মাটিতে তার বাস, মাটিতে ঘর, মাটি থেকেই আসে জীবনধারণের উপাদান। এ কারণেই মানুষের মূল খুঁজতে গেলেও যেতে হয় মাটির কাছে। এ রকম কিছু থিম নিয়েই সাজানো হয়েছে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের প্রদর্শনী ‘সার্চ সোল, সয়েল’। বাংলায় নামকরণ করা হয়েছে ‘মৃত্তিকার অন্বেষণে’। এতে অংশ নেয়া সাত শিল্পী তাদের নিজের অঞ্চল, বিশ্বাস, মাটি, প্রকৃতি ও পরিবেশের গল্প নিয়ে হাজির হয়েছেন।
আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার ক্যাফে পেরিয়ে লা গ্যালারির ভেতরে প্রবেশ করতেই হাতে বামে দেখা গেল, চলছে একটি ভিডিও স্টোরি। ‘মাটির অন্তরঙ্গ আত্মা’ নামের এ গল্পে দেখা যায়, শিল্পীরা কেমন করে এ প্রদর্শনীর এক-একটি অংশ, তাদের শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন। কয়েকটি ভাগে সে গল্পগুলো চলমান চিত্রে তুলে রাখা হয়েছে। ভিডিও স্টোরিটির মাধ্যমে এ প্রদর্শনীর সঙ্গে প্রথমেই দর্শকের একটি যোগাযোগ তৈরি হয়।
তিন কদম এগিয়ে হাতের বামে রূপশ্রী হাজংয়ের তিনটি শিল্পকর্ম। কাপড়ের ওপর সূচ-সুতায় ফুটিয়ে তুলেছেন হাজং জনগোষ্ঠীর লোকজ আচার ও বিশ্বাস। প্রথমটিতেই দেখা যায়, একটি সাদা কাপড়ে কয়েক রকম তৃণর উপস্থিতি। পরের ইনস্টলেশনে একই রকম কিছু তৃণর সঙ্গে কয়েকজন নারীর উপস্থিতি। পরেরটিতে একটি ফার্ণের পাতা। মূলত হাজংদের একটি বিশেষ আচার আছে, যেখানে কয়েক ধরনের শাক পানিতে দিয়ে নারীরা সে পানিতে গোসল করে। রূপশ্রী সে বিষয়ই তুলে ধরেছেন ‘বেনিথ দ্য শ্যাডো অব হং ও রানী’। এছাড়া ফার্ণের পাতাটিও তাদের আচারের অংশ।
রূপশ্রীর কাজটি দেখে সামনে এগোলেই দেখা যাবে, খাইদেম সিঁথি সিনহার ইনস্টেশন ‘থ্রেডস অব অ্যানসেস্ট্রাল ল্যান্ডস্কেপ’। একটি মণিপুরি শাড়ি। আমাদের খুবই পরিচিত এ বস্ত্রখণ্ড কেন সিঁথি নিয়ে এলেন এমন একটি প্রদর্শনীতে। সিঁথির সঙ্গে কথা বলেই জানা গেল সেটি। মূলত মণিপুরি শাড়ি আমাদের খুব পরিচিত হলেও এ শাড়ির মোটিফে লুকিয়ে আছে মণিপুরি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকাচার। যেমন সিঁথি দেখালেন, তার ইনস্টলেশনের শাড়িটিতে আছে টিয়া পাখির ঠোঁট, মাছের চোখ, শসার বীজ, মৌমাছি ও প্রজাপতির মোটিফ। তিনি জানান, এ সবই মণিপুরি সমাজের সঙ্গে যুক্ত।
সিঁথি বলেন, ‘মণিপুরি শাড়িতে আসলে প্রকৃতির অনেক বিষয়কে আমরা তুলে ধরি। এ বিষয়গুলো মানুষ, জীবন ও বিশেষত নারীদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি উঠে আসে। যেমন মাছের চোখ। এটি নারীর প্রতিবাদী সত্তা উপস্থাপন করে। মৌমাছি যেমন ফুলে ফুলে ঘুরে মধু সঞ্চয় করে মৌচাকে, নারীও তার ঘর এভাবে সাজায়। শসার বীজ দিয়ে বোঝানো হয় মাতৃত্বকে। এমন অনেক রকম মোটিফ নিয়েই মণিপুরি শাড়ি। এর সবকিছু আসলে সবাই জানে না। শাড়িটাকে পোশাক হিসেবেই সবাই গ্রহণ করে। এমনকি যারা তাঁতে শাড়ি বোনেন, তারাও হয়তো জানেন না। এ কারণেই বিষয়গুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। এ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার একটা চিন্তা থেকেই কাজটা করা।’
মো. হাশেম পাহাড় ও উর্বর মাটির ক্ষয়কে স্মৃতি, প্রতিরোধ ও টিকে থাকার প্রতীকে রূপ দিয়েছেন। তার কাজ ‘দ্য লাস্ট লেয়ার অব টপ সয়েল’-এ আছে ভূপ্রকৃতির পরিবর্তন। পরিবেশের ওপর মানুষের হস্তক্ষেপে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মাটি। বিশেষত পাহাড়ের টপ সয়েল নানাভাবে ক্ষয়ে যাচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে। ক্যানভাসে বিভিন্ন মাধ্যমে সে চিত্র তুলে ধরেছেন শিল্পী।
