চিত্রকলার আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে পেইন্টিং যে মর্যাদা ও মূল্য পায়, প্রিন্ট মেকিং প্রায়ই সে তুলনায় কিছুটা আড়ালে থেকে যায়। অথচ একটি প্রিন্ট তৈরির পেছনে থাকে কাঠ, ধাতু বা পাথরের পৃষ্ঠে খোদাই করা, যত্ন নিয়ে কালি মেখে ছাপ নেয়ার দীর্ঘ ও নিখুঁত শারীরিক শ্রম। বিশেষ করে অ্যাসিডে তৈরি প্লেট বারবার ব্যবহারের ফলে ক্ষয়ে যায়; ফলে একটি প্লেট থেকে একই মানের অসংখ্য প্রিন্ট নেয়াও সম্ভব নয়। তাই প্রিন্ট মেকিংকে কেবল পেইন্টিংয়ের পুনরুৎপাদন নয়, স্বতন্ত্র সৃজনশীল প্রক্রিয়া ও শিল্পমাধ্যম হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। প্রচলিত এ দুই মাধ্যমের মধ্যকার দূরত্ব মুছে ফেলার ভাবনা নিয়েই ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ের ‘কামরুল হাসান প্রদর্শনীশালা’-তে শুরু হয়েছে বিশেষ দলীয় প্রদর্শনী ‘সেকেন্ড ইমপ্রেশন’। আগামী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এ প্রদর্শনীতে কয়েক প্রজন্মের নয়জন শিল্পীর ৭১টি শিল্পকর্ম ঠাঁই পেয়েছে।
প্রদর্শনীতে যুক্ত হয়েছেন দেশের শিল্পকলার দীর্ঘদিনের চেনা মুখ ও বিভিন্ন প্রজন্মের নয়জন শিল্পী—মনিরুল ইসলাম, আবুল বারক আলভী, শহীদ কবীর, রোকেয়া সুলতানা, আনিসুজ্জামান আনিস, আবদুল্লাহ আল বশীর, ফারজানা আহমেদ উর্মি এবং প্রয়াণেও অমর হয়ে থাকা দুই প্রবীণ শিল্পী মাহমুদুল হক (১৯৪৫-২০২২) ও কালিদাস কর্মকার (১৯৪৬-২০১৯)। সত্তরের দশকে আত্মপ্রকাশ করা জ্যেষ্ঠদের পাশে যেমন আছেন আশির দশকের শিল্পীরা, তেমনি আছেন দুই হাজারের আশপাশে বিকশিত নবীনরা। বয়সের দীর্ঘ ব্যবধান থাকলেও এ নয়জনের মেলবন্ধন ঘটেছে শিল্পযাত্রার গোড়ায়ই—প্রিন্ট মেকিংয়ে তাদের প্রথম পাঠ এবং পেইন্টিংয়ে তার পরবর্তী বিস্তার। পেইন্টিং ও প্রিন্ট মেকিং দুই মাধ্যমেই তারা স্বতন্ত্র দক্ষতা এবং সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
গ্যালারির দেয়ালে চোখ রাখলেই শিল্পীদের দুই মাধ্যমের রূপান্তর ও ব্যক্তিগত আখ্যান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিল্পী মনিরুল ইসলামের ‘ডাস্ট অব ইনফিনিটি’ কাজটির সামনে দাঁড়ালে এক অনন্ত দিগন্তে চোখ হারিয়ে যায়। পাশেই রয়েছে ক্যানভাসে আঁকা ‘মিল্কিওয়ে’, চিত্রে টেক্সচারের ব্যবহারে তৈরি হয়েছে মহাজাগতিক নীরবতা। আবার সাম্প্রতিক ইতিহাসের ব্যাকুলতাকে ধরে রেখে ‘জেনোসাইড অব জুলাই ২০২৪’ চিত্রে গাঢ় লাল ও বিক্ষুব্ধ রেখায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এক অব্যাখ্যেয় প্রতিবাদ।
মনিরুল ইসলামের কাজে যেখানে মহাজাগতিক বিস্তার ও সাম্প্রতিক ইতিহাসের অভিঘাত একসঙ্গে ধরা দেয়, রোকেয়া সুলতানার ক্যানভাস সেখানে দর্শককে ফিরিয়ে আনে শহরের চেনা অথচ বহুমাত্রিক বাস্তবতায়। তার ক্যানভাসে রঙের উচ্ছ্বাসে ফুটে উঠেছে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো, রিকশা আর নাগরিক কোলাহলের মাঝে নারীর কেন্দ্রীয় অবস্থান। পাশেই ঝোলানো একই বিষয়ের ছায়াচ্ছন্ন মনোক্রোম ছাপচিত্রটি দেখায়—মাধ্যম পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে একই চরিত্র নতুন এক ধ্রুপদি মাত্রা পায়।
