জ্যাক গ্যামেলিনের অ্যানাটমি চিত্রকর্ম

বিজ্ঞান, শিল্প ও মৃত্যুচিন্তার এক অনন্য সংকলন

১৭৩৮ সালে জন্ম নেয়া গ্যামেলিন মূলত যুদ্ধের দৃশ্য, ধ্রুপদি কাহিনী ও ধর্মীয় ঘটনাবলি অবলম্বনে আঁকা চিত্রকর্মের জন্য পরিচিত ছিলেন।

একটি মানুষের দিকে তাকালে প্রথমে তার বাহ্যিক অবয়বই চোখে পড়ে। মুখের অভিব্যক্তি, শরীরের ভঙ্গি, হাতের সঞ্চালন কিংবা পেশির টান—এসবের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় তার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা। শিল্পীরা এসব দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যই ছবিতে ফুটিয়ে তোলেন। কিন্তু বাহ্যিক অবয়বের আড়ালে রয়েছে হাড়, পেশি, সন্ধি ও নানা শারীরবৃত্তীয় গঠনের জটিল বিন্যাস। মানবদেহের এ অভ্যন্তরীণ কাঠামো সম্পর্কে যথাযথ ধারণা না থাকলে ছবি যত নিখুঁতভাবেই আঁকা হোক না কেন, তাতে স্বাভাবিকতা ও প্রাণবন্ততা ফুটিয়ে তোলা বেশ কঠিন।

আঠারো শতকের ফরাসি শিল্পী জ্যাক গ্যামেলিন এ সত্যটাই উপলব্ধি করেছিলেন। সে কারণেই তার কাছে অ্যানাটমি বা দেহসংস্থানবিদ্যা নিছক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় ছিল না; বরং মানবদেহকে বাস্তবসম্মত ও জীবন্তভাবে চিত্রিত করার জন্য এটি ছিল শিল্পচর্চার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি।

১৭৩৮ সালে জন্ম নেয়া গ্যামেলিন মূলত যুদ্ধের দৃশ্য, ধ্রুপদি কাহিনী ও ধর্মীয় ঘটনাবলি অবলম্বনে আঁকা চিত্রকর্মের জন্য পরিচিত ছিলেন। বিশ্বের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত রয়েছে তার কাজ। ফ্রান্সের লুভর জাদুঘর, যুক্তরাষ্ট্রের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট এবং কারকাসোনের মিউজে দে বোজ-আর্টসের সংগ্রহেও স্থান পেয়েছে এসব শিল্পকর্ম। তবে শিল্পকলার ইতিহাসে গ্যামেলিনের বিশেষত্ব কেবল এসব চিত্রকর্মে সীমাবদ্ধ নয়। মানবদেহের অভ্যন্তরীণ গঠনকে চিত্রকলার মাধ্যমে তুলে ধরার এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগও তাকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।

ফ্রান্সের তুলুজ শহর থেকে ১৭৭৯ সালে প্রকাশিত হয় তার ব্যতিক্রমী গ্রন্থ “নুভো রেকুই দ’অস্তেওলজি এ দ্য মায়োলজি” (Nouveau receuil d’ostéologie et de myologie)। অর্থাৎ হাড় ও পেশি নিয়ে নতুন সংকলন। গ্রন্থটির উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞান ও শিল্পকলার প্রয়োজনে মানবদেহের হাড়, পেশি ও অন্যান্য দৃশ্যমান শারীরস্থানিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা। এটি ছিল এমন এক সচিত্র অ্যানাটমি অ্যাটলাস, যেখানে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এবং শিল্পীর কল্পনাশক্তি পাশাপাশি অবস্থান করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের বিরল বই ও বিশেষ সংগ্রহ বিভাগে গ্রন্থটির একটি ঐতিহাসিক সংস্করণ সংরক্ষিত রয়েছে।