অভিবাসন, পরিচয় ও ‘বাড়ি’ ধারণার মানসিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য অনুসন্ধান করেছেন লুৎফা মাহমুদা। পাখির বাসার মতো ছোট ছোট কিছু উপস্থাপনাকে একেকটা সময় ও পর্যায় হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি।
দেয়ালজুড়ে নানা প্রাণীর মাথার অংশ ফুটিয়ে তুলেছেন দীপ্র বণিক তার ‘ভ্যানিশিং ইমপ্রিন্ট’-এ। আমাদের পরিবেশ ও প্রকৃতি থেকে বহু প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে আর কিছু বিলুপ্ত প্রায়। এ বিষয়ই তিনি তুলে ধরেছেন। দেয়ালে সে প্রাণীদের মাথার ইনস্টলেশনের (বিভিন্ন মাধ্যমে তৈরি) সঙ্গে নিচে মেঝেতে আছে মাটির ওপর এসব প্রাণীর পায়ের ছাপ। পুরো কাজটি হয়তো বোঝায়, সবাই মাটির সঙ্গেই যুক্ত।
গ্যালারির বাইরের প্রাঙ্গণে একটি গাছকে কেন্দ্র করে বৃষ্টিকে উপস্থাপন করেছেন মো. ফয়জুল ইসলাম। গাছের ডাল থেকে সুতার সঙ্গে ঝুলছে বৃষ্টির ফোঁটা। কোনোটা পানির মতোই স্বচ্ছ, কোনোটা সাদা, কোনোটা মাটির রঙ আর কোনোটা যেন পলিথিনে আটকে আছে। শিল্পী জানান, বৃষ্টির ফোঁটার এ উপস্থাপনা তৈরিতে তিনি ব্যবহার করেছেন কাঁচ, প্লাস্টার অব প্যারিস, মাটি ও ফ্ল্যানেলের কাপড়। অ্যাসিড বৃষ্টি জীববৈচিত্র্যের ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা তুলে ধরতে চেয়েছেন শিল্পী।
এ ইনস্টলেশন নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি পড়াশোনা করেছি প্রিন্টমেকিং নিয়ে। কিন্তু এ কাজের জন্য ইনস্টলেশনই বেছে নিয়েছি। একটা সময় বৃষ্টি ছিল আমাদের জন্য উৎসবের মতো। এখন বৃষ্টি নামলে ভাবতে হয়, বৃষ্টিতে ভিজলে কী কী ক্ষতি হতে পারে। সে চিন্তা থেকেই কাজটা করা।’
গ্যালারির ঠিক মাঝখানে আছে বনানী সিমলাইয়ের একটি ইনস্টলেশন। কাজটিতে তিনি খাদ্য, মাটি ও মানব অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে কেন্দ্র করে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সহাবস্থানের কথা বলেন। মাটিতে তৈরি এ ইনস্টলেশনে বিভিন্ন রকম খাবার দেখা যায়। মাছ আছে, সবজি আছে, মাংস আছে। কিন্তু সেগুলো কি আদৌ খাদ্য? আমাদের পরিবেশে আমরা সে অবস্থা কি রেখেছি? আমাদের তো খাবারেও বিষ।
সে বিষয়গুলো বোঝাতেই হয়তো বনানী সিমলাই থালাভরা খাবারের পাশাপাশি রেখেছেন কয়েকটি প্রবাদ। একটি থালায় আছে ভারতচন্দ্রের সে বিখ্যাত লাইন ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। আছে জীবনানন্দের ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়।’ তবে সবচেয়ে নজর কাড়ে ‘হাঁড়ি নিয়ে দাড়িমুখো /কে-যেন কে বৃদ্ধ /রোদে বসে চেটে খায় /ভিজে কাঠ সিদ্ধ’।
এ প্রদর্শনী নিয়ে কথা হয় কিউরেটর কুন্তল বাড়ৈর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এটা আমার প্রথম কিউরেশন। ন্যাচার আর্ট নিয়ে অনেক দিন ধরে কাজ করে আসছি। ঢাকার বাইরে দুটো প্রজেক্ট করেছি। সে জায়গা থেকে মনে হয়েছে, ঢাকায়ও একটা কাজ করা প্রয়োজন। কাজটা করার সময় ভাবলাম, বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পীদের যুক্ত করতে পারলে বৈচিত্র্য আসবে। সেটাই হয়েছে। সাতজন শিল্পী সাতটি অঞ্চলের। তারা নিজের শিকড়ের গল্পটাই তুলে এনেছেন।’
কুন্তল জানান, এ প্রদর্শনীর জন্য শিল্পীরা কাজ করেছেন প্রায় দুই মাস। তারপর গ্যালারিতে সে কাজগুলো বসানো হয় দুদিনে। ১৮ জুলাই প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়। এটি চলবে ২৮ জুলাই পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা প্রদর্শনী দেখতে পারবেন।