকে অনুপ্রাণিত হয়েও চিত্র এঁকেছে। তাহলে কি সৃজনশীলতার কৃতিত্ব তাকেই দিতে হয়? নাকি তাকে তৈরির পেছনে যারা কাজ করেছেন কৃতিত্ব তাদের?

এমন অনেক শিল্পী আছেন যারা এআইকে সৃজনশীলতার টুল হিসেবে দেখেন, যেমনটা তাদের কাছে তুলি। জ্ঞানীয় বিজ্ঞান গবেষক মার্গারেট বোডেন নতুন, মূল্যবান ও বিস্ময়কর ধারণাকে সৃজনশীলতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট বা শিল্পকর্মের বিষয়ে তা প্রযোজ্য হতে পারে। তবে এআইকে প্রশিক্ষণ যেহেতু অন্যের কাজের মাধ্যমে দেয়া হয়, সে ক্ষেত্রে ‘চৌর্যবৃত্তির’ সম্ভাবনা থেকেই যায়। এআইয়ের পেছনে সৃজনশীল প্রক্রিয়াগুলো বেশ জটিল হতে পারে। যেহেতু অসংখ্য ডাটা থেকে এআই শেখে, তাই মাঝেমধ্যে দুর্দান্ত ফলাফল আসতে পারে। তবে এক্ষেত্রে আস্থা রাখা কঠিন হতে পারে। অনন্য মানবিক ক্রিয়াকলাপ থেকে শিল্প তৈরি হয়, যেখানে মানুষের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। প্রাণীও ছবি আঁকতে পারে, এআই তো আঁকছেই। তাহলে এসবও শিল্প?

মার্কাস ডু সাউটয় বলেন, ‘সৃজনশীলতা নিজেকে প্রকাশ করার অভিপ্রায় থেকে উদ্ভূত হয়, যা মেশিন বা এআইয়ের থাকে না। এআই ও আই-ডার মতো রোবটগুলো মানুষের ইচ্ছা বা সচেতনতা দ্বারা নয়, বরং মানুষের উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত হয়।’ এক্ষেত্রে অ্যালিস হেলিওয়েল বলেন, ‘শিল্প বিষয়গত ও অনুভবের ওপর নির্ভর করে। সেজন্য এআইয়ের তৈরি কাজকে বাদ দেয়া উচিত হবে না। যেকোনো সৃজনশীলতার একটি ভিত্তি রয়েছে, তা মানুষ, প্রাণী বা রোবট যে কারোর তৈরি হোক না কেন।’

আরও