গ্যামেলিনের শিল্পী হয়ে ওঠার গল্পটিও বেশ চমকপ্রদ। জীবনের শুরুতে ব্যবসায়িক শিক্ষার জন্য তাকে পাঠানো হয়েছিল তুলুজে, অভিজাত ব্যারন নিকোলা-জোসেফ মার্কাসাস দ্য পুইমোরাঁর কাছে। শিল্পকলার প্রতি অনুরাগী পুইমোরাঁ দ্রুতই বুঝতে পারেন, ব্যবসার চেয়ে চিত্রকলার প্রতিই তরুণ গ্যামেলিনের ঝোঁক বেশি। তার উদ্যোগেই গ্যামেলিন তুলুজের রয়্যাল একাডেমিতে শিল্পশিক্ষার সুযোগ পান। পরে ১৭৬৪ সালে পাড়ি জমান ইতালির রোমে। সেখানে সান লুকা একাডেমিতে অধ্যয়ন ও শিল্পচর্চার মধ্য দিয়ে তার দক্ষতা আরো পরিণত হয়। ১৭৭৭ সাল পর্যন্ত চলে তার এ শিল্পযাত্রা।

ইতালির ধ্রুপদি শিল্পঐতিহ্য এবং মানবদেহের গঠন সম্পর্কে নিবিড় পর্যবেক্ষণ গ্যামেলিনের শিল্পীসত্তাকে নতুন মাত্রা দেয়। শরীরের কোন অংশ কীভাবে বাঁক নেয়, পেশির সংকোচন ও প্রসারণে অঙ্গভঙ্গি কীভাবে বদলে যায় কিংবা হাড়ের বিন্যাস কীভাবে একটি নির্দিষ্ট শারীরিক ভঙ্গি তৈরি করে—এসব বিষয় বাস্তবসম্মত চিত্রকর্ম নির্মাণে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তার অ্যানাটমি অ্যাটলাসে সে উপলব্ধিরই বিস্তৃত প্রকাশ ঘটেছে।

গ্রন্থটির অন্যতম আকর্ষণ এর বিশাল আকারের খোদাইচিত্র। এতে মানবদেহের কঙ্কাল, পাঁজরের হাড়, হাতের হাড়, মাথা ও ঘাড়ের পেশি থেকে শুরু করে শরীরের বিভিন্ন পেশিগুচ্ছের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কোনো ছবিতে ত্বকের আবরণ সরিয়ে পেশির বিন্যাস দেখানো হয়েছে, আবার কোথাও পৃথকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে হাড়ের কাঠামো। প্রতিটি চিত্রের লক্ষ্য ছিল মানবদেহের অভ্যন্তরীণ গঠনকে এমনভাবে দৃশ্যমান করা, যাতে শিল্পীরা তা পর্যবেক্ষণ করে বাস্তবসম্মত মানব অবয়ব আঁকতে পারেন। গ্রন্থটির কোনো কোনো চিত্রফলকের উচ্চতা প্রায় দুই ফুট পর্যন্ত, যা সে সময়ের সচিত্র প্রকাশনার তুলনায় ছিল বেশ ব্যতিক্রমী।

গ্যামেলিনের কাজকে কেবল শারীরস্থানিক তথ্যচিত্র হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত বৈশিষ্ট্য বোঝা যাবে না। কারণ তার আঁকা কঙ্কালগুলো শুধু হাড়ের গঠন প্রদর্শন করে না; বরং কখনো বই পড়ে, কখনো বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে, আবার কখনো কবর থেকে উঠে এসে জীবন্ত চরিত্রের মতো হাজির হয়। কোথাও কঙ্কালকে ঘিরে বিস্মিত অভিজাত মানুষের উপস্থিতি, কোথাও আবার ফুটে উঠেছে মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের ধর্মীয় কল্পনা। বৈজ্ঞানিক চিত্রণের সঙ্গে এমন নাটকীয় ও প্রতীকী উপস্থাপনা গ্রন্থটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র শিল্পভাষা।

