অনেক শিল্পী রঙ-তুলিতে সৌন্দর্য নির্মাণ করেন। আবার কেউ কেউ শিল্পকে ব্যবহার করেন প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে। মার্কিন শিল্পী বেটি সার দ্বিতীয় দলের একজন। দীর্ঘ সময় তিনি শিল্পকেই বর্ণবাদ, কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর হওয়া অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাধ্যম করেছেন। ভাঙা পুতুল, পুরনো কাঠের বাক্স, পারিবারিক আলোকচিত্র কিংবা দৈনন্দিন জীবনের বাতিল বস্তু দিয়েই তিনি গড়ে তুলেছেন বর্ণবাদ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক অনন্য শিল্পভাষা। এ শিল্পী ২৬ জুলাই মারা গেলেন। ৩০ জুলাই তার ১০০ বছর পূর্ণ হতো।
১৯২৬ সালে জন্ম বেটি সারের। যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মধ্যগগনে তার শিল্পচর্চার শুরু। চলছিল আইনের চোখে সমতা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের পাশাপাশি সংস্কৃতি ও শিল্পে কৃষ্ণাঙ্গদের পরিচয় পুনর্দাবির আন্দোলন। বেটি সার বিশ্বাস করতেন, বর্ণবাদ শুধু রাস্তায় বা আদালতে নয়; মানুষের দৈনন্দিন জীবন, বিজ্ঞাপন, খেলনা কিংবা জনপ্রিয় সংস্কৃতির মধ্যেও লুকিয়ে থাকে। তাই সেই প্রতীকগুলোকেই তিনি নিজের শিল্পের উপাদানে পরিণত করেন।
বেটির শিল্পমাধ্যম ছিল অ্যাসেম্ব্লাজ। অর্থাৎ বিভিন্ন পুরনো বা পরিত্যক্ত বস্তু একত্র করে নতুন অর্থ তৈরি করা। অন্যের ফেলে দেয়া জিনিস নিয়ে কাজ করেছেন। একটি পুরনো পুতুল, একটি কাঠের বাক্স বা একটি বিবর্ণ ছবি তার শিল্পে কেবল বস্তু নয়; তারা বহন করে দাসপ্রথা, বৈষম্য, স্মৃতি ও প্রতিরোধের গল্প।
বেটি সারের সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পকর্ম ‘দ্য লিবারেশন অব আন্ট জেমাইমা’ (১৯৭২)। যুক্তরাষ্ট্রে ‘আন্ট জেমাইমা’ দীর্ঘদিন ধরে কৃষ্ণাঙ্গ নারীর একটি বর্ণবাদী ও অবমাননাকর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সার সেই পরিচিত ছবিটিকে সম্পূর্ণ নতুন অর্থ দিয়েছিলেন। তার শিল্পকর্মে আন্ট জেমাইমার এক হাতে রান্নাঘরের ঝাড়ু, অন্য হাতে রাইফেল। এর মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, যাকে সমাজ বছরের পর বছর অনুগত গৃহকর্মীর প্রতীকে পরিণত করেছে, সেই নারীই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মুখ হয়ে উঠতে পারেন। কাজটি আজও আমেরিকান শিল্পের ইতিহাসে বর্ণবাদবিরোধী শিল্পের অন্যতম শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে সারের শিল্প কেবল প্রতিবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার বহু কাজে পারিবারিক আলোকচিত্র, আফ্রিকান ঐতিহ্য, ধর্মীয় প্রতীক, জ্যোতিষচিহ্ন ও লোকবিশ্বাসের নানা উপাদান দেখা যায়। তিনি মনে করতেন, একটি জাতির স্মৃতি সংরক্ষণ করাও রাজনৈতিক কাজ। তাই তার শিল্পে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সামষ্টিক ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।
আজকের পৃথিবীতেও বেটি সারের শিল্পের আবেদন কমেনি। বর্ণবাদ, পরিচয়ের রাজনীতি কিংবা সামাজিক বৈষম্য নিয়ে যখন নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়, তখন বেটি সারের শিল্প আবারো আলোচনায় ফিরে আসে। কারণ তিনি দেখিয়েছেন, শিল্প কখনো শুধু দেয়ালে টাঙানো কোনো বস্তু নয়। এটি হতে পারে প্রতিবাদের ভাষা, ইতিহাসের সাক্ষ্য এবং পরিবর্তনের আহ্বান।