স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের ‘ক্ষুদিবাড়ি’ আনিস জামানের কাছে কেবল একটি স্থাপত্যকর্ম নয়, বরং একটি বিশেষ ভাবনার প্রকাশ। সে ভাবনাকেই উডকাটের মাধ্যমে নিজের মতো করে অনুবাদ করেছেন তিনি। ‘ক্ষুদিবাড়ি: হোমেজ টু মেরিনা তাবাসসুম’ শিরোনামের কাজটিতে স্থাপত্যের কাঠামো, রেখা ও ছাপের মধ্য দিয়ে ক্ষুদিবাড়ির সঙ্গে শিল্পীর এক ধরনের সংলাপ তৈরি হয়েছে। কাঠের ওপর খোদাই করা রেখাগুলো যেন স্থাপত্যের দৃশ্যমান অবয়বের পাশাপাশি এর অন্তর্নিহিত সরলতা ও মানবিক বোধকেও ধারণ করে।
স্থাপত্যের কাঠামো থেকে যখন চোখ সরে আসে প্রকৃতির দিকে, তখন প্রদর্শনীর আরেক প্রান্তে ধরা পড়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী কালিদাস কর্মকারের ‘পলিমাটির কান্না’। যেখানে জীবন ও প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য সংযোগের গল্প বলে। ২০১১ সালে কাগজের ওপর অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে নির্মিত এ চিত্রকর্মে উঠে এসেছে পলিগঠিত গাঙ্গেয় বদ্বীপের চিরায়ত রূপ, নদীর ভাঙন-গড়ন এবং পলিমাটিতে গড়ে ওঠা জীবনসংগ্রামের আদিম অনুভূতি।
বিষয়, মাধ্যম ও শিল্পভাষার এ বৈচিত্র্যই গ্যালারিতে দর্শকের অভিজ্ঞতাকেও একরৈখিক হতে দেয়নি। কেউ কোনো কাজের অর্থ সহজেই ধরতে পেরেছেন, কোনো কাজ আবার তাদের ভাবনার পসর বিস্তৃত করেছে। তবে প্রিন্ট ও পেইন্টিংয়ের পাশাপাশি অবস্থান অনেকের কাছেই হয়ে উঠেছে আকর্ষণের জায়গা।
ছাপচিত্রের গোপন অনুশাসন থেকে মুক্ত হয়ে ক্যানভাসে আভিজাত্য খোঁজার এবং শিল্পের দুটি মাধ্যমকে নিজের মতো করে আয়ত্ত করার যে দীর্ঘ পথ, ‘সেকেন্ড ইম্প্রেশন’ প্রদর্শনীতে তারই নানা বাঁক দৃশ্যমান। গত শতকের সত্তর, আশি কিংবা দুই হাজারের দশকে যাত্রা শুরু করা শিল্পীদের কাজ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যেন সময়ের ব্যবধানটাকেও নতুন করে পড়তে শেখায়। সে অর্থে প্রদর্শনীটি কেবল নয়জন শিল্পীর কাজের সমাবেশ নয়; বরং শিল্পচর্চার ভিন্ন ভিন্ন ও অভিজ্ঞতার একটি দৃশ্যমান সংলাপ।
আবুল বারক আলভী
প্রদর্শনীতে থাকা আমার কাজগুলোর মধ্যে প্রিন্টের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ের কিছু পেইন্টিংও রয়েছে। মূলত প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে কম্পোজিশন নির্মাণ করলেও আমার শিল্পভাষা এক জায়গায় স্থির থাকেনি। পুরনো ও অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক কাজ পাশাপাশি রাখলে সময়ের সঙ্গে শিল্পভাবনার পরিবর্তনটি চোখে পড়ে। একটি কাজ সৃষ্টির সময় যে ভাবনা কাজ করে, বছর পেরিয়ে সে একই কাজের দিকে তাকালে কখনো কখনো তার ভেতরই অন্য এক গল্প ধরা দেয়। শুরুর দিকে বাস্তবধর্মী বা রিয়েলিস্টিক কাজের প্রতি ঝোঁক থাকলেও সময়ের সঙ্গে বিমূর্ততার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। ফলে একই শিল্পীর কাজে বাস্তবতা থেকে বিমূর্ততার দিকে সরে যাওয়ার যে প্রবণতা, তা কেবল শৈলীর পরিবর্তন নয়; বরং সময়ের সঙ্গে শিল্পীর দেখার চোখ ও ভাবনারও বদলে যাওয়ার সাক্ষ্য। প্রদর্শনীর অন্য শিল্পীদের কাজেও কম-বেশি এ পরিবর্তনের ছাপ দেখা যায়—পুরনো কাজের দিকে ফিরে তাকালে শিল্পীরা সেখানে শুধু অতীতের কাজ নয়, নতুন করে আবিষ্কারেরও সুযোগ পান।