একটি চিত্রে দেখা যায়, কঙ্কাল বসে বই পড়ছে। প্রথম দেখায় দৃশ্যটি কৌতুকপূর্ণ মনে হলেও এর সঙ্গে যুক্ত লাতিন বাক্যে রয়েছে গভীর নৈতিক বার্তা—‘মানুষকে প্রলোভনের কাছে আত্মসমর্পণ না করার আহ্বান’। অন্য একটি ছবিতে কবর থেকে উঠে আসছে কঙ্কাল, যার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে খ্রিস্টীয় ধর্মবিশ্বাসের শেষ বিচার ও পুনরুত্থানের ধারণা। আবার কোথাও কঙ্কালদের বেহালা ও চেলো বাজাতে দেখা যায়। জ্ঞানচর্চা, সংগীত ও বিনোদনের মতো জীবনের পরিচিত অনুষঙ্গকে মৃত্যুর প্রতীকের সঙ্গে যুক্ত করে গ্যামেলিন যেন বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝখানে তৈরি করেছেন এক অদ্ভুত দৃশ্যজগৎ।

এসব চিত্রের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অবশ্য নিছক কৌতুক বা অস্বাভাবিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এগুলোর মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে মানুষের নশ্বরতা ও মৃত্যুর অনিবার্যতার প্রশ্ন। জীবদ্দশায় সামাজিক মর্যাদা, সম্পদ কিংবা বাহ্যিক সৌন্দর্যে মানুষের মধ্যে যত পার্থক্যই থাকুক, মৃত্যুর পর কঙ্কালের কাঠামোয় সে বিভাজন আর দৃশ্যমান থাকে না। একটি সমাধিচিত্রের সঙ্গে যুক্ত লাতিন বাক্যও সে চিরন্তন সত্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়—‘মানুষ ধূলি থেকে এসেছে, আবার ধূলিতেই ফিরে যাবে’। সে হিসেবে গ্রন্থটিতে শারীরস্থানিক অধ্যয়নের পাশাপাশি জায়গা পেয়েছে জীবন, মৃত্যু ও মানব অস্তিত্বের দার্শনিক অনুসন্ধান।

মানবদেহের পেশি নিয়ে গ্যামেলিনের বিশ্লেষণও ছিল বেশ বিস্তৃত। বিভিন্ন ভঙ্গিতে দাঁড়ানো কিংবা হাতে দণ্ড ধারণ করা পেশিবহুল অবয়বের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, শরীরের বাহ্যিক ভঙ্গির সঙ্গে অভ্যন্তরীণ পেশি গঠনের সম্পর্ক কতটা নিবিড়। ধর্মীয় চিত্রকলায় যন্ত্রণা, শারীরিক ভার ও দেহের টান বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্যও এ জ্ঞান প্রয়োজন ছিল। এমনকি ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার দৃশ্য আঁকার প্রস্তুতিতে তিনি মানবদেহের পেশি নিয়ে পৃথক অধ্যয়ন করেছেন। অর্থাৎ শিল্পের প্রয়োজনে অ্যানাটমিকে শিল্পী শুধু সহায়ক জ্ঞান হিসেবে নয়, বরং চিত্রকলার অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবেই বিবেচনা করেছিলেন।

বর্তমান সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শিল্পশিক্ষায় মানবদেহের গঠন বোঝার জন্য ব্যবহার হচ্ছে ত্রিমাত্রিক মডেল, ডিজিটাল ইমেজিং ও নানা আধুনিক প্রযুক্তি। কিন্তু এসব প্রযুক্তির বহু আগে গ্যামেলিনের মতো শিল্পীরা ছবি এঁকে জটিল শারীরস্থানিক জ্ঞানকে দৃশ্যমান ও শিক্ষণীয় করে তুলেছিলেন। তাদের সে কাজ প্রমাণ করে, বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে সহজবোধ্য ও দৃশ্যমান করে তোলার ক্ষেত্রে শিল্পের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

আরও