আনিসুজ্জামান আনিস
আমার সাম্প্রতিক অ্যাক্রিলিক চিত্রগুলোয় রাজধানী ঢাকার স্থাপত্য, নির্মাণপ্রক্রিয়া ও কাঠামোগত জ্যামিতিকে দেখার চেষ্টা করেছি। নগরের তথাকথিত উন্নয়ন আমার কাছে কেবল দৃশ্যমান পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আর্থসামাজিক দ্বন্দ্ব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বদলে যেতে থাকা নাগরিক জীবনের বাস্তবতা। ‘ক্ষুদিবাড়ি: হোমেজ টু মেরিনা তাবাসসুম’ কাজটিতেও মানুষ, প্রকৃতি ও পরিসরের একটা সংলাপ তৈরি করার চেষ্টা করেছি। কারণ স্থাপত্য আমার কাছে নিছক কাঠামো নয় বরং সম্পর্ক বোঝার একটি মাধ্যম। দেশজ স্থাপত্যের সরলতা ও সমকালীন স্থাপত্যচিন্তার সংলাপ এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাঁশের মতো স্তরায়িত কাঠামোয় আমি স্থিতিস্থাপকতা ও জলবায়ু সচেতনতার ভাবনা এনেছি। আর খণ্ডিত রেখাগুলো ভূমি ও জল, ঐতিহ্য ও উদ্ভাবনের মধ্যবর্তী এক চলমান রূপান্তরকে নির্দেশ করে।
একজন সমাজসচেতন শিল্পী হিসেবে নগরকে আমি শুধু তার নির্মিত অবয়বে দেখি না; তার ভেতরের পরিবর্তন, সংকট ও সম্ভাবনাকেও দেখার চেষ্টা করি। সে অর্থে আমার কাজগুলো একই সঙ্গে শহরের বর্তমানের দিকে তাকানো এবং তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার একটি নীরব অনুশীলন।
ফারজানা আহমেদ উর্মি
প্রিন্ট মেকিং আমার শিল্পচর্চার মূল ভিত্তি হলেও বর্তমানে প্রিন্ট ও ক্যানভাস—দুই মাধ্যমেই সমান্তরালে কাজ করছি। এ প্রদর্শনীতে আমার চারটি প্রিন্ট ও চারটি পেইন্টিং (অয়েল অন ক্যানভাস) রয়েছে। আমার সাম্প্রতিক কাজগুলোয় মূলত চারপাশের মানুষ ও প্রকৃতিকে পাশাপাশি রেখে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক ও অনুভূতির জায়গাগুলো অন্বেষণ করেছি।
আগের কাজগুলোয় বড় আকারের পোর্ট্রেট ও মুখের অভিব্যক্তিই ছিল অনুভূতি প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। নতুন কাজগুলোয় সে জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে পুরো শরীরী ভাষাকে গুরুত্ব দিয়েছি। হাতের ভঙ্গি, চোখের চাহনি, শরীরের নানামাত্রিক মুভমেন্টের মধ্য দিয়ে একজন মানুষের ভেতরের অনুভূতিকে প্রকাশের চেষ্টা করছি।
প্রকৃতি আমাদের নিরাময় করে, নতুন শক্তি দেয়। অথচ নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে আমরা চারপাশের প্রকৃতি উজাড় করছি। গাছপালা কমছে, পশুপাখির আবাসস্থল হারাচ্ছে, তার প্রভাব আমাদের মানসিক জীবনেও পড়ছে। এ ভাবনা থেকেই বর্তমান ক্যানভাস সিরিজটির শুরু।
আমার কাজের ভাষা প্রতি বছরই বদলায়। নতুন ভাবনা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মাধ্যম নিয়েও পরীক্ষা করতে চাই। প্রিন্ট মেকিং আমাকে এ অনুসন্ধানে অনেক সাহায্য করেছে। উডকাট, এচিং কিংবা অ্যাকোয়াটিন্টের মতো মাধ্যমে কাজ করতে গিয়ে যে ধৈর্য, সূক্ষ্মতা ও প্রযুক্তিগত বোধ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব আমার পেইন্টিং ও ভাস্কর্য চর্চায়ও রয়েছে। তাই আমার কাছে প্রিন্ট ও পেইন্টিং আলাদা দুটি জগৎ নয়; বরং এক মাধ্যমের অভিজ্ঞতা অন্য মাধ্যমের শিল্পভাষাকে সমৃদ্ধ করে।